–আমাদের নিয়ে চিকামায় একটু ঘোরাঘুরি করতে পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
–পারবো।
–তাহলে আজই চলো। ফ্রান্সিস বলল। বিকেল নাগাদ ফ্রান্সিসরা মেস্তিজোকে সঙ্গে নিয়ে চিকামা দেখতে বেরুল। প্রথমে রাজ বাড়ির সামনে এল। রাজবাড়ি ওরা আগেই দেখেছে।
মেস্তিজোকে ফ্রান্সিস বলল–রক্ষীদের বলো, মারিয়াকে নিয়ে আসতে। মারিয়াও আমাদের সঙ্গে যাবে। মেস্তিজো একজন দ্বাররক্ষীকে বলল সে কথা। একথাও বলল যে, এটা রাজার হুকুম। রক্ষীটি রাজবাড়ির মধ্যে ঢুকল। একটু পরেই মারিয়া বেরিয়ে এল। ওদের সঙ্গে চলল। পেছনে দুজন রক্ষীও চলল।
পথে বেশ ভিড়। কিছুদুর আসার পর ডানদিকে একটা উঁচু বেদীমতো দেখা গেল। বেদীটি কাটা। বেদীর ওপরে একটা মূর্তি প্রায় ঢেকে গেছে। বেদীর সামনে এসে ফ্রান্সিস দেখল-মেস্তিজোর গুহাঘরে দেখা সেই কাঠের মূর্তির মতোই এই মূর্তিটা। তবে মেস্তিজোর মূর্তিটা ছিল ছোট। এটা একটু বড়। প্রায় আড়াই তিন ফুট।
মেস্তিজো বলল–এই আমাদের দেবতা হুয়াকার মূর্তি। তবে এটা আসল সোনার মূর্তি নয়, কাঠের।
–মেস্তিজো, মূর্তিটা থেকে ফুলপাতা সরিয়ে দাও। ফ্রান্সিস বলল। ভালো করে দেখি।
মেস্তিজো বেদীর মসৃণ সিঁড়ি বেয়ে উঠল। মূর্তিটা থেকে ফুলপাতা সরাল। সিঁড়িতেও ছড়িয়ে আছে ফুলপাতা ফ্রান্সিস মূর্তিটা ভালো করে দেখল। সত্যি, এত সুন্দর রঙ ব্যবহার করা হয়েছে যে মনে হচ্ছে সোনার মূর্তি। সিঁড়িতে বেদীতে পাথর কুঁদে কুঁদে ফুল লতাপাতার কাজ করা হয়েছে।
ফ্রান্সিস বলল-মেস্তিজো, এখানকার কারুকাজ কি তোমরা করেছে?
–না, রাজা কোলা নিজেই এই কারুকাজ করেছেন। রাজা কোলার আর একটা পাথরের কাজ দেখ। মেস্তিজো সামনে আঙুল তুলে দেখাল। দেখা গেল একটা বিরাট পাথরের মাথা। একটা ছোটখাটো আস্ত পাহাড় কেটে খুঁদে কুঁদে ঐ মাথাটা তৈরি করা হয়েছে।
মেস্তিজো বলল-এই মাথাটা পাথর কেটে আমরা তৈরি করেছি-রাজা কোলা, গুরুদেবল্লামা আর আমি।
–দেবরক্ষীর মাথা। মেস্তিজো বলল।
ফ্রান্সিস বলল–দেবরক্ষীরও পুজো হয় নাকি?
-–হ্যাঁ, হুয়াকা দেবতার সঙ্গে দেবরক্ষীরও পুজো হয়। মেস্তিজো বলল?
–অত উঁচুতে লোক ওঠে কি করে? ফ্রান্সিস বলল?
