এবার ফ্রান্সিস বলল–রাজা গুমণ্ড–আপনার সেনাপতিকে হুকুম দিন সব সৈন্য যেন এক্ষুণি অস্ত্রত্যাগ করে। রাজা গুমণ্ড একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সেনাপতিকে লক্ষ্য করে বলল–সব সৈন্যকে অস্ত্রত্যাগ করতে বলল। সেনাপতি রাজা গুমণ্ডের অবস্থাটা সহজেই বুঝল। সে গাড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল–সৈন্যগণ–রাজা গুমণ্ডের জীবন বিপন্ন। তোমরা অস্ত্রত্যাগ কর। উপস্থিত সব সৈন্যরা হাতের তরোয়াল, কাঁধের তীর ধনুক পাথর বাঁধানো জাহাজঘাটায় ফেলে দিল। শব্দ উঠলঝন্ ঝন্ ঝনাৎ। তখনই বিস্কো তরোয়াল হাতে–আর শাঙ্কো ধনুক বাগিয়ে দ্রুত জাহাজ থেকে নেমে এল। পাথুরে জাহাজঘাটা থেকে সব অস্ত্র তুলে নিয়ে একপাশে জড়ো করে রাখল। তারপর দুজনে অস্ত্রগুলি পাহারা দিতে লাগল।
ফ্রান্সিস রাজা গুমণ্ডকে বলল–সেনাপতিকে হুকুম দিন সব সৈন্য জড়ো করে উনি যেন এক্ষুণি রাজবাড়ির উত্তরের প্রান্তরে চলে যান। একজন সৈন্যও যেন রেভাভিক নগরে না থাকে। রাজা গুমণ্ড চেঁচিয়ে সেই কথা সেনাপতিকে বলল। উপস্থিত সৈন্যরা দল বেঁধে উত্তরের প্রান্তরের দিকে চলল। সেনাপতি গাড়ি থেকে নেমে একটা ঘোড়ায় চড়লো। ছুটল সৈন্যদের ছাউনিতে রাজা গুমণ্ডের এই আদেশ জানাতে।
ফ্রান্সিস প্লিনিকে ডেকে বলল–নেমে গিয়ে একটা সাধারণ ঘোড়ায় টানা গাড়ি নিয়ে এসো। প্লিনি জাহাজ থেকে নেমে গেল গাড়ির খোঁজে। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল–যাও রাজপরিবারকে নিয়ে এসো। হ্যারি চলে গেল।
একটু পরেই রাজা ইনগলফ রানী আর রাজকুমার জাহাজের ডেকে এসে দাঁড়ালেন। রাজা রানী ও রাজকুমারকে দেখে জাহাজঘাটায় জড়ো হওয়া রেভজাভিকের অধিবাসীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। সত্যিই তারা রাজাকে দেবতার মত শ্রদ্ধা করে। তারা উল্লাসে করতালি দিতে লাগল। রাজা ইনগলফ মৃদু হেসে ডান হাত তুলে কয়েকবার নাড়লেন। তারপর রানী ও রাজকুমারকে নিয়ে পাটাতন দিয়ে নামতে লাগলেন। জনতা সোল্লাসে ধ্বনি দিল–আমাদের রাজার–জয় হোক। আমাদের রাজা–দীর্ঘজীবী হোন।
রাজা, রানী, রাজকুমার কালো গাড়িটায় গিয়ে উঠলেন। লোকেরা সরে দাঁড়িয়ে পথ করে দিল। গাড়ি চলল রাজবাড়ির উদ্দেশে।
ততক্ষণে প্লিনি একটা সাধারণ গাড়ি নিয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে রক্ষী সেই চারজন সৈন্যকে ডাকল। বলল–রাজা গুমণ্ডকে ঐ গাড়িতে চড়াও। পাহারা দিয়ে রাজবাড়িতে নিয়ে যাও। সাবধান–পালাতে না পারে।
এবার চারজন সৈন্যের পাহারায় রাজা গুমণ্ড পাতা পাটাতন দিয়ে নেমে এসে গাড়িতে উঠল। গাড়ি চলল। মাঝখানে রাজা গুমণ্ডকে দাঁড় করিয়ে রাখা হল। চারপাশে চারজন সৈন্য খোলা তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে রইল।
