কিছুক্ষণ পরে আলবার্তে লোহার গারদ-আঁটা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস . বলল–আমাদের চারজন বন্ধু অাহত। ওদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
তালতো হেসে বলল-ওরা আমার রক্ষীদের আক্রমণ করেছিল। ফল যা হবার তাই হয়েছে।
-কিন্তু ওরা আহত-ওদের চিকিৎসা।
আলবার্তো চেঁচিয়ে বলে উঠল-ওসব হবে ন!। মরুক ওরা। ফ্রান্সিসও গলা চড়াল যদি বিনা চিকিৎসায় ওরা কেউ মারা যায় তোমাকে ঠামি ছাড়বো না আলবার্তো। তোমাকে যেখানে যে অবস্থায় পাবো তামি ই কবে! আলবার্তো হো হো করে হেসে উঠল। বলল-ঐ স্বপ্ন দেখতে দেখতেই তোমার জীবন এই কয়েদ ঘরে শেষ হয়ে যাবে। ফ্রান্সিস আগুন-ঝরা চোখে আলবার্তোর দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো কথা বলল না। আলবার্তো চলে গেল।
ফ্রান্সিসরা ফিরে এসে নিজেদের জায়গায় বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। কয়েকজন ভাইকিংতখন জলের পাত্র করে জল এনে আহতদের শরীরে ক্ষতস্থান বেঁধে দিল। রক্ত পড়া বন্ধ হলো।
কিছুক্ষণ পরে মারিয়া এল। লোহার গরাদ দেওয়া দরজায় এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস উঠে একটু দ্রুত পায়েই দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ফিসফিস করে বলল এক্ষুনি আমাদের জাহাজে চলে যাও। বৈদ্য যে কটা ওষুধের বোয়াম আনতে বলে নিয়ে এসো। ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে ওদের ভাইকিং বৈদ্যকে ডাকল। বৈদ্য আড়মোড়া ভেঙে উঠল। ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল-মারিয়া আমাদের জাহাজে যাচ্ছে। কী কী ওষুধের বোয়াম আনবে বলে দাও। বৈদ্যও নিচুস্বরে বলল–রাজকুমারী, আমার কেবিনঘরের তাকে দেখবেন কালো, হলুদ আর নীল রঙের তিনটে বোয়াম আছে। আপনি হলুদ বোয়ামটা থেকে একমুঠো গুড়ো একটা কাগজের ঠোঙায় ঢেলে আনবেন।
–আমি বোয়ামটাই নিয়ে আসতে পারি। মারিয়া বলল।
–তা পারেন। কিন্তু এই কয়েদুঘরের দরজায় লোহার শিক লাগানো। এইটুকু ফাঁক দিয়ে বোয়াম ঢুকবে না। আপনাকে প্রত্যেক দিন ঠোঙায় করে লুকিয়ে ওই গুঁড়ো আনতে হবে। বৈদ্য বলল।
-মারিয়া দেরি করো না-শিগগির যাও। ফ্রান্সিস তাগাদা দিল। মারিয়া পাহারাদারদের দিকে তাকিয়ে বলল-ওদের পোশাক ভীষণ ময়লা হয়ে গেছে। আমি আমাদের জাহাজ থেকে কিছু পোশাক আনতে যাচ্ছি। পাহারাদার দুজন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। মুখে কিছু বলল না।
মারিয়া ডেকে উঠে এল দ্রুতপায়ে। একজন জলদস্যুকে দেখল মাস্তুলে ঠেসান দিয়ে ঝিমুচ্ছে। মারিয়া ডাকল-শুনছো? লোকটা চোখ মেলল। মারিয়াকে দেখেই একলাফে উঠে দাঁড়াল। তরোয়ালের হাতলে হাত রাখল। মারিয়া হেসে বলল-লড়াই করতে আসিনি। তুমি তোমাদের দড়ির মইটা ধরো। আমি আমাদের জাহাজে যাবো।
-কেন? জলদস্যু বলল।
