পাহারাদার দুজন একটু থমকে দাঁড়াল। ওদের মধ্যে একজন তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস একপাক ঘুরে তরোয়াল চালাল বিদ্যুৎবেগে। ওর মাথায় তরোয়ালের কোপ বসে গেল। জলদস্যুটা তরোয়াল ফেলে মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল। অন্য পাহারাদারটির মুখ মৃত্যুভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ফ্রান্সিস গম্ভীর গলায় বলল–দরজা খুলে দাও। লোকটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কোমরে গোঁজা চাবির তাড়া বের করল। কয়েদ ঘরের তালা খুলতে লাগল।
ওদিকে হ্যারি সারারাত ঘামতে পারেনি। ওর এক চিন্তা-ফ্রান্সিস বস্তা কেটে বেরতে পারল কিনা, হয়তো পারেনি। এসব বিপদের কথা ভাবছিল। তখনই ও কয়েদ ঘরের দরজার কাছে ফ্রান্সিসের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। ও আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বিস্কোশাঙ্কো অন্য বন্ধুদের ধাক্কা দিতে দিতে চাপা স্বরে বলতে লাগল-ওঠ-ওঠ-ফ্রান্সিস এসেছে। দুজন একজন করে সকলেরই ঘুম ভেঙ্গে গেল। উঠে দাঁড়াতে লাগল সবাই। হ্যারি চাপা স্বরে বলল-কোনরকম শব্দ করো না। তখনই কয়েদঘরের দরজা খুলে গেল। ফ্রান্সিস এক লাফে ঢুকল। কয়েদঘরে ঢুকেই ফ্রান্সিস ঠোঁটে আঙুল রাখল। সবাই আনন্দে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল।
ফ্রান্সিসের নির্দেশে সবাই চুপ করে রইল। হ্যারি ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখে জল এসে গেল।
ফ্রান্সিস বলল–পাগালামি করো না! এখন বড় লড়াই সামনে। ফ্রান্সিস বিস্কোকে তরোয়াল খুলে দিল। শাঙ্কোকে দিল তীর ধনুক। বলল-ভাইসব, এবার চূড়ান্ত লড়াই। সবাই জলদস্যুদের অস্ত্রাগারে চলে যাও। অস্ত্র নিয়ে প্রত্যেক কেবিনঘরে ঢুকে জলদস্যুদের বন্দী কর। তারপর সবাইকে বন্দী করে ডেকে নিয়ে এসো। জলদি। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করো না।
ওদিকে ডেকের ওপরে যে পাহারাদার তিনজন ছিল তার। মৃত ও আহত বন্ধু দুজনকে দেখে বুঝল কিছু একটা হয়েছে। ওরা সিঁড়ির দিকে ছুটল কেবিনঘরে ঘুমন্ত বন্ধুদের ডাকতে। কিন্তু সিঁড়ির কাছে আসতে দেখল খোলা তরোয়াল নিয়ে ভাইকিংরা দলে দলে উঠে আসছে। ওরা বুঝল এখন লড়াই করতে যাওয়া বোকামি। তবু ও এলো হাতে রুখে দাঁড়াল। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই আহত হয়ে গড়িয়ে পড়ল। গোঙাতে লাগল কেবিন থেকে নিরস্ত্র জলদস্যুদের বন্দী করে এনে ডেকে জড়ো করা হলো।
এদিকে ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো খুঁজে খুঁজে মারিয়াকে যে কেবিনঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে সে ঘরটা পেল। দেখল বাইরে তরোয়াল হাতে একজন পাহারাদার দাঁড়িয়ে। পাহারাদারটি কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁ হাতে গলা চেপে ধরল। লোকটা বেরিয়ে আসা চোখে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। শাঙ্কো পাহারাদারটির হাত থেকে তরোয়ালটা কেড়ে নিল। ফ্রান্সিস বলল-–যাও ডেকে যাও। তারপর ওর গলা ছেড়ে দিল। ফ্রান্সিস তখন বেশ হাঁপাচ্ছে। ও এগিয়ে এসে দরজায় টোকা দিল। একবার, দুবার। মারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। বলল–তুমি,–মানে আমি কী বলবো। ফ্রান্সিস হেসে বলল–কিছু বলতে হবে না। শিগগির ডেকে চলে যাও। ওখানে সবাই আছে।
–কিন্তু তোমরা?
