–অবশ্যই-ফ্রান্সিস পায়চারি থামিয়ে বলল-আর আমি স্থির করে ফেলেছি ঐ স্বর্ণমূর্তি খুঁজে বের করতে আমি চিকামা উপত্যকায় যাবো।
-পারবে খুঁজে বের করতে? মারিয়া বলল।
আগে নকল মুর্তিটা দেখি। চারপাশ ভালো করে দেখি, তবেই বুঝতে পারবো মূর্তি উদ্ধার করতে পারবো কিনা। ফ্রান্সিস বলল। এবার ফ্রান্সিস মেস্তিজোর দিকে তাকিয়ে বলল-তুমি এই গুহাঘরে লুকিয়ে আছ কেন?
গুরুদেব ল্লামা মারা যাওয়ার পর রাজা পাকা আমার ওপর অত্যাচার শুরু করে-মেস্তিজো বলল–কোনোরকমে পালিয়ে এসে এখানে লুকিয়ে আছি।
–তুমি রাজা লুপাকাকে কী বলেছ? ফ্রান্সিস জানতে চাইল?
–ঐ যে কথাটা রাজা ল্লামাকে বলেছিলেন-সবই কপালের লিখন।
-হুঁ। ফ্রান্সিস কপাল কুঁচকে ভাবল একটুক্ষণ। বলল-রাজা লুপাকা বোধহয় কিছুই বোঝেনি।
–না। এই জন্যেই তো আমার উপর রাগ। এখানে লুকিয়ে থাকি। আমি তো রাজপুরোহিত ল্লামার সহকারী ছিলাম। তাই উনকারা আমাকে শ্রদ্ধা করে, ভালবাসে। আমার খাবার লুকিয়ে পাঠিয়ে দেয়। কখনো আমিও খাবার আনতে যাই। মেস্তিজো বলল।
-তুমি তাহলে উনকা ভাষা জানো। ফ্রান্সিস বলল।
অনলি বলতে পারি। মেস্তিজো বলল। ফ্রান্সিস বিস্কোদের দিকে তাকাল। বলল–বিস্কো, শাঙ্কো-বিকেল হয়ে গেছে। তোমরা অস্ত্রশস্ত্র এখানে রেখে জল নিয়ে জাহাজে চলে যাও। বন্ধুদের গিয়ে বল-আমরা চিকামা যাবো। স্বর্ণমূর্তি উদ্ধার করবো। ওরা যেন দিন দশ পনেরো আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে। ততদিন আমরা না ফিরলে ওরা যেন সশস্ত্র হয়ে চিকামায় যায়। সব বলে তোমরা দুজনে ফিরে এসো।
–বেশ–বিস্কো বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। শাঙ্কো উঠল। ফ্রান্সিস বলল-মারিয়া তুমি ওদের জাহাজে ফিরে যাও।
মারিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল–না, আমিও তোমাদের সঙ্গে চিকামা যাবে।
–বেশ, চলো–ফ্রান্সিস বলল-আমরা কিন্তু বেড়াতে যাচ্ছি না। যে কোনো মুহূর্তে বিপদে পড়তে পারি।
–আমি ভয় পাই না। মারিয়া দৃঢ়স্বরে বলল।
বিস্কো আর শাঙ্কে। সন্ধ্যের আগেই জলের পিঁপে নিয়ে জাহাজে চলে গেল। গুহাঘরটা একেবারে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার হয়ে গেল। মেস্তিজো চকমকি ঠুকে পাথরের খাঁজে রাখা একটা মশাল জ্বালাল। মশালটা সামুদ্রিক মাছের তেলে ভেজানে! ছিল। মেণ্ডিজে! ফ্রান্সিসকে তার মারিয়াকে শোনাচিছল ওর চিকায় কাটানো জীবনের কথা বেশ মনোযোগ দিয়ে সেই অভিজ্ঞতার কথা শুনছিল। ওর এর মনোযোগ দিয়ে শোনার উদ্দেশ্য যদি স্বর্ণমূর্তি উদ্ধারের কোনো সূত্র পাওয়া যায়।
একটু রাতে বিস্কো আর শাঙ্কো ফিরে এল। বলল-বন্ধুরা সবাই ফ্রান্সিসের কথা মন দিয়ে শুনেছে। ওরা খুসি হয়েছে ফ্রান্সিস আর এক অভিযানে যাচ্ছে শুনে। ওরা জাহাজ থেকে খাবার এনেছিল। রাতের খাওয়ার পর ওরা শুকনো ঘাস ছড়ানো বিছানায় শুয়ে পড়ল।
