বিস্কো সামনে, পেছনে দস্যু দলপতি ও অন্য দস্যুরা নামতে লাগল। বিস্কো ওদের অস্ত্রঘরের সামনে নিয়ে এল। আঙুল দেখিয়ে বলল–অস্ত্রঘর। দলপতির নির্দেশে দুজন জলদস্যু খোলা তলোয়ার হাতে ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল। জলদস্যুদের দলপতি বলল–তোমাদের ক্যাপ্টেন কে? তার কাছে আমাকে নিয়ে চলো। বিস্কো চিন্তায় পড়ল। যে করেই হোক সে ফ্রান্সিসকে মুক্ত রাখতে চাইল। যদি ফ্রান্সিস ধরা না পড়ে তাহলে ফ্রান্সিস বৃদ্ধি খাঁটিয়ে নিশ্চয়ই বিপদ থেকে সকলকে উদ্ধার করতে পারবে। জলদস্যু নেতা ওর পিঠে তলোয়ারের চাপ বাড়াল। গম্ভীর গলায় বলল–চলো। কোনোরকম চালাকি করেছ কি মুণ্ডু উড়িয়ে দেব।
বিস্কো চলল। পেছনে পেছনে জলদস্যু নেতা। ওর পেছনে চারজন খোলা তলোয়ার হাতে জলদস্যু। ঠিক তখনই একটা কেবিন ঘরের দরজা খুলে একজন ভাইকিং বেরিয়ে এল। পড়ল একেবারে বিস্কো আর জলদস্যুদের সামনে। বিস্কো বলে উঠল–এই আমাদের ক্যাপ্টেন।
জলদস্যু নেতা একলাফে সামনে গিয়ে ভাইকিংটির গলায় তলোয়ার ঠেকিয়ে বলল–তুমিই এই জাহাজের ক্যাপ্টেন? ভাইকিংটির মুখ তখন ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। দুহাত ওপরে তুলে ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠল–না-না, আমি না। ফ্রান্সিস। বিস্কো চোখের ইঙ্গিতে ভাইকিং বন্ধুটিকে বোঝাল যেন ও বলে যে, ওই ক্যাপ্টেন। কিন্তু বন্ধুটি ত সেটা বুঝল না উল্টে ফ্রান্সিসের নাম বলে দিল।
জলদস্যু নেতা এবার রাগত দৃষ্টিতে বিস্কোর দিকে তাকাল। বলল–আমাকে ধোঁকা দিচ্ছিলে। একজন জলস্যর দিকে তাকিয়ে বলল–একে ডেকে নিয়ে যাও। বন্দী কর। এবার দলনেতা ভাইকিংটির দিকে তাকাল। বলল–আমাকে ফ্রান্সিসের কাছে নিয়ে চলো। কোনোরকম চালাকি করবে না। ভাইকিংটিকে সামনে রেখে জলদস্যু চলল।
সবাই ফ্রান্সিস ও মারিয়ার কেবিন ঘরের সামনে দাঁড়াল। ভাইকিংটি আঙুল দিয়ে দরজাটা দেখাল। দসুনেতা গলা নামিয়ে বলল–ফ্রান্সিসকে ডাকো। ভাইকিংটি দরজায় টোকা দিল। ডাকল-ফ্রান্সিস-ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস তখন বিছানায় আধশোয়া হয়ে বিশ্রাম করছিল। মারিয়া বিছানায় বসে রুমালে এমব্রডারি করছিল। ডাক শুনে মারিয়া এসে দরজা খুলে দিল। জলদস্যু নেতা উদ্যত তরবারি হাতে এক ধাক্কায় দরজার সবটা খুলে ঘরের মধ্যে ঢুকল। ফ্রান্সিস একলাফে বিছানা থেকে নেমে কাঠের দেয়ালে ঝোলানো তরোয়ালটার দিকে ছুটল। কিন্তু তরোয়াল হাতে নেবার আগেই দুজন জলদস্যু দুদিক থেকে ফ্রান্সিসকে জাপটে ধরল। ফ্রান্সিস শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে ছাড়াবার চেষ্টা করল। পারল না। জলদস্যু দুজনের তরোয়ালের খোঁচা লেগে ফ্রান্সিসের বুক পিঠ হাত কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। মারিয়া বুঝল ওরা সকলেই বিপদে পড়েছে। কিন্তু মারিয়া ভয় পেল না!। দৃপ্তকণ্ঠে জিঞ্জেস করল–আপনি কে? জলদস্যু-দলপতি একটু মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে হেসে বলল–আমার নাম আলবার্তো।
