–ঠিক–ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। সকলেই এই প্রস্তাবে সম্মত হল।
গভীর রাত্রি। বন্দরের এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। মশালের আলো জলে কঁপছে। রাজার সৈন্যরা বন্দর পাহারা দিচ্ছে। অন্ধকারে নোঙর করা রয়েছে রাজার জাহাজগুলো।
প্রহরীদের চোখ এড়িয়ে ফ্রান্সিস আর তার পঁয়ত্রিশজন বন্ধু জাহাজগুলোর দিকে এগোতে লাগল। পাথরের ঢিবি, খড়ের গাদা, স্তূপীকৃত কাঠের বাক্সের আড়ালে-আড়ালে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে চলল ওরা। হাতের কাছে সব চাইতে বড় যে জাহাজটা, সেটাতেই নিঃশব্দে উঠতে লাগল সবাই। যে সব প্রহরীরা পাহারা দিচ্ছিল, তারা এতগলো লোককে হঠাৎ যেন। মাটি খুঁড়ে জাহাজে উঠতে দেখে অবাক হয়ে গেল। ওরা খাপ থেকে তরোয়াল খোলবার। আগেই ফ্রান্সিসের বন্ধুরা একে একে সবাইকে কাবু করে ফেলল। তারপর জাহাজ থেকে ছুঁড়ে জলে ফেলে দিল। জাহাজটা কূল ছেড়ে সমুদ্রের দিকে ভেসে চলল।
এদিকে হয়েছে কি, সেই জাহাজে রাজার নৌবাহিনীর সেনাপতি একটা গোপন ষড়যন্ত্র চালাচ্ছিল রাজার বিরুদ্ধে। সেনাপতিই ছিল সেই ষড়যন্ত্রের নেতা। যাতে আরো সৈন্য তারদলে এসে যোগ দেয়, গোপন সভার সেটাই ছিল উদ্দেশ্য। তারা আলোচনায় এত তন্ময় হয়ে গিয়েছিল যে, তারা জানতেও পারল না কখন জাহাজটা চুরি গেছে, আর জাহাজ মাঝ সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ জাহাজটা দুলে-দুলে উঠতে লাগল। সেনাপতি আর তার দলের লোকেরা তো অবাক। জাহাজ মাঝ সমুদ্রে এল কি করে? ওরা সিঁড়ি বেয়ে ডেক-এ উঠে এল কি ব্যাপার দেখতে। ওরা উঠে আসছে বুঝতে পেরে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা সব লুকিয়ে পড়ল। সেনাপতি তার দলবল নিয়ে ডেক-এ এসে দাঁড়াতেই সবাই লুকোনো জায়গা থেকে বেরিয়ে এসে ওদের ঘিরে দাঁড়ালো। সেনাপতি খুব বুদ্ধিমান। বুঝল, এখন ওদের সঙ্গে লড়তে গেলে বিপদ বাড়বে বই কমবে না। লোকদের ইঙ্গিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে? বলল।
ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে বলল–সেনাপতি মশাই, আপনাকেও আমরা সঙ্গে পাব, এটা ভাবতেই পারিনি। যাকগে, মিছিমিছি তরোয়াল খুলবে না, দেখতেই পাচ্ছেন আমরা দলে ভারি। এবার আপনাদের তরোয়ালগুলো দিয়ে দিন।
সেনাপতি নিঃশব্দে নিজের তরোয়াল সুদ্ধ বেল্টটা ডেক-এর ওপর রেখে দিল। সেনাপতির বেল্টটা ডেক-এর ওপর রেখে দিল। দেখাদেখি তার দলের সৈন্যরাও তরোয়াল খুলে ডেক-এর ওপর রাখল। ফ্রান্সিসের দলের একজন তরোয়ালগুলো নিয়ে চলে গেল। সেনাপতি গম্ভীর মুখে বলল–তোমরা রাজার জাহাজ চুরি করেছ–এজন্যে তোমাদের শাস্তি পেতে হবে।
–সে আমরা বুঝবো–ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু তোমরা জাহাজ নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?
