আবার রাজা আর ফ্রান্সিসের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো।
মেস্তিজো কাঁপা কাঁপা গলায় দোভাষীর কাজ করতে লাগল।
ফ্রান্সিস-মেস্তিজোকে মুক্তি দিতে হবে।
রাজা-না, ও স্বর্ণমূর্তির খোঁজ জানে।
ফ্রান্সিস-না, ও জানে না। ও যা জানে সব আপনাকে বলেছে।
রাজা–না, ওকে মুক্তি দেওয়া হবে না।
ফ্রান্সিস-তাহলে স্বর্ণমূর্তির সন্ধান আমরা করবো না। আমরা জাহাজে ফিরে যাবো।
রাজা ভুরু কুঁচকে কী ভাবল। তারপর বলল-যদি মেস্তিজো পালিয়ে যায়?
ফ্রান্সিস-ওর দায়িত্ব আমাদের। ও পালিয়ে গেলে আমরা যে কোনো শাস্তি মেনে নেব।
রাজা লুপাকা ভেবে দেখলে যে ল্লামা মরে গেল, মেস্তিজো এত অত্যাচারেও কিছুই বলতে পারছে না, নিজের অনেক চেষ্টা করেও স্বর্ণমূর্তির হদিস করতে পারেনি-এখন যদি এই ভাইকিংরা হদিস বার করতে পারে তবে করুক না। বিদেশী বিধর্মী এরা। কাজ ফুরুলে মেরে ফেলাও যাবে।
–বেশ। রাজা বলল।
–মেস্তিজো সবসময় আমাদের সঙ্গে থাকবে। ওর সাহায্য খুবই প্রয়োজন। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা মাথা দুপাশে নাড়ল। তার মানে সম্মতি দিল।
–আর একটা কথা। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
–আমাদের অস্ত্রশস্ত্রগুলো ফেরৎ দিতে হবে। মারিয়া তো রাজপ্রাসাদে নজরবন্দী থাকবে। কাজেই আমরা তো আর ওকে ফেলে পালাতে পারবো না। ফ্রান্সিস বলল। রাজা সম্মতির ভঙ্গি করল।
ফ্রান্সিস আবার বলল-সারাদিনে মারিয়াকে একবার আমাদের সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে। অবশ্য মারিয়ার সঙ্গে আপনার প্রাসাদরক্ষীরাও থাকবে।
রাজা সম্মতির ভঙ্গি করল। ফ্রান্সিসদের হাতের বাঁধন একজন খুলে দিল। রাজসভা থেকে ফ্রান্সিসরা চলে এল। মেস্তিজোর পিঠের দিকটা তখনও রক্তে ভেজা। বাইরে এসে ফ্রান্সিস মেস্তিজোকে ওর কাঁধে ভর দিতে বলল। মেস্তিজো তখনও ভালো করে হাঁটতে পারছে না। ফ্রান্সিস বলল-মেস্তিজো, দলনেতাকে বলল যেন তোমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। দলনেতা ওদের সামনে সামনে যাচিছল। মেস্তুিজো ওকে কাঁপা কাঁপা গলায় সে কথা বলল। দলনেতা কিছু বলল না।
রাজবাড়ির পেছনদিকে ওরা কিছুদূর এল। একটা পাথরের বাড়ির সামনে দলনেতা দাঁড়াল। দরজা খুলে ফ্রান্সিসদের ইশারায় ঢুকতে বলল। ফ্রান্সিসরা বাড়িটায় ঢুকল। সামনের ঘরটা বেশ খোলামেলা। একপাশে শুকনো ঘাস বিছানো। দলনেতা হাততালি দিল। বাড়ির ভেতর থেকে দুজন লোক এঘরে ঢুকল। দলনেতা তাদের কী বলল।
মেস্তিজো ফ্রান্সিসকে বলল-এই দুজন আমাদের দেখাশুনা করবে।
