তাকাল। ফ্রান্সিস বলল–আপনার কি এর জন্য কোন অনুশোচনা হয় না? রাজা গুমণ্ড একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন–সেদিন জাহাজঘাটে যেভাবে আমাকে অপমানিত লাঞ্ছিত করল এখানকার অধিবাসীরা তাতে একটা কথা বুঝলাম যে আমাকে আমার প্রজারা কী ঘৃণা করে। একটু থেমে রাজা গুমণ্ড বলল–আমি প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই। কিন্তু আমার তো জীবন শেষ হয়ে যাবে এই কয়েদঘরেই।
–না ফ্রান্সিস বলল–আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করববা আপনার মুক্তির জন্যে যদি আপনি প্রতিশ্রুতি দেন যে প্রজাদের মঙ্গল ছাড়া বাকী জীবন আপনি আর কিছু ভাববেন না।
–যদি সত্যিই আমি থিংভেলির রাজ্যের রাজপদ ফিরে পাই আমি সর্বতোভাবে প্রজাদের কল্যাণসাধন করবো। রাজা গুমণ্ড বলল।
–বেশ। ফ্রান্সিস বলল–আমি বিশ্বাস করি আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি সতোর সঙ্গে রক্ষা করবেন। আপনাকে মুক্তি দেবার জন্যে আমি রাজা ইনগলফকে অনুরোধ করবো। মনে হয় তিনি আমার অনুরোধ রক্ষা করবেন। ফ্রান্সিস ফিরে দাঁড়াল। মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এল।
তারপর ফ্রান্সিসরা জাহাজে ফিরে এল। দিন কাটতে লাগল। ফ্রান্সিস ঘুমোনোর আগে পর্যন্ত কবি আরির বইয়ে পাওয়া ছবি আর নক্সাটা দেখে। কিন্তু তার রহস্য আর উদ্ধার করতে পারে না।
দুএকদিন পরে পরে মারিয়া অথবা হ্যারিকে নিয়ে লোগবার্গে যায়। ঘুরে ঘুরে স্তম্ভগুলো দেখে, প্রদীপ দেখে, ঘাসে ঢাকা জায়গাটা দেখে কিন্তু কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। ফ্রান্সিস এখানে এলেই সেই বৃদ্ধ লোকটির ঘরে যায়। বৃদ্ধটির সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। বৃদ্ধটির নাম হ্রোলগ। সে আইসল্যাণ্ডের পুরোনো দিনের অনেক গল্প করে। কিন্তু সপ্তম স্তম্ভের ব্যাপারে ফ্রান্সিস আর নতুন কিছু জানতে পারে না। হ্রোলগ সেই পুরোনো কথাটাই বলে–আর একটা স্তম্ভ রাজা ফ্রোকি নাকি পুঁতেছিলেন। পাথরের নয়–সোনার স্তম্ভ। কিন্তু সে জানে না সেটা কোথায় পোঁতা হয়েছিল।
দেখতে দেখতে উৎসবের দিন এসে গেল। নগর থেকে দলে দলে স্ত্রী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে উৎসবের সাজে সেজে পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় টানা গাড়িতে চলেছে লোগবার্গে। ফ্রান্সিস, মারিয়া আর বন্ধুরাও চলল লোগবার্গে।
স্তম্ভগুলোর কাছে ওরা যখন পৌঁছল তখন দেখল প্রদীপ জ্বালানো হয়ে গেছে। আলোয় ভরে গেছে নাচগানের আসর। ওরা পাহাড়ের গায়ে খাঁজকাটা আসনগুলিতে বসল। একটু পরেই গাড়ি চড়ে রাজা ইনগলফ ও রানী এলেন। নিজেদের নির্দিষ্ট আসনে বসলেন। সেদিন দর্শকের সংখ্যা আগের দিনের চেয়ে বেশি।
