খুঁড়তে খুঁড়তে প্রায় সাত ফিট বাঁধানো জায়গাটা পাওয়া গেল। এবার পাথরগুলো খুলতে হবে। গাঁইতি চাই। হ্রোগলই ওর ঘর থেকে একটা গাঁইতি নিয়ে এল। একে একে পাথরের ছোট ছোট চাইগুলো জোড়ামুখে চাড় দিয়ে খোলা হতে লাগল। কয়েকটা চাই খুলতেই দেখা গেল চকচকে গাড় নীল রঙের কাপড়ে কী যেন ঢাকা। সব ই খুলতেই দেখা গেল একটা পাঁচ ফিট লম্বা সোনার জাহাজ। তার মাস্তুলটা তো আগেই দেখা গিয়েছিল। ক্ষুদে জাহাজের মুখটা অবিকল সেই ছবির সাপের মুখের মতো। মশালের আলো পড়তে জাহাজের সোনার গা ঝিকিয়ে উঠল। ক্ষুদে জাহাজটা পাথরের চাঁইয়ের বাক্সের মধ্যে ছিল বলেই মাটি লাগেনি। এবার ফ্রান্সিস গর্তে নামল। বিস্কো মশাল হাতে নামল। ফ্রান্সিস গাড় নীল কাপড়টা সরাল। ঝম করে উঠল জাহাজের এক ফুট চওড়া খোল বোঝাই মণিমাণিক্য, দামী পাথরের টুকরো।
ততক্ষণে ভাইকিংরা আর কয়েকজন চাষী সবাই ঝুঁকে পড়েছে গর্তটার ওপর। ফ্রান্সিস ক্ষুদে জাহাজটা তুলতে গেল। তুললও কিছুটা। কিন্তু বেশ ভারী। তাছাড়া তুলতে গেলে জাহাজটা কাত হবে। খোল থেকে মণিমাণিক্য দামী পাথরগুলো ছড়িয়ে নিচে পড়ে যাবে। ফ্রান্সিস বললো-বিস্কো-মশালটা ওপরে কারো হাতে দাও। তারপর জাহাজের ওপাশটা ধরো। দুজনে মিলে তুলতে হবে।
মশাল গর্তের ওপরে একজন নিল। ফ্রান্সিস আর বিস্কো মিলে ক্ষুদে সোনার জাহাজটা তুলতে লাগল। আস্তে আস্তে ওপরে তুলতেই এতক্ষণে মশালের আলোয় পরিষ্কার দেখা গেল সোনার ক্ষুদে জাহাজ, মাস্তুল। অপরূপ সবুজ নীল মীনে করা জাহাজের ঝকঝকে গা, মাস্তুল। জাহাজের খোলভর্তি মণিমাণিক্য দামী পাথরের স্তূপ। তার মধ্যে কিছু দামী হীরের সোনার গয়নাগাটিও আছে।
এই দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণ কারো মুখে কথা নেই। তারপাই শুরু হলো ভাইকিংদের চিৎকার—ও-হো-হো-হো-।
ওদিকে চাষী লোকশুলোর সকলেরই ঘুম ভেঙে গেছে। ওরা ছুটে এল। সোনার জাহাজ, মণিমাণিক্য দেখে ওরা বিস্ময়ে হতবাক। হাঁ করে দেখতে লাগল জাহাজটা।
গর্ত থেকে উঠে আসতেই ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। শুরু হলো ফ্রান্সিসকে কাঁধে তুলে নাচ। মারিয়াও খুশিতে নেচে উঠল। ছুটে এসে জাহাজের সোনার গায়ে হাত ঘষতে লাগল, মণিমাণিক্য তুলে নিয়ে দেখতে লাগল। তখনই ও দেখল জাহাজটার গায়ে লেখা–দীর্ঘ সৰ্প।
ক্ষুদে সোনার জাহাজটা রাখা হলো স্তম্ভগুলোর কাছে। ফ্রান্সিসের নির্দেশ হ্যারি গাড়ি নিয়ে ছুটল নগরের দিকে–রাজা ইনগল কে এই সংবাদ জানাতে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সারা রেভাভিক নগরে এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল। রাজা ইনগলফ ও রানী ততক্ষণে গাড়িতে চলে এসেছেন। রেভজাভিকনগরের লোকেরাও ছুটে আসতে লাগল লোগবার্গের দিকে যেন আবার নাচ-গানের উৎসব হবে।
রাজা ইনগলফ জাহাজ ও মণিমাণিক্য দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন। আনন্দে ফ্রান্সিসকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রানীও খুশি। মারিয়াকে বুকে টেনে নিলেন। রাজা ফ্রান্সিসের মুখ থেকে শুনলেন মণিমাণিক্যের জাহাজ উদ্ধারের গল্প।
অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই জায়গাটা লোকারণ্য হয়ে গেল। সবাই অবাক চোখে দেখতে লাগল সেই অপরূপ সোনার জাহাজ, মণিমাণিক্য।
এবার রাজা ইনগলফ ফ্রান্সিসকে বললেন–এই মহামূল্য জাহাজ নিয়ে এখন কী করবে?