–আমার স্বামী আর বন্ধুরা তো কয়েদ ঘরে বন্দী হয়ে আছে। ওদের পোশক নোংরা হয়ে গেছে। কিছু পোশাক আনবো।
-কিন্তু ক্যাপ্টেনের হুকুম ছাড়া–
–আরে আমি তো পালাচ্ছি না। ক্যাপ্টেনকে পরে আমি বলবো খন। মারিয়া বলল।
জলসুটি! তা কিছু বলল না। জাহাজের পেছন দিকে চলল। জাহাজের পেছনের কাঠের রেলিংয়ের গায়ে একটা দড়ির মই আটকানো। মইটার মাঝে মাঝে কাঠের ফালি বাঁধা। মইটা বাঁধা রয়েছে ফ্রান্সিসদের জাহাজের সঙ্গে। দুটো জাহাজ একটা মোটা কাছিতে বাঁক। জলদসটি মইয়ের এক : কষ্টে নিয়ে কাছিটা ধরে ঝুলে ঝুলে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠল। তারপর কাছিটা একটা হুক-এর সঙ্গে আটকে টেনে ধরে রইল। মারিয়া মইয়ের কাঠের ফালিগুলোর ওপর পা রেখে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠে এল। প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে মারিয়াকে আসতে হলো। দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে বৈদ্যর কেবিন ঘরে ঢুকল। তাকের দিকে তাকিয়ে খুঁজতে খুঁজতে হলুদ বোয়ামটা পেল। বোয়ামটা নিয়ে মারিয়া নিজের কেবিনঘরে চলে এল। নিজের আর ফ্রান্সিসের কিছু পোশাক নিল। অন্য কেবিনঘরগুলোতে ঢুকে অন্য ভাইকিং বন্ধুদের পোশাক নিল। সব পোশাক পেঁচিয়ে বাঁধবার আগে হলুদ বোয়াম ভেতরে রেখে দিল। পেঁচিয়ে বাঁধা পোশাকের বোঁচকার মধ্যে রইল বোয়ামটা।
পোশাকের বোঁচকা দেখে জলদস্যুটি কিছু বলল না। মারিয়া মই বেয়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ক্যারাভেল জাহাজে ফিরে এল। নিজের কেবিনে ঢুকল। কাপড়ের বোঁচকার মধ্যে থেকে হলুদ বোয়াম বের করল। একটা রুমালে হলুদ গুঁড়ো একমুঠো ঢালল। বোয়ামটা কাঠের তাকে লুকিয়ে রাখল। তারপর কাপড়ের বোঁচকার মধ্যে ওষুধ রুমালটা রেখে কয়েদঘরের সামনে এল। চারজন ভাইকিং পালাবার চেষ্টা করছিল বলে এখন নিয়মে কড়াকড়ি করা হয়েছে। সব ভাইকিংদের হাত খুলে দেওয়া হয়েছে। খাবারদাবার দরজার নিচের একটা ফোকর দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আলবার্তোর হুকুম কোনো কারণেই যেন দরজা খোলা না হয়। মারিয়া কাপড়ের পুটলি খুলে একটা করে পোশাক গরাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে দিতে লাগল। ফ্রান্সিস টেনে নিতে লাগল। হলুদ ওষুধ জড়ানো পোশাকটা দেবার সময় মারিয়া বেশ জোরে বলল-এই পোশাকটা এক্ষুনি পর। ফ্রান্সিস বুঝল। মৃদু হেসে বলল–আচ্ছা। তারপর পোশাকটা নিয়ে বৈদ্যর কাছে এল। পোশাকের ভাঁজ খুলে ওযুধটা মেঝেয় ঢালল। বলল–জল-। একজন ভাইকিং নারকেলের মালায় করে জল নিয়ে এল। বৈদ্যর নির্দেশমতো হলুদের গুড়োর মধ্যে অল্প করে জল ঢালতে লাগল। বৈদ্য গুড়োটা মাখতে লাগল। একটু পরেই আঠার মতো দেখতে হলো। বৈদ্য ওষুধ নিয়ে আহত ভাইকিং কজনের ক্ষতে লাগিয়ে দিল। একটু জ্বালা করে উঠেই একটা ঠান্ডাভাব লাগল!ওদের ব্যথা অনেক কমে গেল।
