আলবার্তো মারিয়ার সামনে এল! মারিয়ার বাঁধা হাত খুলে দিল। বলল–যান এই জাহাজে যা কিছু সোনা দানা, হীরে, মুক্তো আছে সব নিয়ে আসুন। একজন জলদস্যুর দিকে তাকিয়ে আলবার্তো বলল-এর সঙ্গে যা! সব যোগাড় হলে এঁকে আমাদের ক্যারাভালে-এ নিয়ে যাবি। পাঁচ নম্বর কেবিন ঘরে বন্দী করে রাখবি। পাহারা দিবি।
জলদুস্যটি খোলা তরে!! হতে মারিয়ার কাছে এসে দাঁড়াল। মারিয়া তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। আলবার্তে গলা চড়িয়ে হুকুমের স্বরে বলল–যান।
ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল-মারিয়া কথার অবাধ্য হয়ো না। মারিয়া একবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। তারপর নিচে নামবার সিঁড়ির দিকে এগোলো।
আলবার্তোর হুকুমে সব জলদস্যু খোলা তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। তারপর ওদের ঠেলে নিয়ে চলল জাহাজের ডেকের পাশে কাছের রেলিঙের দিকে। দুটো জাহাজই তখন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিসদের একে একে জলদস্যুদের ক্যারাভেল জাহাজে নিয়ে আসা হলো। সিঁড়ি দিয়ে নিচে জাহাজের খোলে নামানো হলো। একটা লোহার শিক লাগানো দরজার সামনে ওদের আনা হলো। একজন পাহারাদার জলদস্যু দরজাটার তালা খুলল। দেখা গেল এই দিনের বেলায়ও প্রায় অন্ধকার কয়েদ ঘর। ফ্রান্সিসদের প্রত্যেকের সেই ঘরে ঢোকানো হলো। তিনজন কয়েদ ঘরের পাহারাদার জলদস্যু ফ্রান্সিসদের প্রত্যেকের হাতে দড়ি বেঁধে দিল। তারপর লোহার মোটা শিকওয়ালা দরজাটা খুলে বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ করল। তালা লাগাল। তারপর দরজার সামনে খোলা তরোয়াল। হাতে পাহারা দিতে লাগল।
ভাইকিংরা কেউ কেউ কাঠের মেঝেয় শুয়ে পড়ল, কেউ কেউ বসে পড়ল। কেউ কেউ পায়চারি করতে লাগল। ফ্রান্সিস কাঠের দেয়ালে পিঠ চেপে বসল। পাশে বসল হ্যারি আর বিস্কো। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল-আমাদের সাবধান থাকা উচিত ছিল। বিস্কো বলল-ই-নজরদার যদি একটু আগে বলতো
–ওসব ভেবোনা আর-ফ্রান্সিস বলল। একটু থেমে বলল-চারদিক ভালো করে দেখেছি। দরজা ছাড়া আর কোথা দিয়েও পালাবার উপায় নেই। তবে পা খোলা আছে আর শাঙ্কো বলেছে ওর বড় ছুরিটা ও জামার ভেতর লুকিয়ে রেখেছে। কটা দিন থাক। ওদের পাহারা দেবার নিয়ম, খাবার দেবার নিয়ম এসব দেখি। তারপর মুক্তির ফন্দী অটবো। আর কেউ কোনো কথা বলল না। লোহার গরাদ দেওয়া ওপারে তখন আলোর ভাব কমে এসেছে। বাইরে বোধহয় বিকেল হলো।
চার পাঁচ দিন কেটে গেল। মারিয়া ওর গয়নাগাঁটি স্বর্ণমুদ্রা যা ছিল সবই আলবার্তোকে দিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে আলবার্তো মারিয়া যে ভাইকিং রাজার মেয়ে: এটা জেনেছে। ও ঠিক করেছে-কোনো বন্দরের ক্রীতদাস কেনা বেচার হাটে ভাইকিংদের বিক্রি করে দেবে। তারপর ভাইকিংদের দেশের বন্দরে যাবে। মারিয়ার মুক্তিপণ হিসেবে দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা, ভাইকিং রাজার কাছে দাবি করবে।
জাহাজ চলল। দিনের পর দিন। ফ্রান্সিসদের একঘেয়ে জীবন কাটতে লাগল কয়েদ ঘরে।
