বিকেলের একটু আগে। পরিশ্রান্ত আমি আর জামিলি ঘরে শুয়ে বসে বিশ্রাম করছি এমন সময় কে যেন খবর দিয়ে গেল রাজা লুপাকা তার পরাজিত সৈন্যদের নিয়ে উত্তরে চিম্ রাজ্যে পালিয়ে যাচ্ছে। রাজা কোলা তাঁর সৈন্যদের নিয়ে চিকিমায় ফিরে এসেছেন। বিজয় উৎসব চলছে চিকিমায়। চিল্লাই শহরের লোকজন আনন্দে চিৎকার করতে করতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে লাগল আর রাজা কোলার জয়ধ্বনি দিতে লাগল।
তখন সন্ধ্যে হয় হয়। আমি শহরের পথে পথে কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে হৈ হল্লা শুনে ফিরে এসে ঘরে বিশ্রাম করছি। জামিলি আনন্দ উৎসব শেষ করে ফেরেনি। হঠাৎ শুনলাম কাঠের দরজায় হাত দিয়ে চাপড়াবার শব্দ। তেমন জোরে চাপড়ানো হয়নি। তবু আমি মৃদু শব্দ পেলাম। তাড়াতাড়ি উঠে গেলাম। দরজা খুলে দিলাম। দেখি একজন মধ্য বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। মুখের একপাশে হলুদ রং। মাথায় ফেট্টি। পালক গোঁজা তাতে। লোকটির গায়ে চাদরের মত একটা হলদে কাপড় জড়ানো। লোকটি এতক্ষণ মুখ নিচু করে জোরে জোরে শ্বাস ফেলছিলো। এবার মুখ তুলে তাকাতেই চমকে উঠলাম-আরে এ যে রাজ পুরোহিত গ্লাম। চিকামার হুয়াকা দেবতার পুরোহিত। আমি তাড়াতাড়ি ল্লামাকে দুহাতে তুলে মাথা নুইয়ে প্রণাম জানালাম। তারপর তাকে বাড়ির মধ্যে নিয়ে এলাম। ল্লামা তখন এত ক্লান্ত দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না। সারা গায়ে ধুলো বালি। স্ত্রীলোকেরা ল্লামাকে খুব যত্ন করে হাত মুখ ধুইয়ে খেতে দিল বীনের রুটি তরকারি। খেয়ে দেয়ে ল্লামা বিছানায় শুয়ে পড়ল। এতক্ষণে যেন শরীরে মনে একটু জোর পেল। জামিলি আমাকে চিকামা নিয়ে যেতো। হুয়াকা দেবতার পূজায় উৎসবেও গেছি। তখন ল্লামাকে দেখেছি। হুয়াকা দেবতার বেদী থেকে সমবেত ভক্তদের দিকে প্রসাদী ফুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে।
জামিলি তখনই বাড়ি ফিরল। ল্লামাকে দেখে সেও অবাক। জামিলি ল্লামারে মাথা নুইয়ে হাত বাড়িয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে জিজ্ঞেস করল-আপনার এ রকম অবস্থা হল কী করে? ল্লামা ক্লান্তস্বরে বলল-তার আগে বলো–যুদ্ধের সংবাদ কী?
