–না আমাদের বন্ধু তো-হ্যারি বলল–তা ভাই তোমরাও কাঁধে করে নিয়ে যেও?
–কাঁধে করে পারবো না। তবে ঝুলিয়ে নিয়ে যাবো। পাহারাদার বলল।
দরজা খুলে ওরা বস্তাটা ধরল। ঝুলিয়ে নিয়ে চলল। ততক্ষণে একজন পাহারাদার দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়েছে।
বস্তা বন্দী ফ্রান্সিসকে চার পাঁচজন জলদস্যু ঝুলিয়ে নিয়ে চলল। সিঁড়ি বেয়ে উঠে এল। ডেকে এসে আর ঝুলিয়ে নিল না। ডেকের কাঠের মেঝের ওপর দিয়ে হিড়হিড় করে হিঁচড়ে নিয়ে চলল। ঘা লেগে ফ্রান্সিসের মাথার পেছনে পিঠে জ্বালা করতে লাগল। ফ্রান্সিস দাঁত চেপে সহ্য করতে লাগল। মুখে কোনো শব্দ করল না। ডেকের রেলিঙের কাছে এসে দুজন জল বস্তা বন্দী ফ্রান্সিসকে দোলাতে লাগল। তারপর ছুঁড়ে সমুদ্রের জলে ফেলে দিল।
জলে পড়েই বস্তা সুদ্ধ ফ্রান্সিস লে ডুবে যেতে লাগল, ফ্রান্সিস তৈরিই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে জামার তলা থেকে ছোরাটা বার করে মোটা কাপড়ের বস্তায় ঢুকিয়ে দিয়েই জোরে হ্যাঁচকা টান দিল। বস্তা লম্বালম্বি কেটে গেল। ফ্রান্সিস বস্তার ভেতরে থেকে বেরিয়ে এল। জলের মধ্যে এইজন্যে ওকে বেশ কিছুক্ষণ দম আটকে থাকতে হলো। মজোর সমুদ্র থেকে মুক্তো আনার জন্য ফ্রান্সিস মুক্তো শিকারীদের সঙ্গে থেকে দম বেশিক্ষণ রাখার অভ্যেস করেছিল। এখন সেটা কাজে লেগে গেল। হাত পায়ে জলের মধ্যে কয়েকটা ধাক্কা দিয়েই ওজলের ওপরে ভেসে উঠল। হাঁপাতে লাগল। ওর ভাগ্যও ভালো। দেখল ক্যারাভেল জাহাজ তার ওদের জাহাজ খুব আস্তে আস্তে যাচ্ছে। মৃদু জোৎস্না পড়েছে সমুদ্রের জলে, জাহাজে। বাতাস তেমন জোরে বইছে না। তাই ঢেউও কম।
ফ্রান্সিস ওদের জাহাজটা লক্ষ্য করে সাঁতরাতে লাগল। একটু পরেই ওদের জাহাজের পিছন দিকের জলে ডোবা হাট ধরল। হালের কাঠের খাঁজে খাঁজে পা রেখে একটু উঠল। তখন বেশ হাঁপাচে। একটু জিরো। হাঁপানো একটু কমল। দেখা হাতের কাছে একটা মোটা কাছি ঝুলছে। ফ্রান্সিস কাছিট! বেয়ে বেয়ে আস্তে আস্তে উঠতে লাগল। এক সময় হালের গায়ে পা রেখে জাহাজের ডেকে নামল। দেখল ওদের জাহাজের কোথাও আলো জ্বলছে না। ওর গায়ের পোশাক ভিজে সপ সপ করছে। সিঁড়ি দিয়ে নাম অন্ধকারে। দ্রুত পায়ে নিজের কেবিন। ঘরে ঢুকল দ্রুত হাতে ভেজা পোশাক ছেড়ে পোশাক পরে নিল। দেয়াল থেকে তরোয়ালটা নিয়ে কোমরে জল। তারপর একটা কাঁচ ঢাকা লণ্ঠন জ্বালল। সেটা নিয়ে চলল অস্ত্রঘরের দিকে। অস্ত্রঘর খুলল। বিস্কোর জন্যে তার একটা তরোয়াল কোমরে খুঁজে নিল। এবার শাঙ্কোর ধনকটা নিল কাঁধে, বুকে ছিলাটা চেপে রাখল। কাঁধে ঝোলাল তীর ভর্তি তুণীরটা। আলোটা নিয়ে ওপরে ওঠার সিঁড়ির কাছে এল। আলোটা নিভিয়ে ফেলল। আলো জলদস্যুর নজরে পড়লে বিপদে পড়তে হবে। কাঁচ ঢাকা লণ্ঠনটা রেখে দিল। ডেকে উঠে এল। দেখল জলদস্যুদের ক্যারাভেলের ডেকে কয়েকটা আলো জ্বলছে। গভীর রাত। জলদস্যুরা নিজেদের কেবিনে ঘুমিয়ে আছে। মাস্তুলের আড়ালে দাঁড়াল ফ্রান্সিস। কিছুক্ষণ লক্ষ্য রেখে দেখল চার পাঁচজন জলদস্যু ডেকে জাহাজ পাহারা দিচ্ছে। দুজনের হাতে খোলা তরোয়াল। বাকিরা তরোয়াল পাশে রেখে ডেকে বসে আছে।
