ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি, শীগগিরি হোলগের ঘর থেকে একটা মশাল জ্বালিয়ে নিয়ে এসো।
হ্যারি ছুটে চলে গেল। বয়স্ক লোকটি ঐ লোহার ডান্ডাটার চারপাশে খুঁড়তে লাগল। কাটা মাটি সরাতে লাগল।
হ্যারি জ্বলন্ত মশাল নিয়ে এল। ফ্রান্সিস বয়স্ক লোকটিকে বলল–তুমি ভাই এসো। আমি খুঁড়ছি।
লোকটি গর্ত থেকে উঠে এল। ফ্রান্সিস মশাল হাতে গর্তে নামল। যেটাকে লোকটা লোহার ডান্ডা বলছিল সেটার গায়ে তখনও মাটি লেগে আছে। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে ওটার গা থেকে মাটি মুছে ফেলল। মশালের আলোয় দেখল-লোহা নয়–সোনা। সোনার দন্ড মতো। তার গায়ে সবুজ নীল মীনে করা। এইবার ফ্রান্সিস বিপদ আঁচ করল। যদি লোকগুলো জানতে পারে যে ওটা লোহা নয় সোনা, তাহলেই বিপদ। সোনার লোভে মানুষ উন্মত্ত হয়ে যায়। তখন মানুষ মানুষকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করে না। তাছাড়া এরা গরিব চাষী। সোনার জন্যে নিজেরাই খুনোখুনি শুরু করে দেবে। ফ্রান্সিসদের তো খুন করবে প্রথমেই।
ফ্রান্সিস কোনো কথা না বলে মশালটা খোঁড়া মাটির মধ্যে গুঁজে দিল। মশাল নিভে গেল। গর্তটা অন্ধকার হয়ে গেল। ফ্রান্সিস মশাল নিভিয়ে ফেলল যাতে চাষী লোকগুলোর সোনার দন্ড দেখতে না পায়। গর্তের ওপরে উঠে এল। বয়স্ক লোকটি জিজ্ঞেস করল–ওটা লোহার ডান্ডা তাই না?
ফ্রান্সিস হেসে বলল–হ্যাঁ, এত খাটুিনি বৃথাই গেল। বোধহয় ফ্রান্সিসদের পাগলামির ব্যাপারেই কথা বলতে লাগল ওরা।
হ্যারির কাছে এসে ফ্রান্সিস দাঁড়াল। হ্যারি বলল-লোহার একটা ডান্ডাকে তুমি সোনার স্তম্ভ বলবে?
ফ্রান্সিস ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলল–চুপ। তারপর হ্যারি কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল-হরি-লোহার নয়–সোনার দন্ড মতো। তাতে মীনের কাজ করা।
–বলো কি? হ্যারি চমকে উঠল।
–আস্তে। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল-হোলগের একটা আধভাঙা ঘোড়া গাড়ি আছে দেখেছি। গোড়াটা তেজীয়ান না হলেও মোটামুটি ছুটতে পারবে। তুমি গাড়িটায় চড়ে বন্দরে চলে যাও। বিস্কো শাঙ্কো আর জনার দশেক বন্ধুকে দিয়ে এসো। সবাই যেন অস্ত্র নিয়ে আসে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
হ্যারি চলে গেল। মারিয়া সন্দেহ করল কিছু একটা হয়েছে। কাছে এসে বলল–কী হয়েছে ফ্রান্সিস
-পরে বলবো। ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল। অন্য মেয়ে হলে হয়তো কী হয়েছে সেটা জানবার জন্যে অস্থির হয়ে পড়ত। কিন্তু মারিয়া খুব বুদ্ধিমতী। সে বুঝল যে এখন চুপ করে থাকাই ভাল। সময় এলে ফ্রান্সিস নিজে থেকেই সব বলবে। ফ্রান্সিস বলল–খুব পরিশ্রান্ত-বুঝলে? চলো–ঐ স্তম্ভে হেলান দিয়ে একটু বিশ্রাম করে নিই।
একটা স্তম্ভে হেলান দিয়ে ফ্রান্সিস শরীর ছড়িয়ে আধশোয়া হলো। মারিয়াও কাছে বসল। অস্পষ্ট আলোয় ওরা দেখল একটা ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চড়ে হ্যারি চলেছে সঙ্গে বৃদ্ধ হ্রোগল।