উৎসব শুরু হলো। একদল মেয়ে রঙচঙে বাহারি পোশাকে সেজে স্তম্ভগুলোর পেছনে যে নক্সা-ভোলা মোটা কাপড় বিছানো হয়েছে তাতে এসে দাঁড়ালী বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠল। দুটি মেয়ে এগিয়ে এসে গান ধরল। গানের বিষয়ুরাজা ফ্লোকির বীরত্বের কাহিনী। ওরা দুজন গান শেষ করতে চারদিকে করতালির শব্দ শোনা গেল। এবার সব মেয়েরা মিলে গাইতে লাগল ভেড়াচালকদের গান। পাহাড়ের সবুজ ঘাসে লোকেরা ভেড়া চরিয়ে বেড়ায় এটা তাদের গান। এই গান শেষ হতে রাজা-রানী চলে গেলেন। আবার গান আর সেই সঙ্গে নাচ শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই মুহূমুর্হ করতালির মধ্যে আসর জমে উঠল। পুরুষ দর্শকরাও অনেকে নাচের আসরে যোগ দিল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে নাচগান চলল। প্রদীপের আলো কমে গেল। একসময় নাচগানের উৎসব শেষ হলো।
দর্শকরা নগরে ফিরে যেতে লাগল। ফ্রান্সিসের বন্ধুরাও ফেরার জন্যে একত্র হলো। ফ্রান্সিস মারিয়াকে বলল তুমি ওদের সঙ্গে ফিরে যাও। আমি আর হ্যারি কিছুক্ষণ পরে যাচ্ছি।
মারিয়া মাথা নেড়ে বলল–তোমাদের দুজনের সঙ্গে আমিও থাকবো। তোমাদের সঙ্গেই ফিরবো।
ফ্রান্সিস বলল–বেশ। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে রেলল–তোমরা চলে যাও। আমরা পরে যাবো।
বন্ধুরা হৈ হৈ করতে করতে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই উৎসবপ্রাঙ্গণ জনহীন হয়ে গেল। সেদিনের মতো আজও কয়েকজন তোক পাহাড়ের খাঁজে এখানে ওখানে ভেড়ার লোমের মোটা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে, ঘুমিয়ে আছে দেখা গেল।
ফ্রান্সিস পাথরের আসন ছেড়ে স্তম্ভগুলোর কাছে এল। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। সঙ্গে মারিয়া আর হ্যারি। একটুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ফ্রান্সিস যে নক্সা বোনা মোটা কাপড়টা পাতা ছিল তার ওপরে বসে পড়ল। তারপর হাতে মাথা রেখে আধশোয়া হলো। পাথরের প্রদীপের আলো কমে গেছে। ফ্রান্সিস তাকিয়ে রইল ছটা স্তম্ভ আর পাথরের প্রদীপগুলোর দিকে। হঠাৎ ওর নজরে পড়ল মাটিতে পাতা মোটা কাপড়ের নক্সাগুলোর ওপর খুব আবছা স্তম্ভের ছায়া পড়েছে। ছায়াগুলো লম্বা হয়ে নেমে এসেছে। তবে স্পষ্ট নয়। কাপড়ের নক্সার জন্যে আর প্রদীপের আলোগুলোও কমে এসেছে বলে। তবে এটা বোঝা যাচ্ছে ছায়া তিনটে ত্রিকোণ। নক্সাটাও তো ত্রিকোন! ফ্রান্সিস শরীরে এক ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়াল। চিৎকার করে ডাকলারি।
হ্যারি আর মারিয়া ছুটে এল। হ্যারি বলল–কি ব্যাপার?
–এই নক্সাকাটা কাপড়টা সরাতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
তারপর তিনজনে মিলে কাপড়টা সরাতে লাগল। তখনই দেখল, হ্রোলগ আস্তে আস্তে আসছে। ও আসার আগেই কাপড়টা ভোলা হয়ে গেছে। দাড়ি-গোঁফের ফাঁকে হেসে হ্রোগল বলল–তোমরা কেন তুলছো! ওটা তো আমার কাজ।