-তুমি জলদস্যু। মারিয়া চেঁচিয়ে বলল।
হ্যাঁ, আলবার্তো বলল-মাদ্রিদ নগরে পাঁচ একর জমি কিনেছি। বাড়ি হচ্ছে। সোনা, রুপো, হীরে,অলঙ্কার এসব খুব প্রয়োজন। তাই জাহাজ লুঠ করি। আর একটা কাজও করতে হয়। ক্রীতদাস সংগ্রহ ও বিক্রি।
-ঠিক আছে, মারিয়া বলল–আমাদের যা সোনা রুপো অলঙ্কার আছে দিয়ে দিচ্ছি। আমাদের জাহাজ থেকে দূর হও তোমরা।
-খুব ভালো কথা। আপনি সেসব একত্র করুন। কিন্তু আপনাদের কাউকে তো ছাড়া হবে না। কাছাকাছি ডাঙ্গায় যেখানে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট পাবো সেখানেই আপনাদের বিক্রী করে দেব। সাদা চামড়ার ক্রীতদাস, অনেক দাম পাওয়া যাবে।
ফ্রান্সিসকে ততক্ষণে দুজন জলদস্যু দুহাত, বুক ঘাড় দড়ি জড়িয়ে বেঁধে ফেলেছে। ফ্রান্সিস বাধা দেয়নি। ও বুঝতে পেরেছে এখন লড়াই অসম্ভব। খালি হাতে এখন লড়াই চলবে না। সুযোগের অপেক্ষা করতে হবে। আলবার্তো জলদস্যু দুজনকে ইঙ্গিত করল। ওরা ফ্রান্সিসকে ধরে নিয়ে চলল। পেছনে মারিয়া। মারিয়ার দুটো হাত ততক্ষণে বাঁধা হয়ে গেছে। সামনে আলবার্তো, পেছনে ফ্রান্সিসরা। সবাই চলল ডেকে ওঠার সিঁড়ির দিকে।
ওদিকে জলদস্যুরা চেষ্টা করল যাতে নিঃশব্দে সব কাজ সারা যায়, কিন্তু পারল না। ওদের দ্রুত চলাফেরায় কাঠের পাটাতনে শব্দ হলো বেশ। দুচারজন ভাইকিং কেবিন ঘর থেকে বেরিয়ে এল। জলদস্যুদের দেখল। অস্ত্রঘরের সামনে খোলা তরোয়াল হাতে জলদস্যুরা পাহারা দিচ্ছে। ওরা হতাশ হলো। জলদস্যুরা ওদের ঘিরে ফেলল। ওদের হাত বেঁধে নিয়ে চলল ডেকে ওঠার সিঁড়ির দিকে।
ফ্রান্সিস মারিয়া হ্যারি আর সব ভাইকিংদের জাহাজের ডেকে জলদস্যুরা জড়ো করল। আলবার্তো সকলের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমরা সবাই বন্দী। শুধু আঙুল দিয়ে মারিয়াকে দেখিয়ে বলল-ইনি স্ত্রী লোক। ইনি থাকবেন একটি কেবিন ঘরে। সেই ঘরের দরজার সামনে অবশ্যই পাহারাদার থাকবে। একটা কাজ তাঁকে করতে হবে। এই জাহাজে সোনা-মুক্তো-হীরে যা কিছু দামী জিনিস আর অলঙ্কার আছে সব একত্র করে আমাকে দিতে-হবে।
-যদি না দিই। মারিয়া ক্রুদ্ধস্বরে বলল।
-তাহলে আপনি এবং এই জাহাজের কেউ বেঁচে থাকবেন না। সবাইকে মেরে হাঙরের মুখে ছুঁড়ে ফেলা হবে। আলবার্তো বেশ জোরের সঙ্গে বলল। ফ্রান্সিস একটু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল-মারিয়া-কোনো কথা বলো না। ভাইকিংরা সবাই তখন রাগে ফুঁসছে। বিনা যুদ্ধে এভাবে হার স্বীকার করা ওদের সহ্য হচ্ছিল না। কিন্তু উপায় নেই। এ অবস্থায় খালি হাতে লড়া যাবে না। ওরা চুপ করে রইল।
