ফ্রান্সিস সে কথায় কান দিল না। ও তখন মাথা নিচু করে ঘাসের জমিতে স্তম্ভের যে অস্পষ্ট ছায়া পড়েছে তাই দেখছিল। এবার মুখ তুলে বলল–হ্রাগল–আপনি প্রদীপ তিনটের পলতে উস্কে দিন তো। যতটা পারেন প্রদীপের আলোটা উজ্জ্বল করুন।
হ্রোগল চলল প্রদীপের পলতে উস্কে দিতে। বিড়বিড় করে মাথা নেড়ে বলতে লাগল–ছেলেটার মাথঅ খারাপ হয়ে গেছে।
হ্রোগল মই বেয়ে উঠল। লম্বা কাঠের লাঠিটা দিয়ে পরপর তিনটে পাথরের প্রদীপের পলতে উস্কে দিল। উজ্জ্বল আলোয় ভরে গেল চারদিক।
ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলে উঠল–হ্যারি মারিয়া-দেখো স্তম্ভের তিনটে ছায়া মিলছে কিনা।
হ্যারি আর মারিয়া দেখল–সত্যিই তাই। স্তম্ভ ছটির ছায়া একটা বড় ত্রিভুজের সৃষ্টি করেছে। তিনটে ছায়াই মিলেছে নিচে একটা বিন্দুতে।
ফ্রান্সিস এখানে যতবার আসে–ছবি আর নক্সার কাগজটা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। আজকেও এনেছিল। ও ঢেলা জামার তলা থেকে নক্সাটা বের করল। নক্সার কাগজটা ঘাসে ঢাকা মাটিতে পাতল। বলল–হ্যারি, মারিয়া-দেখোনক্সার ওপরের দিকের তিনটি আলোর চিহ্ন। এগুলো ঐ তিনটে পাথরের প্রদীপ। তার নিচের বিন্দুগুলোতে যদি ছটা স্তম্ভের কল্পনা করে তাহলে নক্সাটা এরকম দাঁড়াবে কিনা, অর্থাৎ প্রদীপশিখাগুলো থেকে তিনটে ছায়ার দাগ কল্পনা করো। সেই ছায়াগুলো ঠিক নিচে একটা বিন্দুতে মিলে ত্রিভুজের সৃষ্টি করবে। দেখো ভালো করে–
মারিয়া ও হ্যারি ঝুঁকে পড়ে দেখল–ঠিক তাই। ফ্রান্সিস বলল–ঐ দেখো-স্তম্ভের ছায়াগুলো ঐ জায়গায় মিশে গেছে। দেখা গেল সত্যিই তিনটি ছায়া ঐ জায়গাটায় মিশে গিয়ে একটা ত্রিভুজের সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সিস ঐ মিশে যাওয়া বিন্দুতে মাটিতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে দুহাত ওপরে তুলে বলে উঠল–এইখানে আছে সেই রহস্যময় সপ্তম স্তম্ভ।
হ্যারি একটুক্ষণ ভাবল। সত্যিই তো। নক্সাটা তো এই নির্দেশই দিচ্ছে। হ্যারি ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। চিৎকার করে বলতে লাগল–সাবাস–সাবাস ফ্রান্সিস। মারিয়া তখনও রহস্যভেদ করার ব্যাপারটা সঠিক বুঝতে পারিনি। হ্যারি এসে আস্তে আস্তে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল। মারিয়া আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল। তিনজনেই প্রায় নাচতে লাগল।
বৃদ্ধ হ্রোলগ এসব দেখে বলে উঠল–ছেলেমেয়েরা নাচ অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে।
হ্যারি ছুটে এসে হোলগকে জড়িয়ে ধরে নাচতে লাগল। এদিকে ওখানে যারা কম্বল জড়িয়ে ঘুমিয়েছিল তাদের এই চাঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে গেল। ওরা উঠে বসল কেউ কেউ। হ্যারিদের নাচ দেখতে লাগল।
ফ্রান্সিস হোলগকে বলল–আপনাকে সেদিন আপনার বাগানে বেলচা নিয়ে মাটি খুঁড়তে দেখেছিলাম। আছে তো ওটা?
