মারিয়া মেস্তিজোর খাবার খেতে চাইল। মেস্তিজো ঘাসে তৈরি ঝুড়ি থেকে রুটি, সামুদ্রিক মাছ, বন, লঙ্কামেশানো আলুর তরকারি বের করে দিল। ফ্রান্সিস মারিয়া খেতে লাগল। নতুন ধরনের খাবার। দুজনের ভালো লাগলো।
খাওয়াদাওয়ার পর মেস্তিজো বিছানায় পাতা কাপড় তুলে খড়গুলো গুহার মেঝেয় আরও জায়গায় ছড়িয়ে দিল। তারপর দুটো কম্বল মতো মোটা কাপড় পেতে দিল। ফ্রান্সিসরা সবাই বসল তাতে। শাঙ্কো শুয়ে পড়ল, বিস্কো আধশোয়া হলো। ফ্রান্সিস, মারিয়া আর মেস্তিজো বসে রইল। এতক্ষণ ফ্রান্সিস ভাবছিল–মেস্তিজোর কথা। স্পেনীয় ভাষায় কথা বলে অথচ আচার আচরণ মোটেই স্পেনীয়দের মতো নয়। ওর আসল পরিচয়টা কী? এই গোপন গুহাঘরে লুকিয়ে থাকে কেন? ফ্রান্সিস ডাকল–মেস্তিজো?
–বলুন?
–দেখ তোমার ভাষা শুনে বুঝেছি তুমি স্পেনীয়। অবশ্য তোমার কথা কিছুটা ভাঙা ভাঙা তবু ভাষাটা তো স্পেনীয়। তাছাড়া তুমি আমার স্পেনীয় ভাষাও বুঝতে পারছে। অথচ তোমার এখনকার চেহারা মোটেই স্পেনীয়দের মতো নয়। কী ব্যাপার বলো তো? ফ্রান্সিস বলল।
মেস্তিজো আস্তে আস্তে ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলতে লাগল–সে অনেকদিন আগের কথা। আমার বয়স তখন ছয় সাত। স্পেনের ডিমেলো শহরে বাবা-মার সঙ্গে থাকতাম। এটুকু আমার মনে আছে। বাবা মালবাহী জাহাজে কাজ করতেন। তখন একবার বাবা-মার সঙ্গে আমিও সমুদ্রযাত্রায় বেরোলাম। মাস চার পাঁচ জাহাজেই কাটল। ঝড় ঝাঁপটায় আমাদের জাহাজ বার কয়েক প্রায় ডুবে যাচ্ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করে আমরা বেঁচে থেকেছি। জাহাজ ডোবেনি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।
একদিন আকাশে ঘন মেঘ করে সন্ধ্যের পরেই ঝড় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। তবু বাবা আর জাহাজের নাবিকেরা ঝড়ের মোকাবিলা করবার জন্য তৈরি হল। চলল ঝড়ের সঙ্গে লড়াই। বড় বড় পাল সব নামিয়ে ফেলা হল। ঝড়ের ঝাঁপটায় প্রচণ্ড বেগে জাহাজ দুলতে লাগল। এই জাহাজটা ঢেউয়ের মাথায় উঠে যাচ্ছে পরক্ষণেই ঢেউয়ের ফাটলে নেমে আসছে। জাহাজের প্রচণ্ড দুলুনিতে আমরা কেবিন ঘরের এদিকে ওদিকে ছিটকে পড়ছি। অনেকের মাথা ফাটল, হাত পা ভাঙল। আমি ডেক যেতে সাহস পেলাম না।
আকাশ মুহুর্মুহু বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাজ পড়ছে। হঠাৎ জাহাজটা ভীষণ জোরে দুলে উঠল। ঝড়ের শব্দ ছাপিয়ে কানে এল মড়মড় শব্দ। জাহাজটা কাত হতে লাগল। একটু পরেই অনেকটা কাত হয়ে গেল। কেবিন ধরে আমি একা, বাবা আর তার বন্ধুরা ডেকে গেছে ঝড়ের সঙ্গে লড়াই করতে। হঠাৎ নাবিকদের চিৎকার-জাহাজ ডুবছে। সাবধান। তখনই দেখি পায়ের কাছে জল ঢুকতে লাগল। তমি বুঝলাম আর এখানে থাকা চলবে না। জাহাজ ডুবছে। দ্রুত