পরের দিনই মারিয়া একটা করে পোশাক আনল আর হলুদ গুঁড়ো ওষুধ দিয়ে গেল। তিনজন আহত ভাইকিং মোটামুটি সুস্থ হলো। কিন্তু একজন আহত ভাইকিং ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। ওষুধ লাগানো চলল। কিন্তু ওর বুকের ক্ষতস্থান ফুলে পেকে উঠল। একদিন দুপুরে বাড়াবাড়ি অবস্থা হলো। প্রচন্ড জুরে ওর গা পুড়ে যেতে লাগল। ভাইকিংটি প্রলাপ বকতে লাগল। সন্ধ্যের সময় তজ্ঞান হয়ে গেল। একটু রাত বাড়তে ভাইকিংটি হঠাৎ চোখ বড় বড় করে চারদিকে তাকাতে লাগল। তারপর আস্তে আস্তে চোখ বন্ধ করল। শেষবারের মতো ওর শরীরটা নড়ে উঠে স্থির হয়ে গেল। ফ্রান্সিস মৃত বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল। ওর চোখ ফেটে জল এল! দুহাতে মুখ চেপে ও কেঁদে উঠল। হ্যারি এগিয়ে এসে ওর পিঠে হাত রাখল। সব ভাইকিং বন্ধুরা মুখ নিচু করে বসে রইল। তানোকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস চোখ মুছে হ্যারিকে বলল-হ্যারি-ও নিজের জীবন দিয়ে আমাদের মুক্তির উপায় করে দিয়ে গেল। হ্যারি কোনো কথা বলল না।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে গেল। রক্ষীদের বলল-আমাদের এক বন্ধু মারা গেছে। আলবার্তোকে খবর দাও। একজন রক্ষা চলে গেল। একটু পরেই কাঠের মেঝেয় জুতোর শব্দ তুলে আলবার্তো এল। পেছনে জলদস্যুদের বৈদ্য। রোগ। পাকা দাড়ি। কয়েদ ঘরের দরজা খোলা হলো। শুধু বৈদ্য ঢুকল। মৃত ভাইকিংটির বুকে কান পাতল। আঙুল দিয়ে চোখ খুলে দেখল। হাতের পায়ের নাড়ি টিপে দেখল। তারপর মাথা নেড়ে মৃদুস্বরে বলল-মারা গেছে। কয়েদঘরের বাইরে গিয়ে আলবার্তোকে বলল সে কথা। আলবার্তো ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল-এখান থেকে পালাবার চেষ্টা করলে এই অবস্থাই হবে। মড়া কালকে সমুদ্রে ফেলা হবে।
ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠল। চিৎকার করে বলল,–না আজকে রাতেই মড়া এখান থেকে নিয়ে যেতে হবে।
-কেন? আলবার্তো বেশ আশ্চর্য হয়েই বলল?
–আমরা একটা মড়ার সঙ্গে রাত কাটাতে পারবো না।
আলবার্তো ঠাট্টা করে হেসে বলল–কিছুক্ষণ আগেও তো ও তোমাদের বন্ধু ছিল?
–সে ছিল ছিল। এখন তো একটা মড়া। বিদায় করো এটাকে। ফ্রান্সিস বলল?
–তাই হবে। আলবার্তো পাহারাওয়ালাদের সে কথা বলল। তারপর চলে গেল।
ফ্রান্সিসের এ ধরনের কথাবার্তায় ভাইকিং বন্ধুরা অবাক হয়ে গেল। ফ্রান্সিসের এ কী কথাবার্তা! এ কী ব্যবহার! বন্ধুদের জন্যে যে ফ্রান্সিস নিজের জীবন দিতে তৈরী থাকে, সে একমৃতবন্ধু সম্পর্কে এরকম কথা বলছে। হ্যারির সহ্য হলো না, ও ফ্রান্সিসের মুখোমুখি দাঁড়াল। দৃঢ়স্বরে বলল-ফ্রান্সিস সাবধান, মৃতবন্ধু সম্পর্কে এরকম কথা যদি আর একটা বল, তোমাকে আমরা ছেড়ে দেব না।
ফ্রান্সিস শুধু ফিসফিস করে বলল-রাত্রি চাই-অন্ধকার চাই। তারপর ফ্রান্সিস দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। চেঁচিয়ে একজন পাহারাদারকে ডাকল। বলল-আচ্ছা। ভাই, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
-কী কথা? একজন পাহারাদার এগিয়ে এসে বলল?
