–হুঁ। বাবার সেই গম্ভীর গলা শোনা গেল।
একটু পরে দরজা খুলে গেল। আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের বাবা এসে বিছানার পাশে দাঁড়ালেন। ভুরু কুঁচকে ফ্রান্সিসের দিকে। তাকিয়ে রইলেন স্থির দৃষ্টিতে। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি বিছানার ওপরে উঠে বসল। বাবা কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই আমতা-আমতা করে বলতে লাগল—ম্-মানে ইয়ে হয়েছে—
–পুরো এক মাস এইখান থেকে কোথাও বেরোবে না।
–বেশ–ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলার চেষ্টা করল না।
–পালিয়েছিলে কেন?
–বললে তো আর যেতে দিতে না।
–হুঁ!
–বিশ্বাস কর বাবা, সোনার ঘন্টা সত্যিই আছে।
–মুণ্ডু।
–আমি সোনার ঘন্টার বাজনার শব্দ শুনেছি।
–এখন ঘরে বসেই সোনার ঘন্টার বাজনা শোন।
–একটা জাহাজ পেলেই আমি—
–আবার! বাবা হেঁকে উঠলেন।
ফ্রান্সিস চুপ করে গেল। ফ্রান্সিসের বাবা দরজার দিকে পা বাড়ালেন। তারপর হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে ডাকলেন–এদিকে এসো।
ফ্রান্সিস ভয়ে-ভয়ে বিছানা থেকে নেমে বাবার কাছে গেল।
–কাছে এসো।
ফ্রান্সিস পায়ে-পায়ে এগোল। হঠাৎ বাবা তাকে দু’হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলে। কয়েক মুহূর্ত। ফ্রান্সিস বুঝল বাবার শরীর আবেগে কেঁপে কেঁপে উঠছে। হঠাৎ ফ্রান্সিসকে ছেড়ে দিয়ে ওর বাবা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ফ্রান্সিস দেখল, বাবা হাতের উল্টেপিঠ দিয়ে চোখ মুছলেন।
বেশ কিছুদিন গেল। ফ্রান্সিস আবার সেই আগের মতই শক্তি ফিরে পেয়েছে–দৃপ্ত, সতেজ। কিন্তু মনে শান্তি নেই। এও তো আর এক রকমের বন্দী জীবন। ওর মত দুরন্ত ছেলের পক্ষে একটা ঘরে আটকা পড়ে থাকা অসম্ভব ব্যাপার। তবু বাবার অজান্তে মা ওকে বাগানে, যেতে দেয়, গেট-এ গিয়েও দাঁড়ায় কখনো কখনো। কিন্তু বাড়ীর বাইরে যাবার উপায় নেই। মার কড়া নজর। বন্ধু বান্ধবের দল বেঁধে আসে। ফ্রান্সিসের কথা যেন আর ফুরোতে চায় না। বন্ধুরা সব অবাক হয়ে ওর বিচিত্র অভিজ্ঞতার কাহিনী শোনে। ফ্রান্সিস বলে–ভাই তোমরা যদি আমার সঙ্গে যেতে রাজী হও, তাহলে সোনার ঘন্টা আমার হাতের মুঠোয়।
ওরা তো সবাই ভাইকিং। সাহসে, শক্তিতে ওরাও কিছু কম যায় না; ওরা হইচই করে ওঠে আমরা যাব। ফ্রান্সিস ঠোঁট আঙ্গুলে ঠেকিয়ে ওদের শান্ত হতে ইঙ্গিত করে। মা টের পেলে অনর্থ করবে।
ফ্রান্সিসের নিকট বন্ধু হ্যারি। কিন্তু সে চেঁচামেচিতে যোগ দেয় না। সে বরাবরই ঠাণ্ডা প্রকৃতির, কিন্তু খুবই বুদ্ধিমান। সে শুধু বলে আগে একটা জাহাজের বন্দোবস্ত করো–আমাদের নিজেদের জাহাজ–তারপর কার কত উৎসাহ দেখা যাবে।
আবার চেঁচামেচি শুরু হয়। মা ঘরে ঢোকে। বলল–কি ব্যাপার?
