নিরস্ত্র জলদস্যুর দল থেকে একজন যুবক জলদস্যু ফ্রান্সিসের সামনে এসে দাঁড়ালো। বলল–আমাদের ক্যাপ্টেন মারা গেছে। এখন আমরা কি করবো?
ফ্রান্সিস হ্যারিকে ডেকে বলল–এখন এই জলদস্যুদের নিয়ে কি করবে?
-ওদের মুক্তি দেব-ওদের কারাভেল জাহাজ নিয়ে ওরা চলে যাবে। কিন্তু একটি প্রতিজ্ঞা ওদের করতে হবে বাকি জীবন ওরা আর জলদস্যুতা করবে না। দেশে ফিরে সৎ জীবনযাপন করবে।
ফ্রান্সিস যুবকটির দিকে তাকাল, বলল—কী, এই শর্তে তোমরা রাজী?
–হ্যাঁ আমরা রাজী। যুবকটি বলল।
–কিন্তু একটা সমস্যার সমাধান এখনই করতে হবে। হ্যারি বলল।
–দেখ–আলবার্তোর কেবিন ঘরে নিশ্চয়ই লুণ্ঠিত ধনসম্পদ রয়েছে। এখন আলবার্তো মারা গেছে ঐ লুঠ করা সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে এবার এই জলদস্যুদের নিজেদের মধ্যে মারামারি খুনোখুনি শুরু হয়ে যাবে।
ফ্রান্সিস একটু ভাবল। বলল–কথাটা সত্যি। এই ধনসম্পত্তি কি হবে?
শাঙ্কো বলল–ওগুলো আমরা দেখে নিয়ে গিয়ে রাজার জাদুঘরে রাখবো।
–না শাঙ্কো, ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–অনেক নিরীহ মানুষের রক্তে ভেজা ঐ অভিশপ্ত ধনসম্পদ আমরা কোনমতেই নেবো না। হ্যারিকে দায়িত্ব দিচ্ছি–হ্যারিই ঐ ধনসম্পদ জলদস্যুদের মধ্যে যতটা সম্ভব সমান ভাগে ভাগ করে দেবে।
–বেশ! হ্যারি রাজি হলো। জলদস্যু যুবকটিকে হ্যারি বলল,–চলো–তোমাদের সঙ্গে কথা আছে। যেখানে জলদস্যুরা বসে আছে। যুবকটিকে নিয়ে হ্যারি সেদিকে গেল।
মারিয়া এগিয়ে এল ফ্রান্সিসের কাছে। বলল, তুমি আহত। কাটা জায়গা থেকে এখনো রক্ত পড়ছে। তুমি কেবিনে চলো। তোমার বিশ্রামও দরকার।
–হ্যাঁ চলে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বিক্ষোকে বলল–আমাদের জাহাজ চালককে বলো আমাদের জাহাজটা যতটা সম্ভব তীরের কাছে যেন নিয়ে যায়।
দুপুরে খাওয়ার পর হ্যারি ফিরে এলো। ফ্রান্সিসকে বলল–ভাগবাঁটোয়ারা করে এসেছি এবার কি করবে?
–ওদের কারাভেল জাহাজের সঙ্গে আমাদের জাহাজটি যে দড়ি দিয়ে বাঁধা সেটা শাঙ্কোকে কেটে দিতে বলো। জলদস্যুরা ওদের জাহাজ করে দেশে ফিরে যাক।
তাই করা হলো। জলদস্যুদের মুক্তি দেওয়া হলো। ওরা ওদের কারাভেল জাহাজে তাড়াতাড়ি পাল খাটাল। হাওয়ার তোড়ে পাল ফুলে উঠল। ওদের জাহাজ গভীর সমুদ্রের দিকে চলল। ডেকে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস তা দেখল।
কিছুক্ষণ পরে রসুইঘর আর ভাঁড়ার ঘরের দায়িত্ব যে তিনজন ভাইকিং-এর হাত ছিল তারা ফ্রান্সিস আর হ্যারির কাছে এল। একজন বলল—এবার কি দেশে ফিরবে?