ফ্রান্সিস একবার চারদিকে তাকাল। দেখল চাষী শ্রেণীর সেই লোকগুলো ভেড়ার লোমের মোটা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে। হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছে সবাই। পাথরের প্রদীপের আলো নিভে এসেছে। আকাশে দিগন্তে ম্লান আলো। ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল–মারিয়া–সপ্তম স্তম্ভের রহস্যের সমাধান মরেছি। মারিয়া খুশীতে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়ে ফ্রান্সিসের ইঙ্গিতে থেমে গেল। ফ্রান্সিস নিম্নস্বরে বলল–একটা সবুজ মনে করা সোনার দন্ড পেয়েছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওটা জাহাজের মাস্তুল অর্থাৎ দীর্ঘ সর্প জাহাজটা ওখানেই পুঁতে রাখা হয়েছে। সপ্তম স্তম্ভ যেটা থরবার্গ বলেছিল সেটা আসলে সোনার মাস্তুল। স্তম্ভ নয়।
–এখন কী করবে? মারিয়াও নিচু স্বরে বলল।
–এখানে যে চাষীরা ঘুমিয়ে আছে তারা কিছু বোঝার আগেই আমাদের বন্ধুদের এখানে নিয়ে আসতে হবে। তাই হ্যারিকে গাড়ি করে পাঠালাম। বন্ধুরা এলেই নিশ্চিন্ত। ঐ চাষী লোকগুলোর মনে সন্দেহ হয় এমন কোনো কথা আমরা এখন বলবো না। তেমন কোনো কাজও করবো না। চুপ করে বন্ধুদের জন্যে অপেক্ষা করবো। মারিয়া কোনো কথা না বলে চুপ করে রইল।
অনেকটা সময় কেটে গলে। ফ্রান্সিস মনে মনে অস্থির হয়ে উঠল। তখনই দেখল দূরে রাস্তার ওপর অল্প অন্ধকার আর কুয়াশার মধ্যে মশালের আলোর বিন্দু পর পর কয়েকটা। গাড়ি আসছে। একটুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির চাকার শব্দ শোনা গেল। কয়েকটা ঘোড়ায় টানা চাষীদের গাড়ি বোঝাই হয়ে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা এল। সবার পেছনে হোলগের গাড়ি।
গাড়ি থেকে নেমে বন্ধুরা হৈ-হৈ করতে ছুটে এল। সকলের হাতেই খোলা তরোয়াল। শুধু শাঙ্কোর কাঁধে ধনুক ও তুনীর। ওরা ধরেই নিয়েছিল-এবার লড়াই হবে। নইলে ফ্রান্সিস অস্ত্রশস্ত আনতে বলবে কেন।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–ঐ গর্তটা খুঁড়ে আরো বড় করতে হবে। হাত লাগাও। ভাইকিং বন্ধুরা হাতের তরোয়াল স্তম্ভগুলোর কাছে জমা করে রাখল। হ্যারি বুদ্ধি করে চারটে বেলচা হ্রোলগের গাড়িতে করে নিয়ে এসেছিল। পাঁচজন ভাইকিং বেলচা চালিয়ে গর্ত গভীর করতে লাগল। তবে লড়াই হলো না বলে সকলেই বেশ মনমরা হয়ে গেল।
আরো হাতখানেক খুঁড়তেই দেখা গেল পাথরের ছোট ছোট চাই দিয়ে বাঁধানো একটা জায়গা। সেই চাঁইগুলোর একটা ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে সোনার দন্ডটা।
ওরা ফ্রান্সিসকে ডাকল। ফ্রান্সিস ঘোড়ার গাড়িতে রাখা মশাল নিয়ে গর্তে নামল। মশালের আলোয় দেখল নিচেটা পাথর দিয়ে বাঁধানো। ফ্রান্সিস বুঝল–ঐ বাঁধানো জায়গাটাতেই রাখা আছে ক্ষুদে দীর্ঘ সপ সোনার জাহাজ। দেখা গেল বাঁধানো জায়গাটা লম্বাটে। ফ্রান্সিস গর্ত থেকে উঠে এল। বলল–ঐ বাঁধানো পাথরগুলো খুলে ফেল। দেখা যাক কী আছে ওর মধ্যে।