সবাই চুপ করে যায়। মা সবই আন্দাজ করতে পারে। তাই ফ্রান্সিসের ছোট ভাইটাকে পাঠিয়ে দেয়। সে এসে ওদের আড্ডায় বসে থাকে। ব্যাস আর কিছু বলবার নেই! ওরা যা বলবে ঠিক ফ্রান্সিসের মার কাছে পৌঁছে যাবে। সব মাটি তাহলে–
একা-একা ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে দিন কাটতে চায় না। সমুদ্রের উন্মত্ত গর্জন, উত্তাল ঢেউ তাকে প্রতিনিয়ত ডাকে! আবার কবে সমুদ্রে যাবে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে, ফ্রান্সিস শুধু ভাবে আর ভাবে। বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করবে তারও উপায় নেই। মার কড়া নজর। অগত্যা একটা উপায় বের করতে হল। রাত্রে মা একবার এসে দেখে যায়, ছেলে ঘুমোল কিনা। ফ্রান্সিস সেদিন ঘুমের ভান করে পড়ে রইল। মা নিশ্চিন্ত মনে ঘর থেকে চলে যেতেই ফ্রান্সিস জানলা খুলে মোটা লতাগাছটা বেয়ে নিচে বাগানে নেমে এল। তারপর দেয়াল ডিঙিয়ে রাস্তায়।
বন্ধুদের ডেকে পাঠাতে একটু সময় গেল। ততক্ষণ ফ্রান্সিস হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে একটা পোড়া বাড়িতে বন্ধুদের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। একজন-দুজন করে সবাই এল। সোনার ঘন্টা আনতে যাবে, এই উত্তেজনায় হইচই শুরু করে দিলে ফ্রান্সিস হাত তুলে সবাইকে থামতে বলল। গোলমাল একটু কমলে ফ্রান্সিস বলতে শুরু করল–ভাই সব, শুধু উৎসাহকে সম্বল করে কোন কাজ হয় না। ধৈর্য চাই, চিন্তা চাই। দীর্ঘদিন ধরে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হবে আমাদের। নিজেদের দাঁড় বাইতে হবে, পাল খাটাতে হবে, ডেক পরিষ্কার করতে হবে, আবার ঝড়ের সঙ্গে লড়তে হবে, ডুবো পাহাড়ের ধাক্কা সামলাতে হবে। কি, পারবে তোমরা?
–আমরা পারবো–সবাই সমস্বরে বলে উঠল।
–হয়তো আমরা পথ হারিয়ে ফেললাম, খাদ্য ফুরিয়ে গেল, জল ফুরিয়ে গেল–তখন কিন্তু অধৈর্য হবে না–নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করাও চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা রেখে বুক দিয়ে সব কষ্ট সহ্য করতে হবে। কি পারবে?
–পারবো। আবার সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল সবাই।
কয়েক রাত এই রকম সভাও পরামর্শ হল। কিভাবে একটা জাহাজ জোগাড় করা যায়? ফ্রান্সিস দু’একবার বাবাকে বলবার চেষ্টা করেছে–যদি উনি রাজার কাছ থেকে একটা জাহাজ আদায় করে দেন। কিন্তু ফ্রান্সিসের বাবা ওকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছেন।
হ্যারিই প্রথমে বুদ্ধিটা দিল। হ্যারি কথা বলে কম, কিন্তু যথেষ্ট বুদ্ধিমান। সে বলল–। আমরা রাজার জাহাজ চুরি করব।
–জাহাজ চুরি? সবাই অবাক।
–হ্যাঁ, রাজা যখন চাইলে জাহাজ দেবেন না, তখন চুরি ছাড়া উপায় কি।
–কিন্তু–ফ্রান্সিস দ্বিধাগ্রস্ত হল।
–আমরা তো সমুদ্রে ভেসে পড়ব, রাজা আমাদের ধরতে পারলে তো! তাছাড়া–যদি সত্যিই সোনার ঘন্টা আনতে পারি–তখন–
