আস্তে আস্তে জ্ঞান ফিরে এল। অস্পষ্ট কাদের কথাবাতা কানে আসতে লাগল। সেই শব্দ আস্তে আস্তে আমার কানে স্পষ্ট হল। কিন্তু সেই কথাবাতার কিছুই আমি বুঝতে পারছিলাম না। বেশ কষ্ট করে চোখ খুললাম। আমার গলায় গোঙানির শব্দ উঠল। কথাবার্তা থেমে গেল। কে একজন একটু দ্রুতই আমার মাথার কাছে এল। কপালে হাত রাখল। আমি দেখলাম মুখের দুপাশে রঙমাখা একটা মুখ। লোকটা আমার চোখ খোলা দেখে হাসল। আমি অনেক কষ্ট করে বললাম জল। লোকটি কিছুই বুজল না। তাকিয়ে রইল। আমি আস্তে আস্তে ডানহাতট তুলে জল খাওয়ার ভঙ্গি করলাম। লোকটা বুঝল। গলা চড়িয়ে কী বলল। সামুদ্রিক মাছের তেলের আলো জ্বলছিল ঘরটাতে। সেই আলোয় দেখলাম একজন স্ত্রীলোক চিনেমাটির বাটিতে জল নিয়ে ছুটে এল। স্ত্রীলোকটির মুখে কোনো রঙ লাগানো নেই। আমি মুখ হাঁ করলাম। স্ত্রীলোকটি আস্তে আস্তে মুখে জল ঢেলে দিতে লাগল। আমি থেমে থেমে অনেকটা জল খেলাম। মুখ গলা নাকের শুকনো ভাবটা কেটে গেল। অনেকটা স্বাভাবিক হলাম আমি। স্ত্রীলোকটি হাসল। আমার মুখের কাছে মুখ এনে কী বলল। কিছুই বুঝলাম না। স্ত্রীলোকটি এবার হাত তুলে মুখে চুঁইয়ে খাওয়ার ইঙ্গিত করল। আমি আস্তে আস্তে মাথা কাত করে সম্মতি জানালাম। স্ত্রীলোকটি চলে গেল। এবার লোকটি এগিয়ে এল। হেসে আমার মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। কী যে ভাল লাগল। রাতে খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। এত ক্লান্ত যে কথা বলতে পারছিলাম না। লোকটি ও স্ত্রীলোকটি আমায় অনেক কথা জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু ওদের ভাষা আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। চুপ করে থাকা ছাড়া উপায় কী? একটু থেমে মেস্তিজো আবার বলতে লাগল দিন চার পাঁচেক কাটল। আমি তখন অনেকটা সুস্থ। জানলাম যেখানে আমি আশ্রয় পেয়েছি সেটা একটা ছোট শহর। নাম চিল্লাই। লোকটির নাম জামিলি। সমুদ্রে মাছ ধরাই তার কাজ। চিল্লাই শহরের অধিকাংশ লোকই সমুদ্রে মাছ ধরেই সংসার চালায়। মেস্তিজো থামল, ফ্রান্সিস বলল তারপর? মেস্তিজো বলতে লাগল।
জামিলির আশ্রমে আমার দিন কাটতে লাগল। জামিলিরা যে ভাষায় কথা বলে তার নাম উনকা। জামিলির পরিবারের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমি তাড়াতাড়ি উনকা ভাষা শিখে গেলাম। মাছ ধরার কাজে জামিলিকে আমি সাহায্য করতাম। এইভাবে আমি ঐ পরিবারেরই একজন হয়ে গেলাম। জামিলির স্ত্রী মায়ের মত স্নেহে যত্নে আমাকে মানুষ করতে লাগল। মেস্তিজো এই পর্যন্ত বলে থামল। ফ্রান্সিস বেশ আগ্রহের সঙ্গে মেস্তিজোর জীবনের কাহিনী শুনছিল। মেস্তিজোকে একটু দম নিতে সময় দিল। তারপর বলল-মেস্তিজো তারপর কী হল বলো। মেস্তিজো আবার বলতে শুরু করলো-এবার চিকামা উপত্যকার কথা বলি। চিল্লাই থেকে বেশ কিছুটা উত্তরে চিকামা উপত্যকা। এই উপত্যকা ঘিরে গড়ে উঠেছিল মোচিকা রাজ্য। চিকামা উপত্যকাতেই রাজধানী চিকম। অনেক মানুষের বাস সেখানে। সবাই উনকা ভাষায় কথা বলে। তাই এদের বলা হয় উনকা। এই উনকাদের রাজা ছিল কোলা। খুব উদার হৃদয়ের মানুষ। এই মোচিক রাজ্যের উত্তরে চিরজা। সেই রাজ্যের রাজার নাম লুপাকা। একটু থেমে মেস্তিজো বলতে লাগল-দুই রাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের শত্রুতা। তখন আমি যুবক। নানা প্রয়োজনে আমাদের চিকাম যেতে হত। জামিলির সঙ্গে একদিন চিকামার উদ্দেশ্যে বেরোলাম। চিকামায় খুব ভালো মাছ ধরা জালের সূত্রে পাওয়া যায়। তা ছাড়া সংসারেরও