–অশেষ ধন্যবাদ মহামান্য রাজা। ফ্রান্সিস মাথা নুইয়ে বলল?
–তোমার দ্বিতীয় অনুরোধ? রাজা বললেন;
ফ্রান্সিস এবার মারিয়ার হাত থেকে মণিমাণিক্য গয়নাভরা চামড়ার থলিটা নিল। থলিটা এগিয়ে ধরে বলল–আপনি দয়া করে এই মণিমাণিক্য অলঙ্কার নিল। এসব রাজা গুমন্ডকে মুক্তির সময় দেবেন। রাজা আবার চিন্তায় পড়লেন। বললেন–কিন্তু ফ্রান্সিস–রাজা গুমন্ড ভীষণ স্বার্থপর লোভী অর্থ পিশাচ।
–জানি। তবু তাকে আমি অনুরোধ করবো–এই সমস্ত মণিমাণিক্য বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে তা যেন উনি প্রজাদের কল্যাণে ব্যয় করেন। ফ্রান্সিস বলল। এবার রাজা চামড়ার থলিটা নিলেন। রানীর হাতে দিলেন। বললেন–বেশ–এইসব মণিমাণিক্য অলঙ্কার রাজা গুমন্ডকে দেব। তোমারই এই গুপ্তসম্পদ উদ্ধার করেছে। নইলে এই গুপ্তধন মাটির নিচেই পড়ে থাকতো। কাজেই এ ব্যাপারে তুমি যা চাইবে তাই হবে। ফ্রান্সিস মারিয়া ও হ্যারি মাথা নুইয়ে রাজা রানীকে সম্মান জানাল। রাজা কোচওয়ানকে গাড়ি চালাতে ইঙ্গিত করলেন। গাড়ি চলল।
গাড়ি ধীরগতিতে চলল বেভকজাভিকের দিকে। রাজার গাড়ির মশালের আলো পড়েছে দশ ফুট দীর্ঘ সোনার জাহাজে। ঝকঝক করছে জাহাজের গা-মীনে করা মাস্তুল। উপস্থিত মানুষেরা অবাক হয়ে দেখতে লাগল। জনতার মধ্যে থেকে অনেকে নিঃশব্দে গাড়ির পেছনে পেছনে ছুটতে লাগল। সোনার জাহাজ সোনার মাস্তুল। কী অপূর্ব সুন্দর। দেখে দেখে ওদের যেন সাধ মিটছে না। আস্তে আস্তে রাজার গাড়ি কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেল।
ফ্রান্সিস মারিয়া, হ্যারি ও বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–চলো সবাই। সবাই ধ্বনি তুলে আনন্দোচ্ছাস প্রকাশ করল—ও—হো–হো।
ফ্রান্সিস মারিয়া ও হ্যারি একটা গাড়িতে উঠল। অন্য গাড়িগুলোয় উঠল ভাইকিং বন্ধুরা সব গাড়ি চলল রেভকজাভিকের উদ্দেশ্যে।
গাড়ি নগরে প্রবেশ করলে ফ্রান্সিস কোচওয়ানকে বলল–কয়েকঘরের কাছে নিয়ে চলো। গাড়ি রাজবাড়ির চত্বরে ঢুকল। তারপর গিয়ে দাঁড়াল কয়েদুঘরের সামনে। ফ্রান্সিসরা গাড়ি থেকে নামল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে একজন রক্ষীকে। বলল–রাজা গুমন্ডের সঙ্গে দেখা করবো। দরজা খুলে দাও। একজন রক্ষী বড় তালাটা খুলল। লোহার দরজা খুলল। ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরে ঢুকল। রাজা গুমন্ড আজকে শুয়ে ছিল না দাঁড়িয়ে পায়চারী করছিল। মুখ ফিরিয়ে ফ্রান্সিসকে দেখল। বলল–রাজা ইনগলফকে আমার কথা বলেছেন?
–বলেছি। আপনি খুব শিগগিরই মুক্তি পাবেন।
থিংভেলির রাজ্য আপনাকে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–সত্যি? রাজা গুমণ্ড দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে গভীর বিস্ময়। গলায় বলে উঠল–সত্যি আমি মুক্তি পাবো?
