মাথার ওপর আকাশ। আকাশে ম্লান আলো। চারপাশে পাতলা সাদাটে কুয়াশার আস্তরণ। তার মধ্যে দিয়ে ওরা ঘোড়ায় চড়ে চলল।
বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেল। এক সময় ওরা সেই ছোট্ট গ্রামটায় পৌঁছল। দেখল সেই ছোট গীর্জাটা। গীর্জাটাকে ঘিরে পাথরের বাড়িগুলোতে আলো জ্বলছে। বোঝা গেল সবাই জেগে আছে।
ঘোড়া থেকে নামল ওরা। গীর্জার লাগোয়া পাদ্রীমশাইয়ের সেই ঘরের দরজায় এসে ওরা দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বন্ধ দরজায় টোকা দিল। দরজা খুলে দাঁড়াল সেই চালো দাড়ি গোঁফওলা দল নেতা, দাড়ি গোঁফ আছে, তবে মোম দিয়ে মেজে চালো করা নেই। লোকটা মোমবাতির আলোয় একটা মোটা চামড়ার বই পড়ছিল। বোধহয় বাইবেল। ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে বলল–চিনতে পারো? লোকটা সঙ্গে ফ্রান্সিসকে চিনল। ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ফ্রান্সিসও হেসে ওকে জড়িয়ে ধরল। ওর পিঠে আদরের চাপড় দিল। আলিঙ্গন আলগা করে ফ্রান্সিস মারিয়াকে দেখিয়ে বলল–মারিয়া–আমার স্ত্রী। লোকটি মারিয়াকে মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। বলল–বসুন–বসুন। তিনজনে বেঞ্চিতে বসল।
–তোমার নাম কী ভাই? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
ইসলিফ। তারপর ইসলিফ বলল–আপনার নাম আমি জানি না। কিন্তু আপনি আমার সমস্ত জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন। আমি আজ অন্য মানুষ। ফ্রান্সিসও ভালো করে ইসলিফকে দেখল। সত্যি ইসলিফের পরনে চাষীদের পোশাক। চোখে মুখে শান্ত ভঙ্গী। ইসলিফ একটা ছেলেকে ডাকল। বলল–সবাইকে বল আমার পরম বন্ধু এসেছেন। ছেলেটা চলে গেল। একটু পরেই কিছু লোকজন এল। সেই স্ত্রীলোক দুজনও এল। তারা ফ্রান্সিস আর প্লিনিকে দেখে চিনল। বার বার বলতে লাগল–আপনারা সেদিন আমাদের সকলের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। আপনারা বসুন। না খাইয়ে আপনাদের ছাড়বো না।
অল্পক্ষণের মধ্যেই স্ত্রীলোকেরা খাবারের আয়োজন করল। গরম গরম গোল রুটি, ভেড়ার মাংস আর নানা সজির তরকারির মত। ওরা খেতে লাগল। খুব সুস্বাদু রান্না। ফ্রান্সিস গোগ্রাসে খেতে লাগল। হঠাৎ ইসলিফ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কান্না ভেজা গলায় বলল
ভাবলে আমার দুঃখে কষ্টে বুক ভেঙে যায়–কী অশান্ত কী বিশ্রী জীবন আমি কাটিয়েছি। বিশ্বাস করুন–আজ আমার মনে অপার শান্তি অসীম তৃপ্তি। আমার বাকী জীবন আমি উৎসর্গ করেছি এই ছোট্ট গ্রামটার মানুষদের জন্যে। কথাটা শুনে ফ্রান্সিস খুশী হল। মৃদু হেসে ইসলিফের পিঠ চাপড়াল। মারিয়া খেতে খেতে স্ত্রীলোকদের সঙ্গে গল্প করতে লাগল।
ওরা যখন ফিরে আসার জন্যে ঘোড়ায় উঠল ছোট্ট গ্রামের মানুষগুলো ওদের ঘিরে ধরল। বারবার বলতে লাগল–আবার আসবেন।
ফ্রান্সিসরা ঘোড়া ছোটাল রেভজাভিকের উদ্দেশ্যে। ঘোড়া চালাতে চালাতে ফ্রান্সিস ডাকল–মারিয়া।