কিছু জিনিসপত্র কেনাকাটা করার ছিল। আমরা যখন চিকামা পোঁছলাম তখন সন্ধে হয় হয়। এক সরাইখায় দুজনে আশ্রয় নিলাম। রাতে খেতে বসেছি তখনই সরাইখানার লোকজনের মুখে শুনলাম অবস্থা ভালো নয়। চিমুদের রাজা লুপাকা চিকিমার উত্তর সীমান্তে সৈন্য সাজিয়ে অপেক্ষা করছে। যে কোন মুহূর্তে মোচিকা রাজ্য আক্রমণ করতে পারে। জামিলি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল। খেয়ে উঠে শুতে এলাম দুজনে। ঠিক করেছিলাম সেদিন রাতটা বিশ্রাম নিয়ে পরদিন কেনাকাটা করবো। জামিলি বলল-কেনাকাটা দরকার নেই। কাল ভোরেই চিল্লাই রওনা হবো। এই চিকিমায় আর থাকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়। ভোরে উঠতে হবে। শুয়ে শুয়ে জামিলির মুখে উনকা আর চিমুদের শত্রুতার নানা গল্প শুনেছিলাম। জামিলি সে সব বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমিও এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম। একটু থেমে মেস্তিজো বলতে লাগল-গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল। চারপাশের বাড়িতে ও সরাইখানায় লোকজনের চিৎকার হৈ হল্লা চলছে তখন। জামিলি আর আমি দুজনেই ছুটে বাইরে এলাম। দেখলাম উনকা সৈন্যরা মশাল আর লোহার ছুঁচালো মুখ বর্শা হাতে রাস্তার দুধারে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরেই রাজবাড়ি থেকে রাজা কালো ঘোড়ায় চড়ে বেরিয়ে এল। পেছনে ঘোড়ায় চড়ে এল রাজার দেহরক্ষী সৈন্যরা। রাজা কোলার মাথায় লাল রঙের মোটা কাপড়ের ফেট্টি। তাতে লাল হলুদ বিচিত্র সব পাখির পালক গোঁজা। গায়ে কাঁচের টুকরো বসানো পঞ্চো। বিচিত্র রঙের সুতোর কাজ করা পঞ্চোটায়। জামিলি বলল এটাই নাকি রাজা কোলার যুদ্ধযাত্রার পোশাক। রাজা উত্তর দিকে ঘোড়া ছোটাল। পেছনে অশ্বারোহী দেহরক্ষীরা। তারপরে পদাতিক সৈন্যরা। চারদিকে ভিড় করে দাঁড়ালো। চিকিমার অধিবাসীরা চিৎকার করে রাজা কোলার জয়ধ্বনি দিল। সৈন্যরা উত্তর মুখে চলল। একটা নিচু পাহাড়ের আড়ালে পড়ে গেল রাজা কোলা আর তার সৈন্যরা। মেস্তিজো থামল। তারপর আবার বলতে লাগল কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম অন্ধকারে মশাল হাতে উত্তর দিক থেকে লোকজন ছুটে আসছে। খবর পাওয়া গেল চিমুদের রাজা লুপাকার সঙ্গে রাজা কোলার যুদ্ধ বেধে গেছে। শুরু হল লোকজনের চিৎকার চাচামেচি ছোটাছুটি। আমরা আর সরাইখানায় ঢুকলাম না। যুদ্ধের খবরের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। উত্তর দিক থেকে আবার কিছু লোকজন ছুটতে ছুটতে এল। তাদের কাছে খবর পাওয়া গেল প্রচণ্ড লড়াই চলেছে। কে জিতবে কে হারবে তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। একটু থেমে মেস্তিজো বলতে লাগল-বাকি রাতটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়েই কাটল। ভোর হল তখনও লড়াই চলছে। জামিলি আর আমি সরাইখানায় কলাম। নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে বাইরে এলাম। তখনও রাস্তাঘাটে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আর অপেক্ষা করলাম না। চিল্লাইয়ের উদ্দেশ্যে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছুটতে শুরু করলাম। দুপুর নাগাদ চিল্লাই এসে পৌঁছলাম। ক্লান্ত তৃষার্ত সারা শরীর ধূলিধূসরিত। চিক্লাইয়ের লোকজন আমাদের দেখে লড়াইয়ের খবর জানার জন্যে ছুটে এল। আমরা আর কথা বলতে পারছি না। তবু সংক্ষেপে বললাম সব। লড়াই চলছে। কে হারে কে জেতে বলা শক্ত।