লোক দুজনে বাড়ির মধ্যে গেল। একটু পরেই ফিরে এল। হাতে মোটা কাপড়ের কম্বলমতো। সেটা শুকনো ঘাসের গাদার ওপর পেতে দিল। মেস্তিজো বোধহয় জল চাইল। লোক দুজন চীনে মাটির বড় কুঁজোর মতো নিয়ে এল। ফ্রান্সিসরা প্রায় সকলেই জল খেল। ওরা বিছানায় বসল। মেস্তিজো শুয়ে পড়ল।
এবার দলনেতা মারিয়ার দিকে তাকিয়ে কী বলল। মেস্তিজো বলল-মারিয়া, দলনেতা আপনাকে রাজবাড়ির অন্দরমহলে রেখে আসবে। এখন যেতে বলছে। মারিয়া বিছানা থেকে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। ওর চোখ জলে ভিজে উঠল। মারিয়া বেশ শক্ত মনের মেয়ে। কিন্তু ফ্রান্সিসদের জন্যে ওর মন বেশ খারাপ হয়ে গেল। তাই দেখে ফ্রান্সিস হেসে বলল-মারিয়া, আমরা ভাইকিং। আমরা শুধু কব্জির জোরে লড়াই করি না, বুদ্ধির জোরেও লড়াই করি। আমাদের মন খারাপ করো না, যাও। দিনে একবার তো দেখা হবেই।
মারিয়া কোনো কথা বলল না। মাথা নিচু করে বোধহয় ফ্রান্সিসদের কথা ভাবতে ভাবতেই আস্তে আস্তে দলনেতার পেছনে পেছনে চলে গেল। ফ্রান্সিসদেরও মনটা খারাপ হয়ে গেল।
বিস্কো বলল-চলো ফ্রান্সিস, জাহাজে ফিরে যাই।
অসম্ভব, ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে বলল–বিস্কো তুমি আমাকে ভালো করেই জানে। তোমরা সবাই চলে গেলেও আমি একা এখানে থাকবো। স্বর্ণমূর্তি খুঁজবো, উদ্ধার করবো। তারপর ফিরবো।
-না-না ফ্রান্সিস, তোমাকে ছেড়ে যাবো না। বিস্কো দ্রুত বলে উঠল। শাঙ্কোও বলল-আমরা তোমার সঙ্গেই থাকবো।
ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় আধশোয়া হলো। ভাবতে লাগল স্বর্ণমূর্তির কথা। কোথায় কীভাবে রাখা হতো সেই মূর্তিটা তা দেখতে হবে। মেস্তিজো শুয়ে আছে। তখনওঁ অল্প অল্প গোঙাচ্ছে।
একটু পরেই একটা রোগা বেঁটেমতো লোক ঘরে ঢুকলো। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি গোঁফ। মাথায় হলুদ কাপড়ের পাগড়ি মতো। গলায় নানারঙের পাথরের মালা। লোকটার হাতে একটা চীনেমাটির বোয়াম। বোঝা গেল লোকটা বৈদ্য। বৈদ্য মেস্তিজোর কাছে গেল। পিঠের দিকে পঞ্চো সরিয়ে চাবুকের ক্ষত দেখল। তখনও ক্ষত থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। বৈদ্য বোয়াম থেকে থেকে সবুজ রঙের আঠা আঠা মতো একটা ওষুধ বের করল। আঙুল দিয়ে ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে দিল। মেস্তিজো একটু কঁকিয়ে উঠল। তারপর শান্ত হলো। বোধ হয় ব্যাথা জ্বালা একটু কমল। একটা ছোট ন্যাকড়ার পুটলি করে চারটে কালো বড়ি বাঁধল। মেস্তিজোকে কী বলল। তারপর চলে গেল।
দুদিন কেটে গেল। ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে সময় কাটাতে লাগল। মেস্তিজো সুস্থ না হলে কিছুই করার নেই। সেই দুদিনই মারিয়া এসে ওদের দেখে গেল। সেদিন ফ্রান্সিস মেস্তিজোকে বলল-এখন তোমার শরীর কেমন?
–অনেকটা ভালো। মেস্তিজো বলল।