–সোনার ঘন্টা আনতে—
সেনাপতি মুখ বেঁকিয়ে হাসল–ওটা একটা ছেলে ভোলানো গল্প।
–দেখাই যাক না। ফ্রান্সিস হাসল।
ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশ। পালগুলো ফুলে উঠেছে হাওয়ার তোড়ে। শান্ত সমুদ্রের বুক চিরে জাহাজ চলতে লাগল দ্রুতগতিতে। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা খুব খুশী। দাঁড় টানতে হচ্ছে না। সমুদ্রও শান্ত। খুব সুলক্ষণ। নির্বিঘ্নেই ওঁরা গন্তব্যস্থানে পৌঁছে যাবে।
ফ্রান্সিস কিন্তু নিশ্চিন্ত হতে পারে না। তার মনে শান্তি নেই। সারাদিন যায় জাহাজের কাজকর্ম তদারকি করতে। তারপর রাত্রে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে, ফ্রান্সিস তখন একা-একা ডেক-এর ওপর পায়চারী করে। কখনও বা রেলিং ধরে দূর অন্ধকার দিগন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। একমাত্র চিন্তা–কবে এই যাত্রা শেষ হবে–দ্বীপে গিয়ে পৌঁছবে। মাঝে-মাঝে হ্যারি বিছানা থেকে উঠে আসে। ওর পাশে এসে দাঁড়ায়। বলে এবার শুয়ে পড়গে যাও।
–হ্যারি–ফ্রান্সিস শান্তস্বরে বলে–তুমি তো জানো সোনার ঘন্টা আমার সমস্ত জীবনের স্বপ্ন। যতদিন না সেটার হদিস পাচ্ছি, ততদিন আমি শান্তিতে ঘুমুতে পারব না।
তবু শরীরটাকে তো বিশ্রাম দেবে! হ্যারি বলে।
-হ্যাঁ, বিশ্রাম। ফ্রান্সিস হাসল–চল। কতদিন হয়ে গেল। জাহাজ চলেছে তো চলেছেই। এরমধ্যে তিনবার ফ্রান্সিসদের জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়েছিল। প্রথম দু’বারের ঝড় ওদের তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু শেষ ঝড়টা এসেছিল হঠাৎ। পাল নামাতে নামাতে দুটো পাল ফেঁসে গিয়েছিল। পালের দড়ি ছিঁড়ে গিয়েছিল। সে সব মেরামত করতে হয়েছে। কিন্তু সেলাই করা পালে তো ভরসা করা যায় না। জোর হাওয়ার মুখে আবার ফেঁসে যেতে পারে।
জাহাজতখন ভূমধ্যসাগরে পড়েছে। কোন বন্দরে জাহাজ থামিয়ে পালটা পালটে নিতে হবে। কিন্তু ফ্রান্সিসের এই প্রস্তাবে সকলে সম্মত হল না। কেউ আর দেরি করতে চায় না। কতদিন হয়ে গেল দেশ বাড়ি ছেড়ে এসেছে। ফেরার জন্যে সকলেই উদগ্রীব। কিন্তু ফ্রান্সিস দৃঢ় প্রতিজ্ঞ–পালটা পালটাতেই হবে। যে প্রচণ্ড ঝড়ের মুখে তাদের পড়তে হবে, সে সম্বন্ধে কারো কোন ধারণাই নেই। শুধু ফ্রান্সিসই জানে তার ভয়াবহতা। সেই মাথার ওপর উন্মত্ত ঝড় আর নীচে ডুবো পাহাড়ের বিশ্বাসঘাতকতা। সে সব সামলানো সহজ ব্যাপার নয়। প্রায় সকলেরই ধারণা হল, ফ্রান্সিস বিপদটাকে বাড়িয়ে দেখছে। এই নিয়ে ফ্রান্সিসের সঙ্গীদের মধ্যে গুঞ্জনও চলল।
সেনাপতি আর তার সঙ্গীরা এতদিন চুপ করেসব দেখছিল। ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে তার সঙ্গীদের খেপিয়ে দেবার সুযোগ খুঁজছিল। এবার সুযোগ পাওয়া গেল! এরমধ্যে ফ্রান্সিসের একটা হুকুমও ভালো মনে নিল না। ফ্রান্সিসেরই তিনজন সঙ্গী দেশে ফিরে যাবার জন্যে বারবার ফ্রান্সিসকে করছিল। কিন্তু ফ্রান্সিস অটল। অসম্ভব ফিরে যাওয়া চলবে না। সে সোজা বলল–ওসব ভাবনা মন থেকে তাড়াও। কাজ শেষ না করে কেউ ফেরার কথা মুখেও এনো না। কিন্তু ওরাও নাছোড়বান্দা। ওদের প্যানপ্যানিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠল ফ্রান্সিস। তাই যে ছোট্ট বন্দরটায় পালটা পাবার জন্যে জাহাজটা থামল, ফ্রান্সিস ওদের সেখানে জোর করে নামিয়ে দিল। অন্য জাহাজে করে ওরা যেন দেশে ফিরে যায়। এমনিতেই ফ্রান্সিসের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ধুমায়িত হয়ে উঠেছিল। এই ঘটনাটা তাতে আরো একটু ইন্ধন জোগাল। সেই ছোট্ট বন্দরে পালটা বদলে, জাহাজের টুকিটাকি মেরামত সেরে নিয়ে তাদের যাত্রা আবার শুরু হল।