–আমার দৃঢ় বিশ্বাস জাহাজটা থেমে আছে অথবা খুব আস্তে চলছে।
–আরে-ঠিক বলছো। দুদিন যাবতহাওয়া পড়ে গেছে। জাহাজ প্রায় চলছেই না। কিন্তু তুমি কী করে বললে?
-আমরা ভাইকিং-সমুদ্র জাহাজ এসবের মতিগতি আমরা সহজেই ধরতে পারি। ফ্রান্সিস তারপর বলল–তা ভাই দেরি করছে কেন। মড়াটা তাড়াতাড়ি নিয়ে যাও।
–তোমাদের রাতে খাওয়া হলেই নিয়ে যাবো। পাহারাদার জলদসূটি বলল?
–জলদি কর, জলদি কর। ফ্রান্সিস কথাটা বলে দরজার কাছ থেকে চলে এল।
ফ্রান্সিস দু-একজন ভাইকিং বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু এক হ্যারি ছাড়া আর সবাই মুখ ফিরিয়ে রইল। মৃত বন্ধু সম্পর্কে ফ্রান্সিস যা কিছুক্ষণ আগে বলেছে সেটা বন্ধুরা ভুলতে পারেনি। ছিঃ এত নোংরা মন ফ্রান্সিসের। একটু পরেই পাহারাদাররা রাতের খাবার দিয়ে গেল। প্রায় কেউই বিশেষ খেল না। ফ্রান্সিস কিন্তু পেট পুরে খেল। সব বন্ধুরা দেখল সেট। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল তারপর। একটু পরে একজন পাহারাদার জল একটা মোটা কাপড়ের বস্তা গরাদের মধ্য দিয়ে ভাঁজ করে গলিয়ে দিল। সঙ্গে একটা দড়ি। পাহারাদার বলল-মড়াটা বস্তায় পরে মুখ বেঁধে দরজার কাছে রেখে সবাই সরে যাও। আমরা ঢুকে মড়া নিয়ে আসবো। তখন কাছে আসবে না।
শাঙ্কো বস্তা দড়ি নিয়ে এল। এবার মৃতদেহ এই বস্তায় ভরতে হবে। ফ্রান্সিস ফিসফিস করে ডাকলে-শাঙ্কো। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল ফ্রান্সিস হাত বাড়িয়ে বলল-শিগগির ছোরাটা দাও। শাঙ্কো ঢোলা জামার নিচ থেকে ছোরা বার করে ফ্রান্সিসের হাতে দিল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঢোলা জামায় ছোরাটা ভরে রাখল। সকলের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমরা সব দরজার কাছে গিয়ে ভিড় করে আঁড়াও যাতে পাহারাদাররা দেখতে না পায় এখানে কী হচ্ছে! সবাই এবার বুঝল ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই কোনো ফন্দী এঁটেছে। সবাই দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ভিড় হয়ে গেল দরজার সামনে। ফ্রান্সিস দ্রুত বস্তাটার মধ্যে ঢুকে পড়ল। বলল–শাঙ্কো, বস্তার মুখ বেঁধে দাও। শাঙ্কো তাড়াতাড়ি বস্তার মুখ বাঁধল। ফ্রান্সিস বস্তা বন্দী হলো। হ্যারি বলে উঠলো-সাবাস ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস বস্তার মধ্যে থেকে বলল–আস্তে।
বিস্কো শাঙ্কো আর কয়েকজন ভাইকিং বস্তাটা কাঁধে নিয়ে দরজার কাছে এল। একজন পাহারাদার বলল-মড়া আবার কাঁধে করে নিয়ে আসছে। টেনে হিঁচড়ে আনো।
