মারিয়া হেসে বলল–কিছছু না।
-এবার ফ্রান্সিস অন্যদের দিকে তাকাল। বলল-এখন মারিয়াকে তোলা যায় কী করে?
-জাহাজ থেকে দড়ি আনতে হবে। বিস্কো বলল
ওদিকে মারিয়া গহুরটার চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। একটু অন্ধকার হলেও পাথুরে দেয়াল, খোঁদল এসব দেখতে পাচ্ছিল। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা গুহার মুখ। মুখটা বেশ বড়। একজন মানুষ মাথা উঁচু করে ঢুকতে পারবে। মারিয়া আস্তে আস্তে গুহাটার মূখে এসে দাঁড়াল। দেখল কাঠের ফালি দিয়ে তৈরি একটা দরজা গুহার মুখটায়। তার মানে এই গুহায় নিশ্চয়ই মানুষ থাকে। তাহলে এই গহ্বর থেকে বেরোবার পথও নিশ্চয়ই আছে। মারিয়া চারিদিকে ঘুরে ঘুরে পথ খুঁজতে লাগল। কিন্তু পথ কোথায়? চারিদিকেই পাথরের অমসৃণ গা। হঠাৎ এক জায়গায় দেখল যেন ওখানে অন্ধকারটা কম। মারিয়া দ্রুত পায়ে সেখানে এল। দেখল দুটো পাথরের মাঝখানে একটা পাথরের ফাটল। মারিয়া বালির ওপর হাঁটু মুড়ে বসল। তারপর বালির ওপর হামাগুড়ি দিয়ে ফাটলের মধ্যে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। তার মানে এই গুহায় যে বা যারা থাকে তারা এই পথেই যাতায়াত করে। লুকিয়ে থাকার পক্ষে ভালো জায়গা।
মারিয়া বাইরে পাথরের চাঁইয়ের নিচে এসে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে ডাকল-ফ্রান্সিস। বিস্কো তখন জলের খালি পিঁপে রেখে জাহাজ থেকে দড়ি আনতে যাবে বলে তৈরি হচ্ছে। তখন মারিয়ার ভাক ওদের কানে গেল। ওরা তাড়াতাড়ি পাথরের চাই থেকে নেমে এল। দেখল মাবিয় দাঁড়িয়ে আছে। মারিয়া বলল-এই গহ্বরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার পথ আছে।
–ভালই হলো, ফ্রান্সিস বলল–আমরা তোমাকে দড়ি দিয়ে তুলব ভাবছিলাম।
–ফ্রান্সিস–এর ভেতর একটা গুহা আছে। গুহার মুখের কাঠের দরজ! আছে। মনে হয় মানুষ বাস করে।
-বলো কি। ফ্রান্সিস একটু আশ্চর্য হলো।
বিস্কো বলল–চলে! ফ্রান্সিস দেখা যাক।
সবাই হামাগুড়ি দিয়ে ফাটল পেরোল। গুহার মুখে এসে দাঁড়াল। ফালি কাঠের দরজাটা একটুকরো দড়ি বাঁধা ছিল। ফ্রান্সিস খুলল দড়িটা। তারপর একে একে সবাই গুহাটায় ঢুকল। ভেতরটা বেশ অন্ধকার। চোখে ভাবটা সয়ে আসতে ওর দেখল–গুহার একপাশে শুকনো ঘাসের বিছানা। তার ওপর মোটা কাপড়ের কম্বল মতো পাতা। অন্য পাশে পোড়া হাঁড়ি কুড়ি, পাথরের টুকরো পেতে উনুন। একপাশে এলগারোরো গাছের বাঁকা কান্ড কুঁদে কুঁদে তৈরি বিচিত্র সব মূর্তি। এসব
কী মূর্তি ফ্রান্সিসরা বুঝল না। আবার মা-ছেলে, বিয়ের বর-কনে, এসবের মূর্তিও আছে। ওরা বুঝল এখানে একজনই মানুষই থাকে। বিছানায় একটা মাত্র ঢিলাঢালা পোশাক পঞ্চো পড়ে আছে। সব দেখেটেখে ফ্রান্সিস বলল–চলো, আর কিছু দেখার নেই। তবে লোকটাকে পেলে এখানে জলের সন্ধান পাওয়া যেত।