-তা, থাকবে না কেন।
–আপনি হ্যারিকে নিয়ে যান। বেলচাটা ও নিয়ে আসবে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি একটু পরেই বেলচাটা নিয়ে এল। ফ্রান্সিস বেলচাটা হাতে নিল। তিনটে ছায়া যে বিন্দুতে মিশেছে সেখানে বেলচাটা বসিয়ে দিল। বলল–এই জায়গাটা খুঁড়তে হবে। তারপর নিজেই বেলচা দিয়ে জায়গাটা খুঁড়তে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ খুঁড়ল। তারপর হ্যারিকে ডাকল। হ্যারিও খুঁড়তে লাগল। তবে হ্যারি বরাবরই শরীরে দিক থেকে দুর্বল ও অল্পেতেই হাঁপিয়ে উঠল। তখন ফ্রান্সিস হাত লাগাল। চলল গর্ত খোঁড়া।
ওদিকে যারা শুয়ে বসে ছিল তারা তো অবাক। হলো কি এই পুরুষ দুটোর আর মেয়েটির। এতক্ষণ হৈ হৈ নাচানাচি করে এখন মাটি খুঁড়তে শুরু করেছে? দিল গর্ত খুঁড়ে উৎসবের নাচগানের জায়গাটা নষ্ট করে। ওরা দুতিনজন কাছে এল। মাটি কাটা দেখল। একজন বলল–কী ব্যাপার? এখানে গর্ত খুঁড়েছেন কেন?
ফ্রান্সিস বেলচা চালতে চালতে বলল–এখানে ঐ স্তম্ভগুলোর মতো একটা স্তম্ভ আছে কিনা খুঁড়ে তাই দেখবো।
–বেশ, একটা পাথরের স্তম্ভ না হয় পেলেন। কিন্তু তাতে হবেটা কী? আর একজন বলল।
হ্যারি বলল–সেটা এখনই ঠিক বলা যাচ্ছে না। তবে একটা রহস্যের সমাধান হবে।
লোকগুলো পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল–এগুলো কি পাগল নাকি? ততক্ষণে আর বাকি সবাই এসে ওখানে জড় হয়েছে। নানা মন্তব্য করতে লাগল ওরা। ফ্রান্সিস মাটি খুঁড়ে চলল। হ্যারি ওদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাই, তোমরাও একটু সাহায্য করো না।
ওরা সব গাঁয়ের চাষী। এসব কাজ ওদের কাছে কিছুই না। সবাই রাজী হলো না। দুজন শুধু বোধহয় কৌতূহলবোধ করল। মজার খেলা। দেখাই যাক না। একটি যুবক ফ্রান্সিসকে থামতে বলল। ফ্রান্সিস খোঁড়া থামিয়ে হাঁপাতে লাগল। যুবকটি বেলচা হাতে নিল। বলল–এসব আপনাদের কাজ নয়। তারপর নিপুণ ভঙ্গীতে বেলচা চালাতে লাগল। একটুক্ষণের মধ্যেই হাঁটুসমান গর্ত করে ফেলল।
হ্যারি বলল—ফ্রান্সিস–কোনো কিছুর হদিস তো পাওয়া যাচ্ছে না।
ফ্রান্সিস চিন্তিতস্বরে বলল–হুঁ, তাই তো দেখছি। দেখা যাক আর হাত কয়েক খুড়ে। এবার যুবকটি বেলচা রেখে হাঁপাতে লাগল। ফ্রান্সিস বলল–তুমি উঠে এসো। আমি খুঁড়ছি।
অন্যজন এগিয়ে এসে বলল–না–আপনি বিশ্রাম করুন। আমি হাত লাগাচ্ছি।
এই লোকটি একটু বয়স্ক। যুবকটি গর্ত থেকে উঠে এল। বয়স্ক লোকটি খুঁড়তে লাগল। হাত খানেকও খোড়েনি, হঠাৎ বেলচায় কী লেগে ঠং করে শব্দ হলো। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গর্তের মধ্যে তাকাল। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা গেল না। বয়স্ক লোকটি হাত দিয়ে দিয়ে ওখানকার মাটি সরিয়ে সরিয়ে জিনিসটা দেখল। বলল–মনে হচ্ছে লোহার ডাভার মতো কিছু।