–আলবার্তোর সঙ্গে বোঝাঁপড়া করতে যাচ্ছি। তুমি যাও মারিয়া আর কথা বাড়াল না। সিঁড়ির দিকে ছুটল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো আলবার্তোর ঘরের সামনে এল। দেখল দরজা খোলা। একজন জলদস্যু ঘরে দাঁড়িয়ে আছে। বোধহয় আলবার্তোকে লড়াইয়ের খবরটা দিতে এসেছে। জলদস্যু ওদের দেখেই চিৎকার করে উঠল–ক্যাপ্টেন–ঐ যে। আলবার্তো দ্রুত এগিয়ে এল। দেখল তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে। পেছনে তীর ধনুক হাতে শাঙ্কো। আলবার্তো নিজেও তখন যুদ্ধসাজে তৈরি। সোনা দিয়ে বাঁধানো
ওর তরোয়ালের হাতল। ও হাতল চেপে এক টানে তরবারি কোষমুক্ত করল। ফ্রান্সিস হেসে বলল তাহলে আলবার্তো। তুমি লড়াই চাও? আলবার্তো কোন কথা না বলে তরোয়াল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্যত হলো। ফ্রান্সিস বলল–তোমার জাহাজ এখন আমাদের কজায়। সব জলদস বন্দী। এরপরেও তুমি লড়াই করতে চাও। আলবার্তো ক্রুদ্ধস্বরে বলে উঠল-হা, হিম্মৎ থাকে তো লড়ো।
–বেশ। এখানে এই ছোট ঘরে লড়াই করা অসুবিধে। ডেকে চলো। ফ্রান্সিস বলল।
আলবার্তোকে আর জলকে সামনে রেখে ফ্রান্সিসরা সিঁড়ি বেয়ে ডেকে উঠে এল। দেখল–ভোর হয়েছে। নরম রোদ ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে, সমুদ্রের জলে, জাহাজে, একটু পরেই আলবার্তোর সঙ্গে তরোয়ালের লড়াইয়ে নামতে হবে। এই সুন্দর রোদে উজ্জ্বল নীল আকাশ-কতদূর ছড়িয়ে আছে। শান্ত সমুদ্রের জলে রোদের নাচন ফ্রান্সিসের মনটা কেমন যেন করে উঠল। এ তাপূর্ব সুন্দর পরিবেশে লড়াই–রক্তপাতহত্যা? ওর মন মানল না। শেষবার চেষ্টা করতে হবে যাতে এই অমানবিক রক্তপাত হত্যা এড়ানো যায়।
কিন্তু আলবার্তো নির্বিকার। ডেকে দাঁড়িয়ে ও তারোয়াল ওঠাল। ওর মুখ কঠিন। চোখে হত্যার নেশা। মুখ বেঁকিয়ে হেসে বলল-ফ্রান্সিস কী হলো? তৈরি হও। ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না। তরোয়াল নামিয়ে রাখল।
–কী হল ভাইকিং? ভয় পেয়ে গেলে? আলবার্তো বলল। ফ্রান্সিসের চোখ দুটো যেন জ্বলে উঠল। কিন্তু মনকে শান্ত করল। বলল-আলবার্তো, আমি জানি তুমি নরঘাতক। অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। ঐতিদাসের হাটে বিক্রি করার জন্য নিরীহ মানুষদের কয়েদঘরে জানোয়ারের মতো দীর্ঘদিন বন্দী করে রেখেছে। সেই তোমাকে আমার অনুরোধ-যে জীবন তুমি কাটিয়েছো,সেই জীবনের কথা ভুলে যাও। নতুন করে সৎ মানুষের মতো বাকি জীবনটা কাটাও। মানুষকে হত্যা নয়-মানুষকে ভালোবাসতে শেখ। মানুষের সেবা কর, দুঃখী-অভাবী মানুষের দুঃখ দূর কর, অভাব দূর কর। তোমার ধনসম্পত্তি কম নয়।