–বলো। মারিয়া বলল।
–দেখ–জীবনে অনেক মূল্যবান জিনিস আমি অনেক কষ্টে আবিষ্কার করেছি উদ্ধার করেছি। তাতে খুশী হয়েছি। কিন্তু ইসলিফের জীবনধারা বদলাতে পেরেছি দেখে আমার সমস্ত মনপ্রাণ কী এক আনন্দে তৃপ্তিতে ভরে উঠেছে তা আমি বলে বোঝাতে পারবো না।
মারিয়া একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল–তোমার আনন্দে আমিও আনন্দিত। তোমার তৃপ্তিতে আমারও তৃপ্তি। ফ্রান্সিস বলল–প্লিনি–ভেড়া চড়ায় যারা তাদের সেই গানটা গাও না। প্লিনি হাসল। তারপর গলা চড়িয়ে সেই গানটা গাইতে লাগল। একটু পরে ফ্রান্সিস প্লিনির গলার সঙ্গে গলা মেলাল। মারিয়াও যোগ দিল। তিনজনের মিলিত কণ্ঠের গানের সুর দূরে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
একসময় দূর থেকে রেভজাভিক নগরের আলো ওরা দেখল। নগরে প্রবেশ করল ওরা। ফ্রান্সিস বলল–প্লিনি–রাজা গুমণ্ড যে কয়েদঘরে বন্দী আছে সেখানে আমাদের নিয়ে চলল।
–বেশ চলুন। প্লিনি বলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজবাড়িতে প্রবেশ করল ওরা। চত্বর পেরিয়ে প্লিনি ওদের কয়েদ ঘরের দরজায় নিয়ে এল ওদের। দরজার দুপাশে চারটে মশাল জ্বলছে। রক্ষীরা খোলা তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছে। ঘোড়া থেকে তিনজনে নামল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে একজন রক্ষীকে বলল-দরজা খোল। রাজা গুমণ্ডের সঙ্গে আমার কথা আছে। রক্ষীরা ফ্রান্সিসকে চিনল। প্লিনিও বলল ওদের। একজন গিয়ে দরজার বড় তালাটা খুলল। লোহার গারদ বসানো দরজাটা খুলল। তিনজনে ভেতরে ঢুকল। মশালের আলোয় দেখল একটা লম্বাটে পাথরের ওপর রাজা গুম কম্বল গায়ে শুয়ে আছে। ওদের ঢুকতে দেখে গুমণ্ড উঠে বসল। ফ্রান্সিস বলল–আপনার চিকিৎসা হয়েছে? গুমণ্ড কোন কথা না বলে মাথা নেড়ে বোঝাল চিকিৎসা হয়েছে।
ফ্রান্সিস বলল–রাজা গুমণ্ড–আপনার রাজত্বের নমুনা আমরা থিংভেলিরে দেখে এসেছি। আপনার সৈন্যদের অত্যাচারে নিপীড়নে আপনার নিরীহ প্রজারা জর্জরিত। মাত্র কয়েকদিন এই রেভজাভিকে রাজত্ব করে গেছেন। সেই কয়দিন যে অত্যাচারের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন তার স্মৃতি এখানকার মানুষ ভুলে যায়নি। তাই জাহাজঘাটায় আপনার প্রতি তীব্র ঘৃণায় ওরা আপনাকে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে। ফ্রান্সিস থামল। রাজা গুমণ্ড মুখ নিচু করে রইল। ফ্রান্সিস বলল–এই ঘটনা দেখে সহজেই অনুমান করতে পারছেন থিংভেলিরে আপনার প্রজাদের মনোভাব। তাই বলছিলাম–সারা জীবন তো নিষ্ঠুর উল্লাসে শুধু মানুষ হত্যা করেছেন আর নিপীড়ন অত্যাচার চালিয়েছেন। আজা আপনার ভাববার সময় এসেছে বাকী জীবনটা আপনি কীভাবে কাটাবেন। ফ্রান্সিস থামল। এতক্ষণে রাজা গুমণ্ড মুখ তুলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস থামল। এতক্ষণে রাজা গুমণ্ড মুখ তুলে ফ্রান্সিসের দিকে
