গুহাঘর থেকে সবাই বাইরে এল। দুজন সৈন্য মশাল হাতে সামনের দিকে চলল। পেছনে দলনেতা, অন্য সৈন্য আর ফ্রান্সিসরা চলল।
পাহাড়ী এলাকা পেরোতেই পুব আকাশ লাল হলো। একটু পরেই সূর্য উঠল। দেখা গেল এদিকটায় বালির চিহ্নমাত্র নেই। চারিদিকে সবুজ গাছগাছালি। বীন, তুলো আলুর ক্ষেত। মাঝে মাঝে দুচারটে পাথরগাঁথা বাড়ি। পেইকো ঘাসের ছাউনি। সেসব বাড়ি থেকে পুরুষ স্ত্রীলোক বাচ্চাকাচ্চারা বেরিয়ে এল।
অবাক হয়ে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। বিশেষ করে হলদে গাউন পরা মারিয়াকে। ওদের পরনে মোটা সুতোর হাতে তৈরি ঢোলা পোশাক। পোশাকে নানা রঙের সুতোর কাজ।
ধুলোটে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওরা ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই চিকামা পৌঁছাল। দেখা দেখা গেল সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের উপত্যকায় চিকামা নগর। এখানে জনবসতি বেশি। পাথরের বাড়িঘরও অনেক। চিকামার অধিবাসীরাও অবাক চোখে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। মারিয়ার পোশাক দেখে ওরা আশ্চর্য হলো বেশি।
একটা পথরের লম্বাটে ঘরের সামনে এসে দলনেতা দাঁড়ালো। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। একজন সৈন্য গিয়ে ঘরটায় কাঠের দরজায় লাগানো একটা বড় হুক টেনে খুলল। দলনেতা ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢোকার জন্য ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা ঘরটায় ঢুকল। ঘরে ঢুকেই ফ্রান্সিস বুঝল এটা কয়েদঘর। হাত বাঁধা অবস্থায় প্রায় আটদশজন লোক ঘরটায় শুয়ে বসে আছে।
ফ্রান্সিস মেস্তিজোকে সঙ্গে সঙ্গে বলল-দলনেতাকে বলল, আমাদের কেন। কয়েদঘরে রাখা হচ্ছে?
মেস্তিজো ভয়ে সেকথা দরজা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দলনেতাকে বলল! দলনেতার উত্তরটা মেস্তিজো ফ্রান্সিসকে বলল-দলনেতা বলছে, ও রাজাকে সব বলবে। তারপর আপনাদের ব্রাজসভায় রাজার সামনে উপস্থিত করবে। রাজা যা করার করবেন। ততক্ষণ কয়েদঘরেই থাকতে হবে।
অগত্যা ফ্রান্সিসদের এই বন্দী জীবন মেনে নিতেই হলো।
দুপুরের দিকে কয়েদঘরের রক্ষীরা বড় বড় পাতা পেতে ফ্রান্সিসদের খেতে দিল। হাত খুলে দিল। ওরা খেতে লাগল। ফ্রান্সিসরা বন্দীদশায় যেমন বরাবর বলে তেমনি বলল-পেট ভরে খাও। খেতে ভালো না লাগলেও খাও। শরীরটা ঠিক রাখো। মেস্তিজোর গুহাঘরে যে খাবার ফ্রান্সিস আর মারিয়া খেয়েছিল তেমনি খাবার। খুব সুস্বাদু হলেও খাবার অন্যরকম বলেই ভালো লাগলো। ফ্রান্সিস চেটেপুটে খেল। খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই সৈন্যদের দলনেতা সেই, বেঁটে বলশালী লোকটা এল। মেস্তিজোর সঙ্গে কী কথা হলো।
মেস্তিজো বলল-ফ্রান্সিস, চলো. রাজা আমাদের ডেকেছেন। রাজসভায় যেতে হবে।
হাত বাঁধা অবস্থাতেই ওরা দলনেতার পেছনে পেছনে চলল। রাস্তার দু–ধারের লোকজন বেশ ঔৎসুক্যের সঙ্গে ওদের দেখতে লাগল। রাস্তার পাশ থেকে হঠাৎ একজন পুরুষ ও একজন নারী ছুটে এসে মেস্তিজোকে মাথা নিচু করে দুহাত বুকে রেখে বোধহয় শ্রদ্ধা জানালো। সৈন্যরা ঐ দুজনকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। ফ্রান্সিস বুঝল, মেস্তিজো রাজপুরোহিতের শিষ্য ছিল। ওকে উনকারা এখনও শ্রদ্ধা করে। কিন্তু রাজা লুপাকার সৈন্যদের ভয়ে এগিয়ে এসে শ্রদ্ধা জানাতে সাহস পাচ্ছে না।