ওদিকে পাঁচ নম্বর কেবিনে মারিয়ারও একঘেয়ে বন্দিনী জীবন কাটছে! মারিয়ার বেশি চিন্তা ফ্রান্সিসদের জন্য। ওতো তবু আকাশ আলো সমুদ্র দেখতে পায়। ফ্রান্সিসরা তো অন্ধকারে পড়ে আছে। আলবার্তো মারিয়াকে মাত্র একবার ফ্রান্সিসদের সঙ্গে দেখা করবার অনুমতি দিয়েছে। আধঘন্টার জন্য।
মারিয়া আসে। লোহার দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। ওর মুখ বিয়ঃ। ফ্রান্সিসের সঙ্গে কথা হয়। সামান্য কথাবার্ত। দু: করও কিছুই তো বলবার নেই। যা কিছু কথা এই বন্দ জান নিয়েই। মারিয়ার কাছেই ফ্রান্সিস জেনেছিল যে আলবার্তে ওর ক্যারাভেল জাহাজের পেছনে ফ্রান্সিসদের জাহাজটাও বেঁধে নিয়ে চলেছে। মারিয়া তখন!ও ফিসফিস করে বলে-ফ্রান্সিস-এই বন্দীদশা থেকে কি আমাদের মুক্তি নেই?
ফ্রান্সিসও চাপাস্বরে বলে–আছে। নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেই মুক্তি পেতে হবে আমাদের কারও জীবন বিপন্ন না করে আর সুযোগ বুঝে। ওরা এসব কথা খুব আস্তে বলে, যাতে পাহারাদারের কানে না যায়। মারিয়া এভাবে প্রতিদিনই আসে। কথা বলে। চলে যায়।
এর মধ্যে ফ্রান্সিসদের চারজন ভাইকিং বন্ধু নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে ঠিক করল পালাবে। কথাটা ওরা আর কাউকেই বলল না।
সেদিন রাতে তিনজন জলদস্যু পাহারাদার লোহার শিকের দরজা খুলে খাবার নিয়ে ঢুকল। সেই চারজন ভাইকিং পাহারাদারদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। একজন পাহারাদারকে কাবু করল। কিন্তু হাত বাঁধা অবস্থায় কি লড়াই করা চলে? বাকি দুজন পাহারাদার তরোয়াল নিয়ে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাইকিং চারজন তরোয়ালের মার ঠেকাবে কী করে? চারজনই তরোয়ালের ঘায়ে আহত হয়ে মেঝেয় পড়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন গুরুতর আহত হলো। রক্তাক্ত দেহে ওরা গোঙাতে লাগল। ফ্রান্সিসরা যে ওদের সেবা-শুশ্রূষা করবে তারও উপায় নেই। সবারই হাত বাঁধা। পাহারাদাররা দরজা বন্ধ করে পাহারা দিতে লাগল।
ফ্রান্সিস একজন পাহারাদারকে ডাক। সে দরজার কাছে মুখ বাড়াল। ফ্রান্সিস বলল-আমার বন্ধুদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করো।
-ক্যাপ্টেন আলবার্তোর হুকুম না হলে হবে না। পাহারাদার বলল।
ফ্রান্সিস ভীষণ রেগে গেল। বলল-এক্ষুণি আলবার্তোকে আসতে বলে?
–ক্যাপ্টেন এখন বিশ্রাম করছেন। পাহারাদার বলল।
ফ্রান্সিস লোহার দরজায় প্রচন্ড ঝাঁকুনি দিয়ে চিৎকার করে উঠল–আমার আহত বন্ধুরা যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে উনি বিশ্রাম করছেন? ফ্রান্সিসের চিৎকার করে বলা কথাগুলো শুনে সব ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে লোহার দরজার কাছে এল। সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল-ও-হো-হো। পাহারাদার এই চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে ঘাবড়ে গেল। ওর দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফ্রান্সিস বলল–যাও শিগগির। পাহারাদারটি কী ভাবল কে জানে। ও চলে গেল।