ওরা গুহর বাইরে আসতেই একজন মধ্যবয়স্ক লোকের মুখোমুখি পড়ল। লোকটা ভীষণভাবে চমকে উঠল। ও বোধহয় ওর গোপন আস্তানা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত ছিল। লোকটা দ্রুত পেছন ফিরল। পালাবার ধান্ধা। বিস্কো জোরে ছুটে গিয়ে লোকটার ঢিলেঢালা পোশাক পঞ্চোটা পেছন থেকে চেপে ধরল। লোকটার পালানো হলো না। বিস্কে লোকটাকে ধরে ফ্রান্সিসের কাছে নিয়েএল। লোকটা বেশ ভয় পেয়ে গেছে বোঝা গেল। লোকটার কাছে আসতে ফ্রান্সিস হেসে হাত তুলে ওকে ভয় না পেতে ইঙ্গিত করল। লোকটা যেন একটু নিশ্চিন্ত হলো। ফ্রান্সিস কথা বলতে গিয়ে সমস্যায় পড়ল। কী ভাষা বুঝবে লোকটা? ফ্রান্সিস প্রথমে পর্তুগীজ ভাষায় জিজ্ঞেস করল–তোমার নাম কী? লোকটা বুঝল না। তাকিয়ে রইল। এবার ফ্রান্সিস প্যানিশ ভাষায় বলল–তোমার ভয় নেই। তোমার নাম বলো। লোকটার চোখমুখ উজ্জ্বল হলো। বোঝা গেল ও ফ্রান্সিসের কথা বুঝছে। লোকটা ভাঙা ভাঙা স্প্যানিশ ভাষায় বলল,–আমি মেস্তিজো–চিকিমাদের দেবতার পূজারী।
ফ্রান্সিস এবার ভালোভাবে মেস্তিজোকে দেখল। মেস্তিজোর মাথায় লম্বা লম্বা চুল। মুখের দুপাশের আধখানায় হলুদ রঙ মাখা। দুকানের লতিতে সোনার কাঠি বেঁধানো। পরনে ঢিলেঢাল; পঞ্চে পোশাক। ওর একহাতে একটা ঘাসের তৈরি ঝুড়ি। তাতে ক্যারোপ বীন এর বেশ কয়েকটা রুটি। অন্য হাতে একটা চীনেমাটির কুঁজো মতো। বোঝা গেল খাবার জল তাতে। ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হলো যে মেস্তিজোর হাতে অস্ত্র নেই। তার মানে সে যোদ্ধা নয়। ফ্রান্সিস বলল–মেস্তিজো, তোমার কোন ক্ষতি আমরা করবো না। আমাদের জাহাজ সমুদ্রতীরে রয়েছে। আমরা পানীয় জল নিতে এসেছি। তুমি পানীয় জলের জায়গাটা দেখিয়ে দাও। ফ্রান্সিস কথাগুলো থেমে থেমে বলল, যাতে মেস্তিজো সহজে বুঝতে পারে।
মেস্তিজো মাথার লম্বা লম্বা চুল ঝাঁকিয়ে বলল–লো জলের জায়গা দেখিয়ে দিচ্ছি ফ্রান্সিস বিস্কে তার শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল–তাহলে তোমরা ওর সঙ্গে যাও। জল নিয়ে এসো।
মেস্তিজো হাতের খাবারের ঝড়ি জলের কুঁজো ওর গুহাঘরে রেখে এল। তারপর জলের জায়গা দেখাতে চলল। পেছনে পিঁপে নিয়ে বিস্কো ও শাঙ্কে চলল। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া–চলো আমরা গুহাঘরে গিয়ে বসি। দুজনে এসে ফালি কাঠের দরজা খুলে গুহায় ঢুকল। খড়ের বিছানায় গিয়ে বসল দুজনে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বিস্কোরা পিঁপে ভর্তি জল নিয়ে ফিরে এল। এদিকে বেশ বেলা হয়ে গেছে সকলেরই খিদে পেয়েছে। জাহাজ থেকে খাবার দাবার আনা হয়েছিলো। মারিয়া সে সব খাবার সবাইকে ভাগ করে দিল। মেস্তিজোকেও দেওয়া হলে। মোস্তিজে খুব খুশি। ফ্রান্সিস বলল–মেস্তিজো–আমি তোমার খাবার খাবো। তুমি আমাদের খাবার খাও।