গভীর রাত তখন। দূরের সমুদ্রের মৃদু গর্জন শোনা যাচ্ছে। হঠাৎ কিসের শব্দে মারিয়ার ঘুম ভেঙ্গে গেল ও আর কোনো শব্দ হয় কি না শোনার জন্যে কান পেতে রইল। আবার শব্দ হলো। দু-চারটে পাথরের টুকরো বাইরে চাই পাথরের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। ও ফ্রান্সিসকে ফিসফিস করে ডাকল-ফ্রান্সিস, ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–শুনেছি। আসার পথে ধূসর রঙের শেয়াল দেখেছিলাম। বোধহয় শেয়ালের পাল, খাবারের ধাক্কায় এসেছে।
ঠিক তখনই কাঠের ফালিতে তৈরি গুহাঘরের দরজা খোলার শব্দ হলো। স্পষ্ট শব্দ। ফ্রান্সিস বিপদ আঁচ করল। একলাফে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। হাত বাড়িয়ে তরোয়ালটা নিয়ে চাপাস্বরে ডাকল-বিস্কো-শাঙ্কো।
বিস্কো শাস্কো তখনও ঘুমে অচেতন। মারিয়া ওদের জোরে ধাক্কা দিল। দুজনেই দ্রুত উঠে বসল। ততক্ষণে কয়েকজন লোক এসে গুহাঘরের মধ্যে দাঁড়িয়েছে নিঃশব্দে। মশালের আলোয় দেখা গেল-লোহার ছুঁচালো মুখওয়ালা বর্শা। সকলের হাতেই বর্শা। বশ ছোঁড়ার জন্যে উঁচিয়ে ধরল ওরা। লোকগুলো বেঁটে। শক্ত-সমর্থ। গায়ের রঙ হালকা তামাটে। মাথায় লম্বা চুল। কপালে লাল কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। তাতে পাখির পালক গোঁজা। পরনে ঢিলেঢালা পোশাক-পঞ্চো। মুখের দুপাশে লাল রং মাখা। শাঙ্কো দ্রুত তীর ধনুকের দিকে হাত বাড়াল। ফ্রান্সিস বলে উঠল-শাঙ্কো, আগেই লড়াই নয়। ফ্রান্সিস তরোয়াল ফেলে দিল। মেস্তিজোর দিকে তাকিয়ে দেখল ভয়ে মেস্তিজোর মুখ সাদা হয়ে গেছে। ফ্রান্সিস বলল-মেস্তিজো এরা কারা?
–রাজা লুপাকার সৈন্য। আমাকে ধরলে মেরে ফেলবে। সৈন্য ক জন কিন্তু ফ্রান্সিসদের আর মারিয়াকে দেখে অবাক। সৈন্যদের মধ্যে সবচেয়ে বলশালী লোকটা ভারী গলায় কী বলে উঠল। ফ্রান্সিস বলল-মেস্তিজো-এরা যা বলবে আমাকে তা বলো।
-–ও দলনেতা। বলছে–তোমরা কে? মেস্তিজো বলল।
–বলো, আমরা ভাইকিং। রাজা কোলার লুকোনো স্বর্ণমূর্তি আমরা খুঁজে বের করতে এসেছি। আমরা লড়াই চাই না। ফ্রান্সিস বলল। মেস্তিজো উনকা ভাষায় কথাগুলোকে দলনেতাকে বলল। দলনেতা কিছুক্ষন মাথা নিচু করে কী ভাবল। তারপর মাথা তুলে কী বলল। মেস্তিজো বলল-দলনেতা বলছে, ওরা আমার খোঁজে এসেছিলে। কিন্তু আপনারা বিদেশী। আপনাদেরও ওরা বন্দী করবে। রাজা লুপাকার কাছে নিয়ে যাবে। তারপর রাজা লুপাকা যা করবার করবে।
–খুব ভাল কথা। কিন্তু মেস্তিজো, ওকে বলো আমাদের কারো যেন কোনো ক্ষতি না হয়। ফ্রান্সিস বলল। মেস্তিজো কথাটা দলনেতাকে বলল। দলনেতা মাথাটা দুপাশে নাড়ল। বোধহয় কথাটা মেনে নিল। দলনেতার ইঙ্গিতে একজন সৈন্য নিজের কোমরে জড়ানো কালো রঙের লম্বা দড়ি বের করল। সেই দড়ি দিয়ে প্রথম মেস্তিজো তারপর মারিয়ার হাত বাঁধা হলো। তারপর ফ্রান্সিসদের বাঁধা হলো। আর একজন সৈন্য ফ্রান্সিসদের তরোয়াল শাঙ্কোর তীর ধনুক নিল। শাঙ্কো ওদের চোখের আড়ালে বড় ছোরাটা ঢোলা জামার মধ্যে লুকিয়ে রাখল।