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল। অন্য ভাইকিংটি বলল—কিন্তু আমরা জানিনা আমরা কোথায় এসেছি। তীরের যে বালিয়াড়ি দেখছি তাতে বুঝতে পারছি না এটা কোনো দেশ না দ্বীপ। দিক ঠিক করে দেশে ফিরতে আমাদের কতদিন লাগবে জানি না।
–তা তো ঠিকই, হ্যারি বলল।
অন্য ভাইকিংটি বলল–ভাঁড়ার ঘরে যা ময়দা চিনি খাবার দাবার আছে তাতে তবু কিছুদিন চলবে। কিন্তু খাবার জলের পরিমান অনেক কমে গেছে। কিছু খাবার জল না জোগাড় করতে পারলে সাংঘাতিক সমস্যায় পড়ে যাবে।
ফ্রান্সিস হ্যারি দুজনেই ভাবল কিছুক্ষণ। হ্যারি প্রথমে বলল-ফ্রান্সিস, যে ভাঙাটা দেখা যাচ্ছে ওখান থেকেই খুঁজে পেতে খাবার জল জোগাড় করতে হবে। তারপর দিক ঠিক করে দেশের দিকে পাড়ি দেবো।
–ঠিক বলেছো তোমরা-ফ্রান্সিস বলল–তাইলে কালকেই আমরা তীরে নামবো। দ্বীপ হোক আর দেশ হোক খাবার জল খুঁজে বার করতেই হবে।
পরদিন সকালের খাবার খেয়েই ফ্রান্সিস বিস্কো আর শাঙ্কোকে তৈরি হয়ে আসতে বলল। বিস্কো তরোয়াল নিয়ে এল আর শাঙ্কো তীর ধনুক নিয়ে এল। মারিয়ার যাওয়ার ব্যাপারে ফ্রান্সিস দুএকবার আপত্তি জানাল। কিন্তু মারিয়া জেদ ধরল ও ওদের সঙ্গে যাবেই। অগত্যা ফ্রান্সিস আর আপত্তি করল না।
জাহাজের গায়ে ঝোলান একটা শক্তপোক্ত নৌকা জলে নামানো হলো। দড়ি বেয়ে বেয়ে ফ্রান্সিসরা জাহাজ থেকে নৌকায় নেমে এল। মারিয়াকে নামানো হলো দড়ির জালে দাঁড় করিয়ে। খাবার দাবার, খাওয়ার জল এসব প্রয়োজনীয় জিনিস আগে থেকে নৌকায় রাখা হয়েছিল আর দুটো জল রাখবার খালি পিঁপে। মারিয়া নেমে আসতেই বিস্কো নৌকো ছেড়ে দিল। বিস্কো আর শাঙ্কো নৌকো বাইতে লাগল তীরভূমি লক্ষ্য করে।
আধ ঘন্টার মধ্যে নৌকো তীরে ভিড়ল। ফ্রান্সিসরা নামল। মারিয়া কিন্তু কারো সাহায্য ছাড়াই নৌকো থেকে লাফিয়ে নামল। সবাই বিস্তীর্ণ বেলাভূমির বালির ওপর দিয়ে হাঁটতে লাগল।
অনেকটা হাঁটার পর ওরা থামল। দেখল যতদূর চোখ যায় শুধু ধু ধু বালির প্রান্তর। ওরা আবার হাঁটতে শুরু করল।
সাদা-ধূসর রঙের বালি। কোনদিকে সবুজের চিহ্ন নেই। দুএকটা পাখি মাঝে মাঝে বালিতে ছায়া ফেলে উড়ে যাচ্ছে। তীব্র বোদ-বালিতে প্রতিফলিত হয়ে চোখে এসে লাগছে। ধাঁধিয়ে যাচ্ছে চোখ। গরম হাওয়া বইছে।
কিছুক্ষণ চলার পর ওদের নজরে পড়ল ক্ষয়িত শিলার তালচে পাহাড়। বেশি উঁচু নয়। তার ওপাশে কিছু সবুজ গাছগুলির মাথা দেখা গেল। ফ্রান্সিস আশ্বস্ত হলো-যাক মরুভূমির মত জায়গাটা খুব দূরবিস্তৃত নয়।
টানা পাহাড়ের কাছে ওরা এল। পাথরে পা রেখে ওরা পাহাড়টায় উঠল। দেখল ওপাশে একটু দূর থেকে বনভূমি শুরু হয়েছে। খুব ঘন ঘন বন নয়। ছাড়া ছাড়া। দূরে কিছু ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। ছাইগাদা দিয়ে গেথে গেৰ্থে তৈরি বাড়িঘর। ছাদ পেইকো ঘাসের। ফ্রান্সিস বলল-মানুষের বসতি আছে দেখছি। চলো ওখানেই জলের খোঁজ করা যাক। ওরা পাথরের চাঁইয়ে পা রেখে রেখে নামতে লাগল। ফ্রান্সিস অবশ্য মারিয়াকে হাত ধরে সাহায্য করতে লাগল। মারিয়া প্রায় নেমেই এসেছিল, হঠাৎ একটা পাথরের টুকরোয় রাখতেই টুকরোটা সরে গেল। মারিয়া তাল সামলাতে পারল না। পাথরের চাইয়ের মাথা থেকে নিচে পড়ে গেল একটা বড় গহ্বরের মধ্যে। ভাগ্য ভালো–নিচে ছিল বালি। বালির ওপর মারিয়ার পা পড়ল। ওর হাতটা একটু ছড়ে গেল। পাথরের চাঁইয়ের ধারে এসে ফ্রান্সিসরা হাঁটু গেড়ে বসে নিচে তাকাল। গহুরটা একটু অন্ধকারই, তবু দেখল মারিয়া উঠে দাঁড়িয়েছে। ফ্রান্সিস ডেকে বলল-তোমার কি খুব লেগেছে?