–অনেক উঁচু একটা কাঠের মই আছে।
সেটা কেয়ে সবাই ওঠে। ফুলপাতা দিয়ে পুজো করে। আমরাও পাথর কেটে তৈরি করার সময় ঐ মইটা ব্যবহার করতাম। মেস্তিজো বলল। ফ্রান্সিসরা স্বর্ণমূর্তির পাথরের বেদীতে ফুল-লতাপাতা, পাখির কাজ, দেবরক্ষীর মাথা সব দেখতে লাগল। সত্যি দুটোই দেখতে খুব সুন্দর। রাজা কোলা যে একজন দক্ষ ভাস্কর ছিলেন এসব দেখে সেটা স্পষ্টই বোঝা গেল। সব দেখেশুনে ফ্রান্সিসরা নিজেদের আস্তানায় ফিরে এল। মারিয়াকে নিয়ে রাজবাড়িতে চলে গেল।
দিন সাতেক কাটল। প্রায় প্রত্যেকদিনই ফ্রান্সিস মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে হুয়াকা দেবতার স্বর্ণমূর্তি দেবরক্ষীর মাথা দেখতে যায়। ঘুরে ফিরে দেখে। কিন্তু আসল স্বর্ণমূর্তি উদ্ধারের কোনো সূত্র পায় না। শাঙ্কোর কাছে এসব একঘেয়ে লাগে। ও তাই দুপুরের খাওয়া সেরেই তীরধনুক নিয়ে পাখি খরগোশ শোল শিকার করতে বেরিয়ে যায়। ডানদিকের সবুজ ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের ওপারেই বনজঙ্গল শুরু হয়েছে। খুব গভীর বন নয়। তবে গাছপালা প্রচুর। ঐ বনজঙ্গলেই শাঙ্কো শিকার করতে যায়।
এর মধ্যে রাজা লুপাকা ফ্রান্সিসকে ডেকে পাঠিয়েছিল। স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করতে পারবে কি না। পারলে কবে নাগাদ পারবে এসব জিজ্ঞেস করেছিল। মেস্তিজোর মারফৎ ফ্রান্সিস বলেছে–খোঁজ খবর করছি। কোনো সূত্র এখনও পাইনি। তবে
বেশিদিন লাগবে না।
সেদিনও শাঙ্কো তীরধনুক নিয়ে শিকারে বেরিয়েছিল দুপুরে খেয়ে দেয়ে। বিকেল হয়ে গেল তখনও ফিরল না। ফ্রান্সিস আর বিস্কো ভাবল শাঙ্কো বোধহয় বেশি শিকার পেয়েছে তাই আসতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু সন্ধ্যে হলো। রাত হলো শাঙ্কো ফিরল না। এবার ফ্রান্সিস আর বিস্কো চিন্তায় পরল।
ফ্রান্সিস মেস্তিজোকে বলল-শাঙ্কো এখনও শিকার থেকে ফিরল না, কী ব্যাপার বলো তো?
-ঐ তিতিকাকা জঙ্গলে হিংস্র প্রাণী নেই। তবে বিষধর সাপ আছে। শাঙ্কোকে কি সাপেই কামড়াল নাকি, ঠিক বুঝতে পারছি না। মেস্তিজো বলল।
ফ্রান্সিস ঘাসের বিছানায় আধশোয়া হয়ে ছিল। ভাবল, এভাবে অপেক্ষা করে দুশ্চিন্তাই বাড়বে শুধু। ঐ বনে-জঙ্গলে গিয়েই শাঙ্কোর খোঁজ করা ভাল। ও বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। ডাকল-বিস্কো অস্ত্র নাও। শাঙ্কোর খোঁজে যাবো। বিস্কো দেয়ালের খাঁজে রাখা তরোয়ালটা নিল। ফ্রান্সিস বিছানার তলা থেকে নিজেদের তরোয়াল বার করল। বলল-মেস্তিজো, তুমি আমাদের সবার সামনে চলো।
তিনজন ঘাসে ঢাকা পাহাড়ের দিকে চলল। মেস্তিজো সবার সামনে চলল। হাতে জ্বলন্ত মশাল। পাহাড় পেরিয়ে ওপাশে নামল। জঙ্গলে ঢুকল। খুব নিবিড় বন নয়। গাছপালা লতাগাছ এসব বেশ ছাড়া ছাড়া। ওরা মশালের আলোয় গাছপালার মধ্যে গিয়ে চলল বনে পথ বলে কিছু নেই। বেশ কিছুটা এল। কিন্তু ফ্রান্সিস ভেবে পেল না এই রাতের বেলা বন-জঙ্গলের মধ্যে কোথায় শাঙ্কোকে খুঁজবে। তবু দুহাতে তালু মুখের সামনে গোল করে চিৎকার করে ডাকল–শাঙ্কো-শাঙ্কো। কিন্তু নির্জন বনভূমিতে কোনো উত্তর ভেসে এল না। শুধু একটা পাখির দল কিচমিচ করে উঠল। রাতজাগা পাখিরা ডানা ঝাঁপটাল। বিস্কোও একইভাবে চিৎকার করে বলল–শাঙ্কো, আমরা এসেছি। তোমার কোনো ভয় নেই। শাঙ্কো-ও। কিন্তু সাড়া পাওয়া গেল না। ওরা এগোতে লাগল।