ছুটলাম সিঁড়ির দিকে। সিঁড়ি দিয়ে কি উঠতে পারি? সিঁড়ি হদোলামত দুলছে। কোনরকমে শরীর পা ঠিক রেখে ডেকএ উঠে এলাম। ততক্ষণে কেবিনঘরগুলো ডুবিয়ে দিয়ে সমুদ্রের জল ডেকএ উঠে এসেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠছে। তারই আলোতে বাবাকে খুঁজতে লাগলাম। ওদিকে নাবিকেরা একে একে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আমি বুঝলাম বাবাকে এই অবস্থায় খুঁজতে গেলে আমি আর বাঁচব না। তখন আমি হালের কাছে এসেছি। দেখি দড়ি বাঁধা একটা কাঠের থাম মত। আমি মাথাটা গড়িয়ে নিয়ে চললাম। ডেক-এর রেলিঙের ধারে নিয়ে এলাম। তারপর নিজের শরীরটা দড়ি দিয়ে থামটার সঙ্গে বাঁধলাম। ঠিক তখনই বোধহয় জাহাজটা ডুবে গেল। কয়েকজন নাবিকের চিৎকার কোলাহল শুনলাম। বিরাট এক ঢেউয়ের ধাক্কায় থামসুন্ধু আমি ছিটকে পড়লাম ঝড়োন্মত্ত সমুদ্রে। প্রাণপণে থামটা জড়িয়ে ধরলাম। ঢেউয়ের ধাক্কায় বিদ্যুতের আলো ঝলসে ওঠা সমুদ্রের ওপর দিয়ে আমি ভেসে চললাম। কতক্ষণ জানি না। আমার আর কিছু মনে নেই।
যখন চোখ খুললাম দেখি ভোর হয়েছে। সমুদ্রের ধারে ভেজা বালির মধ্যে থাম জড়িয়ে ধরে আমি পড়ে আছি। নুনে বালিতে চোখ বুঝে গেছে। খুলতে কষ্ট হচ্ছিল। কিছুক্ষণ শুয়ে রইলাম। হাওয়ার শব্দ। সমুদ্রের মৃদু গর্জন শুনতে লাগলাম। তারপর আস্তে আস্তে চোখ খুললাম। রোদের তেজ বাড়তে লাগল। শরীরটা গরম হল। আস্তে আস্তে থামে বাঁধা দড়িটা খুললাম। তারপর বালিয়াড়িতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। মাথাটা ঘুরে উঠল। টাল সামলে সোজা হলাম। চারদিকে তাকালাম। একদিকে সমুদ্র। অন্যদিকে ধূধূ বালি। সবুজের চিহ্নমাত্র নেই। এখানে পড়ে থাকলে না খেয়ে মরতে হবে। কাজেই কোথাও লোকজন বাড়িঘর আছে কিনা খুঁজে বের করতে হবে। সেই বালির মরুভূমির ওপর দিয়ে হেঁটে চললাম আমি।
আস্তে আস্তে সূর্য পশ্চিমদিকে অনেকটা নেমে এল। গত সন্ধ্যেয় পেটে কিছু পড়েনি। গলা শুকিয়ে কাঠ। ক্ষুধা তৃষ্ণায় মৃত প্রায় আমি টলতে টলতে হেঁটে চললাম।
হঠাৎ দেখি একটু দূরেই কিছু বাড়িঘর। ঠিক দেখছি তো? দুচোখ কচলে নিলাম। হা-থাম দেওয়া পাথরের বাড়িঘর। আমি আনন্দে চিৎকার করে উঠতে গেলাম। গলা দিয়ে কোন শব্দই বেরোলো না। হাঁটতে লাগলাম। এখানে বালি গরম নয়। বালি মাটি মেশানো শক্ত জমি। আমি তখন আর হাঁটতে পারছি না। সেই জমির ওপর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে চললাম।
প্রথম যে বাড়িটা পেলাম সেটার দরজার ওপর আমি হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। কাঠের ফালি কেটে তৈরি দরজাটা দড়াম করে খুলে গেল। সেই শব্দটাই আমি শেষ শুনেছিলাম। তারপরই আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম। আর কিছুই মনে নেই।
