আলবার্তো হো হো করে হাসল। বলল-ফ্রান্সিস তুমি সত্যিই ভয় পেয়ে গেছো।
ফ্রান্সিস মৃদু হাসল। বলল,আলবার্তো তোমাকে আমি বাঁচার সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি বুঝলে না। তোমার মতো নরপশুরা জীবনের উজ্জ্বল দিক কোনো দিন দেখতে পায় না। যাকগে-তুমিই আমাকে লড়াইয়ে নামালে। আমার কোন দায়িত্ব রইল না।
ফ্রান্সিসের কথা শেষ হতে না হতেই আলবার্তো তরোয়াল উঁচিয়ে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে আলবার্তোর তরোয়ালের মার ঠেকাল। শুরু হল দুজনের তরোয়ালের লড়াই। ডেকের একপাশে বসে আছে নিরস্ত্র জলদস্যুর দল। অন্য পাশে দাঁড়িয়ে আছে সশস্ত্র ভাইকিংরা আর মারিয়া। মারিয়া শুনেছে তরোয়াল চালনায় ফ্রান্সিস সবার সেরা। কিন্তু কোনোদিন ফ্রান্সিসের তরোয়াল লড়াই দেখে নি। আজকে সেই সুযোগ এল। মারিয়া এমনিতে খুব শক্ত মনের মেয়ে। কিন্তু আজকে ও একটু আশঙ্কাই বোধ করল। কারণ ও ঠিক বুঝল যে আলবার্তো সুযোগ পেলে ফ্রান্সিসকে হত্যা করতে পিছপা হবে না। আলবার্তো বার বার আক্রমণ করতে লাগল। ও তরোয়ালের মার ঠেকাতে লাগল। ও চাইছিল যাতে আলবার্তো অল্পক্ষণের মধ্যেই পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে। আলবার্তো সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ল। মুখ হাঁ করে শ্বাস নিতে লাগল। আলবার্তোর একটা তরোয়ালের মার ঠেকাতে গিয়ে ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াতে গেল। তখনই আলবার্তো তরোয়াল ঘুরিয়ে নিয়ে অন্য দিক থেকে তরোয়াল চালাল। তরোয়ালের চকচকে ফলাটা ফ্রান্সিসের বাঁ বাহু ঘেঁসে বেরিয়ে গেল। পোশাকটা কেটে তরোয়াল বসে গেল। রক্তের ধারা বইল। মারিয়া চিৎকার করে উঠল। ফ্রান্সিস একবার ক্ষতস্থানের দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর প্রচণ্ড বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল আলবার্তোর ওপর। এবার আর আত্মরক্ষা নয়। ফ্রান্সিস আক্রমণ করল। ফ্রান্সিসের তরোয়ালের মার ঠেকাতে ঠেকাতে আলবার্তো ভাল করেই বুঝতে পারল এ বড় কঠিন ঠাই। মারিয়া ফ্রান্সিসের নিপুণ তরোয়াল চালানো দেখে অবাক হয়ে গেল। কী অনায়াস ভঙ্গীতে ফ্রান্সিস তরোয়াল চালাচ্ছে। বিদ্যুৎগতিতে স্থান পরিবর্তন করছে। কিন্তু পিছোচ্ছে না। এইভাবে আক্রমণের চাপ রাখছে।
অল্প সময়ের মধ্যেই ভীষণ পরিশ্রান্ত হয়ে আলবার্তোর হাত অবশ হয়ে এল। তরোয়াল আর হাতের বশে রইল না। ! ও এলোমেলো তরোয়াল চালাতে লাগল। ফ্রান্সিস এই সুযোগ ছাড়ল না। এক পাক দ্রুত ঘুরেই শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে তরোয়ালের এক মারল আলবার্তোর তরোয়ালে। আলবার্তোর হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গিয়ে মাস্তুলের কাঠে বিঁধে গেল। বেঁধা অবস্থায় তরোয়ালটা দুলতে লাগল। ওর চোখে মুখে মৃত্যু ভয় ফুটে উঠল। ফ্রান্সিস শেষ আঘাতের জন্য তরোয়াল তুলল। ফ্রান্সিসও হাঁপাচ্ছে তখন। কিন্তু তরোয়াল চালাল না। আস্তে আস্তে তরোয়াল নামাল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, তোমার জাহাজ আর তোমার দলবল নিয়ে যাও–এক্ষুনি এই তল্লাট ছেড়ে পালাও। ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াল। কেউ লক্ষ্য করেনি যে আলবার্তোর কোমরে বেল্ট-এ একটা ছোরা গোঁজা আছে। এইবার আলবার্তো দ্রুত হাতে ছোরাটা টেনে বের করল। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিসকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। শাঙ্কো আলবার্তোকে কোমরে হাত দিতে দেখেই বুঝেছিল ওর উদ্দেশ্য কি। আলবার্তো ছোরা ছুঁড়ে মারার সঙ্গে সঙ্গেই শাঙ্কো ফ্রান্সিসের পিঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল! দুজনে জড়াজড়ি করে ডেকের ওপর পড়ে গেল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। তখনই মাস্তলের ওপর বসে থাকা নজরদার চেঁচিয়ে উঠল–ডাঙা দেখা যাচ্ছে, ডাঙা।
সকলেই হৈ হৈ করে উঠে জাহাজের রেলিঙের কাছে জড়ো হলো। সত্যি দূরে বিস্তীর্ণ বালির তটরেখা দেখা যাচ্ছে। এই হৈচৈ-র মধ্যে আলবার্তো জাহাজের রেলিঙে দ্রুত উঠে পড়ল। উদ্দেশ্য সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়া। কারণ কাছেই সমুদ্রতীর। সাঁতরে পালাতে পারবে। কিন্তু আলবার্তো শাঙ্কোর নজর এড়াতে পারেনি। শাঙ্কো অতি দ্রুত ধনুকে তীর পরিয়েই তীর ছুঁড়ল। একেবারে নিখুঁত নিশানা শাঙ্কোর। তীর আলবার্তোর পিঠে বিধে গেল। আলবার্তো দুহাত উপরে তুলে ছিটকে সমুদ্রের জলে পড়ে গেল। ডেক থেকে ভাইংকির ও জলদস্যুর দল দেখল যে আলবার্তো আর ভেসে উঠল না। জলে যেখানে আলবার্তো পড়েছিল সেখানের জলটায় একটু লাল রঙ লাগল। হ্যারি আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস, আমাদের এক বন্ধুর মৃতদেহ এখনো কয়েদঘরে পড়ে আছে। ফ্রান্সিস দ্রুত বলে উঠল–সত্যিই তো। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হয়নি। কথাটা বিস্কোর কানে গেল, বলল,–আমরা কয়েকজন যাচ্ছি।
একটু পরেই বিস্কোর কয়েদঘর থেকে বন্ধুর মৃতদেহ ডেকে শুইয়ে দিল। সবাই চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়াল। ভাইকিংদের মধ্যে যে ধর্মযাজকের কাজ করে সে এগিয়ে এল। তার গলায় ঝুলছে একটা ভাঁজ করা চাদরের মতো। হাতে একটা চামড়ার ছেঁড়াখোঁড়া বাইবেল। ওটার পাতাগুলো সব ভোলা। ভাইকিং যাজক তাই থেকে একটা পাতা খুলে বিড়বিড় করে কি পড়ল। সবশেষে বলল,–আমেন। তখন মৃতদেহটা একটা মোটা কাপড়ের থলেতে ঢোকানো হলো। মাথার দিকে বেঁধে দেওয়া হলো। দুজন ভাইকিং মৃতদেহটি নিয়ে জাহাজের রেলিঙের কাছে গেল। মৃতদেহটি দোলাতে দোলাতে সমুদ্রের জলে ফেলে দিল। সকলেরই মন খারাপ হয়ে গেল। কেউ কোনো কথা বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