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলল। রাজা গুমও কিছুক্ষণ দুহাত তুলে ওপরের দিকে তাকিয়ে রইল। যখন মুখ নামাল ফ্রান্সিসরা দেখল–রাজা গুমরে চোখে জল। কান্না ভেজা গলায় গুমও বলল–ফ্রান্সিস-তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
–কিন্তু আপনার প্রতিশ্রুতি? ফ্রান্সিস বলল?
–অক্ষরে অক্ষরে পালন করবো। গুমন্ড ম্লান হেসে বলল।
–এই আইসল্যান্ডের একজন রাজা ছিলেন ফ্লোকি। তার নাম শুনেছেন? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ। উনি ছদ্মবেশে জলদস্যুতাও করতেন। গুমন্ড বলল?
–সেই রাজা ফ্লোকির গুপ্তধন আমরা উদ্ধার করেছি?
–বলল কি? গুমন্ড বেশ আশ্চর্য হল।
—হ্যাঁ। দশ ফুট লম্বা একটা সোনার জাহাজ আর জাহাজের খোল ভর্তি মণিমাণিক্য অলঙ্কার। ফ্রান্সিস বলল। রাজা গুমন্ড বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল।
–এই সব মণিমাণিক্য অলঙ্কার আপনাকেই দেওয়া হবে। ফ্রান্সিস বলল?
–আমাকে? গুমন্ড আরও আশ্চর্য হল।
–হ্যাঁ–দেওয়া হবে একটি শর্তে–সেই মণিমাণিক্য অলঙ্কার বিক্রি করে একটি অর্থভান্ডার আপনি গড়ে তুলবেন। সেই অর্থ ব্যয়িত হবে শুধুমাত্র আপনার প্রজাদের কল্যাণে। অন্য কোন কারণে একটি স্বর্ণমুদ্রাও আপনি ব্যয় করতে পারবেন না। রাজা গুমন্ড নিঃশব্দে কিছুক্ষণ ফ্রান্সিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল–ফ্রান্সিস–সত্যিই তুমি মহান। ফ্রান্সিস শুধু বলল–আপনার শরীর এখন কেমন?
–আমি অনেকটা সুস্থ। ফ্রান্সিস তোমাকে ধন্যবাদ। গুমন্ড বলল। ফ্রান্সিসরা জাহাজে ফিরে এল। জাহাজের ডেকে উঠতেই বন্ধুরা ওদের ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–জাহাজ ছাড়ো। এবার মাতৃভূমিতে ফেরা। সব ভাইকিং বন্ধুরা ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো। তারপর যে যার কাজে লেগে পড়ল। দড়িদড়া টেনে বিরাট বিরাট পাল খাটানো হল। ঘড়ঘড় শব্দে নোঙর তোলা হল। একটা পাক খেয়ে জাহাজ মহাসমুদের দিকে জল কেটে চলল। পাশে দাঁড়ানো মারিয়াকে ফ্রান্সিস হেসে বলল–তোমার কি দুঃখ হচ্ছে মারিয়া?
-কেন বলো তো? মারিয়া বলল?
–অত মূল্যবান মণিমাণিক্য রেখে এলাম। মারিয়া মাথা নেড়ে বলল–দুঃখ নয় তোমার জন্যে আজ আমি গর্ববোধ করছি। ফ্রান্সিস হেসে হ্যারির দিকে তাকাল। বলল–হ্যারি–তোমার? হ্যারি কোন কথা না বলে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ফ্রান্সিস বলল–মারিয়া হ্যারি–আগের অভিযানগুলোর শেষে কত মূল্যবান জিনিস নিয়ে দেশে ফিরেছি। আজ না হয় শূন্য হাতেই ফিরলাম–কী বলো? কেউ কোন কথা বলল না। নিস্তেজ আলো আর কুয়াশা ঢাকা আকাশের নিচে সমুদ্রের ঢেউয়ের দিকে ওরা তাকিয়ে রইল। জাহাজ চলল।