–এই গুপ্তধন তো এই দেশেরই রাজা ফ্লোকির। কাজেই এই দেশেই থাকবে। রাজা ইনগলফ বললেন–তা ঠিক। তুমি তোমার উপযুক্ত কথাই বলেছ। কিন্তু ফ্রান্সিস–মারিয়াকে উদ্ধার করতে, আমার রাজ্যকে শত্রুর হাত তেকে বাঁচাতে এই গুপ্তধন উদ্ধার করতে যে সাহস, বুদ্ধি ও শৌর্যের পরিচয় তুমি দিয়েছে তাতে এই দীর্ঘ স তোমারই প্রাপ্য।
ফ্রান্সিস কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। হ্যারির দিকে তাকাল।
হ্যারি নম্বরে বলল–রাজা ইনগলফ–আপনি আপনার যে উদার মনের পরিচয় দিলেন তা আমরা কোনদিন ভুলবো না। আমার প্রিয় বন্ধু ফ্রান্সিস সোনার ঘণ্টা, হীরে-মুক্তো এসব এনেছে আর সেসব আমাদের রাজার জাদুঘরে রক্ষিত আছে এই দীর্ঘ স জাহাজ আইসল্যান্ডবাসীদের রাজা ফ্লোকির সম্পত্তি। তাই এটা আপনার প্রাসাদেই থাক। বরং মণিমাণিক্যগুলো ফ্রান্সিসকে দিন।
রাজা একটুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন–বেশ তাই হবে। তারপর বললেন-ফ্রান্সিস, মণিমাণিক্য রেখে দাও। শুধু জাহাজটা আমাদের গাড়িতে তুলে দাও। গাড়ি আস্তে আস্তে যাবে আমার দেশবাসী এই মহামূল্যবান গুপ্তধন স্বচক্ষে যেন দেখতে পায়।
রাজা ইনগলফের কথামতো মারিয়া একটা চামড়ার থলিতে মণিমাণিক্য গয়নাগাঁটি ভরে রাখল। জাহাজটা তুলে দেওয়া হলো রাজার গাড়িতে। রাখা হলো সামনের আসনের ওপর। রাজা-রাণী গাড়িতে উঠলেন।
ফ্রান্সিস কী ভেবে গাড়িতে বসা রাজা ইনগফের দিকে এগিয়ে গেল। বলল–মহামান্য রাজা-আপনার কাছে আমার দুটো অনুরোধ আছে।
–বেশ-বলল। রাজা বললেন।
–প্রথম অনুরোধ–ফ্রান্সিস বলল–আপনি রাজা গুমন্ডের প্রতি দয়া প্রদর্শন করুন। রাজা গুমন্ডকে মুক্তি দিন এবং তার হারানো রাজ্য থিংভেলির তাকে ফিরিয়ে দিন।
রাজা ইনগলফ একটুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন–ফ্রান্সিস তুমি এই অনুরোধ করছে কেন?
কারণ আমি রাজা গুমন্ডের মনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি। তিনি অনুতপ্ত। আমাকে তিনি বলেছেন আবার থিংভেলির রাজ্যের রাজা হলে তিনি বাকি জীবন প্রজাদের কল্যাণ সাধন করবেন। গুম আমাকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাকে একবার তার কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে দিন। ফ্রান্সিস বলল। রাজা ইনগলফ দ্বিধায় পড়লেন। একদিকে চিরশত্রু রাজা গুমন্ডের প্রতি সমস্তজীবন কারাবাসের আদেশ অন্যদিকে স্নেহাস্পদ ফ্রান্সিসের অনুরোধ। একটু ভেবে নিয়ে রাজা ইনগলফ বললেন–ফ্রান্সিস–তোমার অনুরোধ কি আমি রক্ষা না করে পারি? ঠিক আছে রাজা গুমন্ডকে আমি মুক্তি দেব। তার রাজত্বও তাকে ফিরিয়ে দেব।