ফ্রান্সিস ওদের জাহাজের সামনের দিকে এল। চাঁদের আলো খুবই অস্পষ্ট!তবু যদি জলদস্যুরা দেখে ফেলে তাই ও হামাগুড়ি দিয়ে এল। কাঠের ফালি বাঁধা দড়ির মইটা তখনও দুটো জাহাজের মধ্যে লাগানো ছিল। মারিয়া ঐ দড়ির মই দিয়েই দু জাহাজে পারাপার করছিল। ফ্রান্সিস হামাগুড়ি দিয়ে দড়ির মইয়ের ওপর দিয়ে এল। নামল জলদস্যুদের ক্যারাভেল-এর ডেকে। একটু অপেক্ষা করল! না জলদস্যুরা পাহারাদাররা ওর আসা বুঝতে পারেনি।
ফ্রান্সিস এবার দড়ির মইয়ের হুকট। খুলে দিয়েই জাহাজের অন্ধকার কোণাটায় সরে এল। কাঠ বাঁধা মইটা জাহাজের গায়ে গিয়ে লাগল। বেশ জোরে শব্দ, উঠল-খট–
দস্যু ছুটে এল। জাহাজের হালের কাছে মাথা ঝুঁকিয়ে দেখতে লাগল শব্দটা কিসের। ফ্রান্সিস এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিল। এক লাফে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে জলদস্যুটার ঘাড়ে তরোয়ালের বাঁট দিয়ে এক ঘা মেরেই নিজের জায়গায় এলো। জলদস্যুটি মুখে কোনো শব্দও করতে পারল না। অজ্ঞান হয়ে রেলিঙের মুখ জুড়ে পড়ে রইল। অন্য পাহারাদার জলদস্যুটি দু একবার ওর অজ্ঞান বন্ধুকে ডাকাডাকি করল। তারপর খোলা তরোয়াল হাতে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বুঝল এর সঙ্গে তরোয়াল নিয়ে লড়তে গেলে তরোয়ালের ঠোকাঠুকির শব্দ হবে। ডেকে বসে থাকা জলদস্যুরা শব্দ শুনে ছুটে আসবে। কাজেই কোনোরকম শব্দ করা চলবে না। নিঃশব্দে কাজ সারতে হবে। ও অন্ধকার থেকে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল। জামার তলা থেকে ছোরাটা বের করল। তারপর পেছন থেকে জলদস্যুটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঁ হাত বাড়িয়ে তার মুখ চেপে ধলে যাতে কোনো শব্দ না করতে পারে। তারপর ছোরাটা আমূল ওর পিঠে বসিয়ে দিল। জলদস্যুটা কয়েকবার নড়ে উঠেই স্থির হয়ে গেল। ফ্রান্সিস ওকে ধরে আস্তে আস্তে ডেক-এর ওপর শুইয়ে দিল, যাতে কোনো শব্দ না হয়।
এবার ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল অন্য পাহারাদাররা মৃদুস্বরে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে এত কান্ড হলো ওরা কিছুই বুঝতে পারল না।
সিডির ঘর হাত বারোর মধ্যে। ফ্রান্সিস ডেকের মেঝেয় বক পেতে শুয়ে পড়ল। তারপর বুক দিয়ে হিঁচড়ে হিঁচড়ে চলল। তারপর নিচে নামার সিঁড়ির ওপর গড়িয়ে পড়ল। তখন ফ্রান্সিস শুনল ডেকের জলদস্যুরা ওদের বন্ধু দুজনকে ডাকাডাকি করছে। ফ্রান্সিস বুঝল–আর দেরি করা চলবে না। কাঁচ ঢাকা আলোয় ও দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল। কয়েদঘরের সামনে যখন এল তখন ও হাঁপাচ্ছে। দেখল দুজন জলদস্যু খোলা তরোয়াল হাতে কয়েদঘর পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিস ভাবল এদের হত্যা না করে যাতে কয়েদ ঘরের চাবিটা নেওয়া যায় ও সেই চেষ্টাই করবে। কয়েদঘরের দরজার কাছে একটা কাঁচ ঢাকা বাতি ঝুলছিল। ফ্রান্সিস কোমর থেকে তরোয়াল বের করে আস্তে আস্তে পাহারাদার দুজনের সামনে এসে দাঁড়াল। পাহারাদার দুজন ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। এ কী? এ কীকরে গারদ ঘরের বাইরে এল। তাও হাতে তরোয়াল নিয়ে। পরক্ষণেই ওরা লড়াইয়ের জন্য তরোয়াল উঁচিয়ে ধরল। ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে আস্তে আস্তে বলল–যদি প্রাণে বাঁচতে চাও আমার সঙ্গে লড়াই করতে এসে না। আমি ফ্রান্সিস। তোমাদের মতো দশজনের সঙ্গে লড়াই করা আমার কাছে কিছুই না। গারদ ঘরটা খুলে দাও। বন্ধুদের মুক্তি দাও। আমি তোমাদের কোন ক্ষতি করব না।
