ফ্রান্সিস ডেকে নেমেই ছুটল সিঁড়ির দিকে। নীচে নেমে চলে এল দাঁড় টানার লম্বা ঘরটায়। সারি সারি বেঞ্চিগুলোর দিকে তাকাল। দেখলো, সবাই প্রাণপণে দাঁড় টানছে। জাহাজের দুলুনিতে ভালোভাবে দাঁড়ানো যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস সেই দুলুনির মধ্যে কোনরকমে দাঁড়িয়ে চীৎকার করতে লাগল–ভাইসব, সামনেই ডুবো পাহাড়। আমরা আর সামনের দিকে যাব না। জাহাজ পিছিয়ে আনতে হবে। ডুবো পাহাড়ের ধাক্কা এড়াতে হবে। তারপর ঝড়ের ঝাঁপটায় জাহাজ যে দিকে যায় যাক।
সবাই দাঁড় বাওয়া বন্ধ করে ফ্রান্সিসের কথা শুনল। নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ফ্রান্সিস যে সত্য কথাই বলেছে, এ বিষয়ে কারও মনে আর সন্দেহ রইল না। এবার সবাই উল্টেদিকে দাঁড় বাইতে লাগল। জাহাজ পিছিয়ে আসতে লাগল। ঝড়ের কয়েকটা প্রচণ্ড ধাক্কায় অনেকটা পিছিয়ে এল। কিন্তু ডুবো পাহাড়ের ধাক্কা এড়াতে পারলোনা। খুব জোরে ধাক্কা লাগল না তাই রক্ষে। পেছনের হালটা মড়মড় করে ভেঙে গেল। সেই সঙ্গে পেছনের রেলিঙের কাছে অনেকটা জায়গা ভেঙে খোঁদল হয়ে গেল। তবু খোদলটা খুব উঁচুতে হল বলে বেশী জল ঢুকতে পারলো না। জাহাজ ডোবার ভয়ও রইল না। তারপরঝড়-বিক্ষুব্ধ সমুদ্রে কলার মোচার মত নাচতে নাচতে জাহাজ কোনদিকে যে চললো, তা কেউ বুঝতে পারল না।
ফ্রান্সিস ততক্ষণে জাহাজের খোলের ঘরগুলো খুঁজতে আরম্ভ করেছে। এ ঘরের দরজায় ও ঘরের কাঠের দেওয়ালে ধাক্কা খেতে-খেতেও হ্যারিকে খুঁজতে লাগল। একটা বন্ধ ঘরের দরজায় ফ্রান্সিস জোরে ধাক্কা দিয়ে ডাকল–হ্যারি!
ভেতর থেকে হারির উচ্চকণ্ঠ শোনা গেল–কে? ফ্রান্সিস!
ফ্রান্সিস আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করল না। সমস্ত শক্তি দিয়ে দরজায় লাথি মারতে লাগল। কিন্তু দরজা ভাঙল না। মরচে ধরা কড়াটা একটু আলগা হল। তলাটা ঠিকই ঝুলতে লাগল। এদিক-ওদিক তাকাতে-তাকাতে একটা হাতলভাঙা হাতুড়ি নজরে পড়ল। সেটা এনে মরচে ধরা কড়াটায় দমাদ্দম ঠুকতে লাগল। কয়েকটা ঘা পড়তেই কড়াটা দুমড়ে ভেঙে গেল। খোলা দরজা দিয়ে হ্যারি কোনরকমে ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল।
ফ্রান্সিস দ্রুত বলল এখন কথা বলার সময় নেই, ডেকে চলো। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ফ্রান্সিস বুঝলো জাহাজটা আর তেমন দুলছে না। ডেকে উঠে দেখলো, জল-ঝড় তেমন নেই আর। তবে সমুদ্রে আকাশে এখনও পাতলা কুয়াশার আস্তরণ রয়েছে। হাওয়ায় কুয়াশা উড়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। হলোও তাই। কুয়াশা উড়ে গেল। আকাশে দিগন্তের দিকে হেলে পড়া পাণ্ডুর চাঁদটা দেখা গেল। রাত শেষ হয়ে আসছে।
ফ্রান্সিস ডাকল–হ্যারি!