রাজবাড়িটা বেশ উচ, বড় ও পাথরের তৈরি। পাথরের ছাদ। ওরা রাজবাড়ির ভেতরে ঢুকল। একটু অন্ধকার মতো ভেতরটা। দিনের বেলায়ও পাথুরে দেয়ালে মশাল জ্বলছে। রক্ষীরা লোহার ছুঁচালোমুখ বশা হাতে পাহারা দিচ্ছে।
একটু এগোতেই ফ্রান্সিসরা দেখল রাজসভা চলছে। একটা পাথরের সিংহাসনে রাজা লুপাকা বসে আছে। দুপাশে আরো কয়েকটা পাথরের ছোট আসনে বোধহয় মন্ত্রী গণ্য মান্যরা বসে আছে। রাজা বেঁটে। বয়েস হয়েছে। তবু বেশ শক্তসমর্থ চেহারা। মাথায় লম্বা চুল। কপালে চকচকে কাপড়ের হলুদ রঙের ফেট্টি। তাতে সুন্দর লম্বা লম্বা পালক গোঁজা। দুকানের লতিতে সোনার কাঠি গাঁথা। গায়ে পঞ্চো। তবে পঞ্চোর কাপড় মোটা নয়। পাতলা। মুখের অর্ধেক অংশে লাল রঙ মাখা।
ফ্রান্সিসরা যখন পৌঁছল তখন একটা বিচার চলছিল বোধহয়। রাজা বোধহয় রায় দিল। বিচারপ্রার্থীরা মাথা নুইয়ে বুকে দুহাত রেখে সম্মান জানিয়ে চলে গেল। দলনেতা মাথা নুইয়ে দুহাত বুকে রেখে সম্মান জানিয়ে কী বলে গেল। রাজা ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
ফ্রান্সিস রাজার কঠিন মুখ দেখে আর ধূর্ত চাউনি দেখে বেশ চিন্তায় পড়ল। একে কি বোঝানো যাবে? তবে সোনা মণিমাণিক্যের লোভ বড় সাংঘাতিক। সেই লোভেই রাজা হয়তো ওদের কোনো বিপদে ফেলবে না।
এবার রাজা আর ফ্রান্সিসের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হলো। মেস্তিজো দোভাষীর কাজ করতে লাগলো।
রাজা-তোমরা ভাইকিং?
ফ্রান্সিস-হ্যাঁ।
রাজা মারিয়াকে দেখিয়ে বললো–এ কে?
ফ্রান্সিস-রাজকুমারী মারিয়া। আমার স্ত্রী।
রাজা-তোমাদের সব কথা শুনলাম। পারবে গুপ্ত স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করতে?
ফ্রান্সিস-সবকিছু দেখবো আগে, যতটা সম্ভব খবর সংগ্রহ করবো তারপর বলতে পারবো।
রাজা-বেশ, দ্যাখো চেষ্টা করে।
ফ্রান্সিস-এর জন্যে আমাদের মুক্তি দিতে হবে। সব জায়গায় অবাধে ঘুরতে দিতে হবে।
রাজা-বেশ, কিন্তু মারিয়াকে রাজপ্রাসাদে রাখা হবে। কথাটা বলে রাজা মৃদু হাসল। ফ্রান্সিস বুঝল ওরা যাতে পালিয়ে যেতে না পারে তাই মারিয়াকে নজরবন্দী রাখা হবে।
ফ্রান্সিস বলল–বেশ।
এবার রাজা মেস্তিজোর দিকে তাকাল। রাগে রাজার চোখমুখ লাল হয়ে গেল। ভয়ে মেস্তিজো বেশ কাঁপতে লাগল। চিৎকার করে রাজা কী বলে উঠল। একজন রক্ষী ছুটে এসে মেস্তিজোকে ধরল। ভয়ে মেস্তিজো কাঁদতে লাগল। মেস্তিজোকে টেনে হিঁচড়ে রাজার সামনে দাঁড় করানো হলো। আর একজন রক্ষী লম্বা চাবুক হাতে এগিয়ে এল। কোনো সামুদ্রিক মাছের সরু লেজ দিয়ে তৈরি চাবুকটা। চাবুকটার গায়ে ছোট ছোট কাটা। নির্মম হাতে চাবুক চালাল মেস্তিজোর গায়ে। মেস্তিজো যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠল। দেখা গেল পিঠে যেখানে চাবুকের ঘা পড়েছে সে জায়গা থেকে পঞ্চোতে রক্ত ফুটে উঠেছে। রাজা আবার চিৎকার করে কী বলে উঠল। মেস্তিজো বারবার মাথা নোয়াতে লাগল আর মুখে কী বলতে লাগল। ফ্রান্সিস বুঝল রাজা মেস্তিজোর কাছে গুপ্ত স্বর্ণমূর্তির হদিস জানতে চাইছে। আবার চাবুক আছড়ে পড়ার আগেই ফ্রান্সিস ডান হাত তুলে মেস্তিজোর কাছে দাঁড়াল।