রাজা কোলা জয়লাভ করেছে। লুপাকা তার সৈন্যদের নিয়ে চিন্ রাজ্যে পালিয়ে গেছে। ল্লামা খুশিতে প্রায় চিৎকার করে উঠল-রাজা কোলা দীর্ঘজীবী হোন। হুয়াকা দেবতার জয় হোক। এবার মা আস্তে আস্তে গায়ের লাল কাপড়টা বাঁদিকে সরাল। দেখা গেল কাঁধের কাছে বশর ক্ষত। গাছের লতাপাতা দিয়ে বাঁধা। রক্ত পড়ছে না। ল্লামা বলল-লুপাকার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়েছে জামতাম। দুপুরের দিকে তিতিকাকা হদের থেকে পূজের জল আনতে যাচ্ছি হঠাৎ পাঁচ ছজন সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে একেবারে আমার সামনে এসে হাজির। ওরা বোধহয় দলছুট সৈন্য ছিল। আমি তে! ছুটতে লাগলাম তিতিকাক বনের দিকে। ওরাও পিছু নিল। একজন বশ ছুঁড়ল। লাগল না আমার গায়ে। কিন্তু পরের বর্শাটি কাঁধ ছুঁয়ে গেল। কাটা জায়গা থেকে রক্ত ছুটল। আমি দাঁড়ালাম না। ঐ অবস্থায়ই ছুটে জঙ্গলে ঢুকে গেলাম। চি সৈন্যরা তিতিকাক বনের কিছুই চেনে না। আমাদের কাছে ঐ বনের সবই চেনা! তাল্পক্ষণের মধ্যেই আত্মগোপন করলাম গভীর বনের মধ্যে। কিন্তু বর্শার ঘায়ে কাধ থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়নি তখনও। কিছু বুনো লতাপাতা আমি চিনতা। সে সব পাতা থেঁতলে লাগালাম গায়ে। রক্ত পড়! বন্ধ হল। জ্বাল যন্ত্রণাও কমল। তারপর ঝোঁপ জঙ্গলের আড়ালে আড়ালে হাঁটতে হাঁটতে চাল। মরুভূমিতে এলাম। উত্তর দিক দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এই চিল্লাই এসে পৌঁছলাম। জানি তোমাদের সেবা শুশ্রয়ার কয়েক দিনের মধ্যে সুস্থ হবো। মেস্তিজো থামল। ফ্রান্সিস মেস্তিজোর জীবন কাহিনী বেশ মন দিয়ে শুনছিল। বলল-তারপর?
মেস্তিজো বলতে লাগল-দুতিন রাত জেগে খুব কষ্ট করে রাজ পুরোহিত ল্লামার সেবা শুশ্রূষা করলাম। ল্লামা দিন সাতেকের মাথায় একেবারে সুস্থ হয়ে গেল। এবার চিকিমা চলে যেতে হবে। আবার হুয়াকা তোর পূজো শুরু করতে হবে। রাজা কোলা যুদ্ধে জিতেছেন। কাজেই এবারের পূজোয় খুব ধূমধাম হবে।
গ্লামা যাবে পরদিন। তার আগের দিন রাতের বেলা জামিলিকে ডেকে বলল দেখ মেস্তিজোর প্রাণপণ সেবা শুশ্রূষাতেই আমি এত তাড়াতাড়ি সুস্থ হলাম। মেস্তিজো ছেলেটি খুবই সৎ পরিশ্রম আর দয়াবান। যদি তুমি আপত্তি না কর তবে মেস্তিজোকে আমি চিকামা নিয়ে যাবো। ওকে রাজপুরোহিতের সব ক্রিয়াকর্ম পদ্ধতি শেখাবো। আমার অবর্তমানে মেস্তিজোই হবে রাজপুরোহিত। জামিলি চুপ করে রইল। কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। ওদিকে আমার মন তখন আনন্দে নেচে উঠেছে। জামিলি আমার দিকে তাকাল। বলল-তোর কী ইচ্ছে বল।
–আমি ল্লামার সঙ্গে যাবো। আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম।
–বেশ। জামিলি আর কোন আপত্তি করল ন!। মুস্কিল হল জমিলির স্ত্রীকে নিয়ে। আমাকে জড়িয়ে ধরে তাঁর কান্না আর থামে না। সত্যি উনি আমাকে মার মত রেহ যত্নে মানুষ করেছিলেন। আমিও তাঁকে মা বলেই মেনে নিয়েছিলাম। যা হোক মাঝে মাঝে আসবে। এই কথা দিয়ে ছাড়া পেলাম। পরদিন ভোরেই ল্লামার সঙ্গে চললাম চিকাম। দুপুর নাগাদ চিকাম পৌঁছলাম। এর আগেও চিকামা। এসেছি। হপ্তাতে জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে। এখন এসেছি থাকতে। চিকামা শহরে থাকবো ঐ স্বপ্ন আমার অনেক দিনের। আজকে সেই স্বপ্ন সার্থক হল।
