মেস্তিজো গল্প থামিয়ে ফ্রান্সিসকে বলল আপনি তো চিকাম যাননি। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। মেস্তিজো বলতে লাগল বড় সুন্দর জায়গা চিকাম। এখানে এক উঁচু পাথরের স্তূপের ওপর উনকাদের দেবমূর্তি প্রতিষ্ঠিত। নিখাদ সোনায় তৈরি সেই দেবমূর্তি কতদিন আগে তৈরি হয়েছিল কেউ জানে না। এই দেবমূর্তিকেই উনকার বলে হুয়াক। প্রতিদিন ল্লামা হুয়াকার পুজো করে। আমি ল্লামাকে নানাভাবে পুজোর ব্যাপারে সাহায্য করি। থাকি দেবমূর্তির পাথরের বেদীর কাছেই একটা পাথরের ঘরে ল্লামার সঙ্গে। এই ভয়াকা দেবতা মন্দিরের প্রাঙ্গনে মাঝে মাঝে উৎসব হয়। সারা চিকামার লোক দল বেঁধে আসে সেই উৎসব দেখতে পূজো দিতে ও আনন্দে অংশগ্রহণ করতে।
–সেই দেবতার স্বর্ণমূর্তি দেখতে কেমন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল। মেস্তিজো আঙুল দিয়ে গুহার প্রায় অন্ধকারে কোণায় রাখা একটা কাঠের মূর্তি দেখল। ফ্রান্সিসরা সেইদিকে তাকাল। দেখল কাঠের মূর্তি কয়েকটা। দেখতে এ রকম
–আসল মূর্তিটা কত উঁচু? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হাত আড়াই তিনেক। রাজপুরোহিতল্লামা শুধু পূজোআর্চা করত না। পাথর, এলগারোর গাছের আঁকাবাঁকা কাণ্ড কুঁদেমূর্তি বানাতো। আমিও তার কাছে থেকে তার সঙ্গে কাজ করে এসব বানানো শিখে ছিলাম। ঐ মূর্তিগুলো আমারই তৈরি। মেস্তিজো থামল। ফ্রান্সিস বেশ মনোযোগ দিয়েই মেস্তিজোর গল্প শুনছিল। তবে উৎসাহিত হবার কোন তথ্য পাচ্ছিল না।
–এবার তোমার সম্পর্কে বলো, ফ্রান্সিস বলল–তুমি চিকামা থেকে পালিয়ে এসে এখানে আত্মগোপন করে আছো?
–চিম রাজ্যের রাজা লুপাকা এবার রাজা কোলার মোচিকা রাজ্য আক্রমণ করার জন্যে সৈন্যবাহিনী গড়ে তুলতে লাগল। উত্তরের পাহাড়ী এলাকার উপজাতিদের নিয়ে লুপাকা এক দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিল। মাস তিনেক আগে লুপাকা সেই দুর্ধর্ষ সেনাদের নিয়ে মোচিকা রাজ্য আক্রমণ করেছিল। রাজা কোলা এই আক্রমণের সম্ভাবনার কথা গুপ্তচরের মারফৎ যখন শুনলেন তখন আর সৈন্য সাজিয়ে নতুন সেনা জোগাড় করে সেই আক্রমণের মোকাবিলা করার সময় নেই। তবু রাজা কোলা সৈন্যবাহিনী নিয়ে উত্তর সীমান্তের দিকে চললেন। কিন্তু সীমান্ত পর্যন্ত যাবার আগেই চিমু সেন্যরা আক্রমণ করল। সেই পাহাড়া বন্য হিং চিন সেনাদের সামনে রাজা কোলার সৈন্যবাহিনী দাঁড়াতেই পারল না। ধুলোর মত উড়ে গেল। শেষ পর্যন্ত লড়াই করে রাজা কোলা মৃত্যুবরণ করলেন। মোচিকা সৈন্যরা পিছু হটে এল। পরে চিমদের পদাতিক বাহিনীও এল। শুরু হল অগ্নিসংযোগ আর অবাধ লুণ্ঠন। রাজা লুপাকা চিকামার রাজ সিংহাসনে বসল। তারপর অত্যাচারের বন্যা বইয়ে দিল।