জনতা স্তব্ধ হয়ে এই দৃশ্য দেখছে। রাজা গুমণ্ড এই রেভজাভিকে কিছুদিন রাজত্ব করে গেছে। তার হুকুমেই তার সৈন্যরা যে নিষ্ঠুর নিপীড়ন চালিয়েছিল রেভাভিকের মানুষদের ওপর তা তারা ভুলতে পারেনি। হঠাৎ ভীড়ের মধ্যে কে চিৎকার করে উঠল খুনী শয়তান রাজা গুমণ্ড। তারপরই একজন রাস্তা থেকে একটা পাথরের টুকরো ছুঁড়ল রাজা গুমণ্ডকে লক্ষ্য করে মুহূর্তে জনতা উন্মত্তের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই গাড়ির ওপর। চারজন সৈন্য বহুকষ্টে ভীড় ঠেকাল। এইবার শুরু হল রাজা গুমণ্ডের ওপর পাথর বৃষ্টি। সৈন্যরা আত্মরক্ষার জন্যে গাড়িতে বসে পড়ল। পাথরের ঘায়ে রাজা গুমরে কপাল মাথা ফেটে গেল। দর দর করে রক্ত পড়তে লাগল। সারা শরীর রক্তাক্ত হল। রাজা গুমণ্ড জ্ঞান হারিয়ে গাড়ির মধ্যে পড়ে গেল। পাথর ছোঁড়া বন্ধ হল। গাড়ির কোচোয়ান এবার জোর গাড়ি চালাল। গাড়ির পেছনে পেছনে আরও কিছু লোক ছুটে আসতে লাগল চিৎকার করতে করতে।
গাড়ি রাজবাড়ির সদর দেউড়ি পেরিয়ে খোলা চত্বরে ঢুকল। তারপর রক্ষী সৈন্যদের নির্দেশ অনুযায়ী–পূবকোনায় কয়েদ ঘরের সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াল। রাজা গুমণ্ডের তখন জ্ঞান ফিরেছে। একে বাহুতে শাকোর তীরের ক্ষত তারপর এই পাথর বৃষ্টি রাজা গুমণ্ডের তখন উঠে দাঁড়াবার শক্তিও অবশিষ্ট নেই। সৈন্যরা ধরাধরি করে রাজা গুমণ্ডকে কয়েদ ঘরে ঢুকিয়ে দিল। রাজা গুমরে নাক মুখ থেকে তখনও রক্ত ঝরছে। •
দিনের হিসেবে পরদিন প্লিনি ফ্রান্সিসদের জাহাজে এল। রাজা ইনগলফ ফ্রান্সিস ও মারিয়াকে ভোজসভায় নিমন্ত্রণ করেছেন। এ নিমন্ত্রণ জানাতেই রাজা প্লিনিকে পাঠিয়েছিলেন। প্লিনির সঙ্গে কথা বলতে বলতে ফ্রান্সিসের মনে পড়ল সেই ছোট্ট গীর্জাটা ঘিরে ছোট্ট গ্রামটার কথা। মারিয়া পাশেই বসে ওদের কথাবার্তা শুনছিল। এবার ফ্রান্সিস সেই ছোট্ট গ্রামটার কথা, সেই ছুঁচলো দাড়ি গোঁফঅলা দলপতির কথা সব মারিয়াকে বলল। মারিয়া সব শুনে বলল–চলো না সেই ছোট্ট গ্রামটা দেখে আসি।
–বেশ চলল। ফ্রান্সিস বলল। ওর নিজেরও খুব ইচ্ছে করছিল সেই গ্রামটায় যেতে। তাই প্লিনিকে বলল।
–প্লিনি–তিনটি ভালো ঘোড়ার ব্যবস্থা করো। আমরা তিনজনে ঐ ছোট্ট গ্রামটায় যাবো। প্লিনি উঠে দাঁড়াল।
বলল–আমি এক্ষুনি ঘোড়া নিয়ে আসছি। আপনারা তৈরী হোন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্লিনি ঘোড়া নিয়ে জাহাজঘাটায় এল। তারপর ফ্রান্সিস মারিয়া ও প্লিনি ঘোড়া ছোটাল সেই ছোট্ট গ্রামটার উদ্দেশ্যে। প্লিনি সামনে থাকল। পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল।