হ্যারি এগিয়ে আসতে ফ্রান্সিস বললো–চলো, হালের অবস্থাটা একবার দেখে আসি।
দেখা গেল, হালটা একেবারেই ভেঙে গেছে। তার সঙ্গে জাহাজের অনেকটা জায়গা, ভেঙে হাঁ হয়ে গেছে। সব দেখে-শুনে ফ্রান্সিস বললো–বেহাল জাহাজ, কোথায় যেন চলেছে তা ঈশ্বরই জানে।
–সে সব কাল ভাবা যাবে। এখন ঘুমিয়ে নেবে চল। হ্যারি তাগাদা দিলো।
–হ্যাঁ চল। খুব পরিশ্রান্ত আমি। পা টলছে, দাঁড়াতে পারছি না। পরদিন ঘুম ভেঙে যেতেই ফ্রান্সিস ধড়মড় করে উঠল। সকাল হয়ে গেছে। সবাই অঘোরে ঘুমুচ্ছে। গত রাত্রির কথা মনে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ডেকের দিকে ছুটল। ডেকে দাঁড়িয়ে দেখলো, আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। মেঘের চিহ্নমাত্র নেই। সমুদ্রও শান্ত। সাদা রংয়ের সামুদ্রিক পাখিগুলো উড়ছে। তীক্ষ্মস্বরে ডাকছে। কিন্তু এ কোথায় এলাম? একটা ধুধুমরুভূমির মত জায়গায় জাহাজ কাত হয়ে বালিতে আটকে আছে। এখন আর ভাববার সময় নেই। সবাইকে ডেকে তুলতে হবে। জাহাজ মেরামত করতে হবে। তারপর সেই দ্বীপের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তে হবে।
ফ্রান্সিস সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল। কাউকে ধাক্কা দিয়ে, কাউকে আস্তে পেটে ঘুষি মেরে, কারো পিঠে চাপড় দিয়ে সে গলা চড়িয়ে বলল–ওঠ সব, ডেক-এ চল।
সবাই একে-একে উঠে পড়ল। উপরে ডেকে এসে দাঁড়াল। ডাঙার ধু-ধু বালির দিকে তাকিয়ে বোধহয় ভাবতে লাগল–কোথায় এসে ঠেকলাম? ওদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল–সবাই কথা বলতে লাগল। সবার মুখে একই প্রশ্ন–কোথায় এলাম?
ফ্রান্সিস ডেকে এসে দাঁড়াল! সবাইকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল, ভাইসব, জাহাজ কোথায় এসে ঠেকেছে, আমরা কেউই বলতে পারব না। ওসব ভাবনা পরে ভাবা যাবে।
এখন নষ্ট করার মত সময় আমাদের হাতে নেই। একদল চলে যাও রসুই ঘরে রান্নার বন্দোবস্ত করো। আর সবাই জাহাজ মেরামতির কাজে হাত লাগাও।
ফ্রান্সিস সেনাপতি আরতার দলের লোকেদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল–আপনাদেরও হাত লাগাতে হবে।
সেনাপতি আর তার সঙ্গীরা মুখ গোমড়া করে সকলের সঙ্গে চলল। ফ্রান্সিস আবার তার বন্ধুদের বিশ্বাস ফিরে পেয়েছে, এটা সেনাপতির দলের কাছে ভাল লাগল না। ওরা ধান্ধায় রইল, কি করে ফ্রান্সিসকে অপদস্থ করা যায়।
জাহাজ থেকে কাঠের তক্তা নামানো হল। হালের জায়গাটায় যেখানে খোঁদল হয়ে গেছে, সেই জায়গাটা জোড়া দেবার কাজ চলল! নির্জন সমুদ্রতীর মুখর হয়ে উঠল ওদের হাঁকডাক কথাবার্তায়।
পূর্ণোদ্যমে কাজ চলছে। হঠাৎ কে যেন বলে উঠল–ওটা কি? তার কণ্ঠে বিস্ময়। তার কথা যাদের কানে গেল, তারা ঘুরে লোকটার দিকে তাকাল। কি ব্যাপার? লোকটা আঙুল তুলে সেই মরুভূমির মত ধু-ধু বালির দিগন্ত দেখাল। সত্যিই তো। দিগন্ত রেখার একটু উঁচুতে কি যেন চিকচিক করছে, একটা, দুটো, তিনটে, অনেকগুলো। চিকচিক করছে যে জিনিসগুলো, সেগুলো চলন্ত। এদিকেই লোকটা আঙ্গুল তুলে সেই মরুভূমির মত। এগিয়ে আসছে। এতক্ষণে সবাই সেদিকে তাকাল। ধু-ধু বালির দিগন্ত দেখাল। সকলের চোখেমুখেই বিস্ময়। ওগুলো কি?