–লুপাকা এসে এখানে উনকাদের কাছে যত সোনা অলঙ্কার দামি পাথর পেল সব কেড়ে নিল। মাস দুয়েক কাটল। একদিন লুপাকা হুয়াকা স্বর্ণমূর্তি নিজের চিমু রাজ্যে নিয়ে যেতে চাইল। হুয়াকাভক্ত উনকাদের কোনো আপত্তিই সে গ্রাহ্য করল না। সৈন্যরা স্বর্ণমূর্তি নামিয়ে আনতে গেল। তখনই ধরা পড়ল যে, যে মূর্তিটা রাখা আছে সেটা সোনার নয় কাঠের। এত সুন্দর রঙ মিশিয়ে তৈরি যে কারো বোঝবার উপায় ছিল না। রাজা লুপাকা ভীষণ ক্ষেপে গেল। আসল স্বর্ণমূর্তি তাহলে কে সরিয়েছে? কে লুকিয়ে রেখেছে সেই স্বর্ণমূর্তি? রাজা লুপাকার যত রাগ গিয়ে পড়ল রাজপুরোহিত ল্লামার ওপর। ল্লামার সঙ্গে তার শিষ্য আমাকেও বন্দী করা হলো। ভাষণ অত্যাচার চলল ল্লামার ওপর। ল্লামা বলল-রাজা কোলার নির্দেশেই সে আসল স্বর্ণমূতির মতো একটি কাঠের মূর্তি তৈরি করেছিলো। সেটা নিয়ে রাজা কোলা কী করেছেন তা সে জানে না।
রাজা লুপাকার রক্ষীদের নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে রাজপুরোহিতল্লামা কয়েদঘরেই মারা গেল আমার কোলে মাথা রেখে। মস্তিজো থামল।
ফ্রান্সিস এতক্ষণে আধশোয়া হয়ে মেস্তিজোর কথা শুনছিলো। স্বর্ণমূর্তির রহস্যের কথা শুনেই ও সোজা হয়ে বসল-বোঝা যাচ্ছে রাজা কোলা আশঙ্কা করেছিলেন যে রাজা লুপাকা তার দেশ আক্রমণ করতে পারে। তার পরাজয় হতে পারে। যুদ্ধে জিতেও যাতে রাজা লুপাকা স্বর্ণমৃতি নিয়ে নিজের দেশে যেতে না পারে তার জন্যে তিনি নকল হুবুহু একরকম দেখতে একটা কাঠের মূর্তি ল্লামাকে দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন।
— ঠিক বলেছেন। মেস্তিজো বলল।
-–এখন প্রশ্ন হলো রাজা কোলা সেই আসল মূর্তি কো লুকিয়ে রেখেছিলেন? ফ্রান্সিস বলল।
–তাদের হদিস কেউ জানে না। মেস্তিজো বলল—রাকা লুপাকা এখন হন্যে হয়ে সেই আসল স্বর্ণমূর্তি খুঁজে বেড়াচ্ছে। ফ্রান্সিস কিছু নিচু করে তারপর ঘাসের বিছানা থেকে উঠে নকল কাঠের মূর্তিটার কাছে গেল। ভাল করে দেখল। বলল–মেস্তিজো, রাজপুরোহিত কি এ ব্যপারে কোনো ইঙ্গিত তোমাকে দিয়ে যেতে পারেনি?
-না, স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। তবে রাজা কোলাকে সে জিজ্ঞেস করেছিল–এই নকল কাঠের মূর্তি তিনি কেন এত করছেন? মেস্তিজো বলল।
–তার উত্তরে রাজা কোলা কী বলছিলেন? ফ্রান্সন্সি জানতে চাইল।
-শুধু হেসে বলেছিলেন-সবই কপালের লিখন। মেস্তিজো বলল।
-সবই কপালের লিখন–কথাটা ফ্রান্সিস বার কয়েক বিড়বিড় করে বলল। অর্থ কথাটার? ফ্রান্সিস গুহার পাথুরে মেঝেয় কয়েকবার পায়চারি করল। বিষ্কে বলল–ফ্রান্সিস, ব্যাপারটা কি তোমার কাছে রহস্যময় লাগছে?
