দল বেঁধে সবাই জাহাজে উঠে এল।
দিনের হিসেবে পরদিনই রাজা ইনগলফ প্লিনিকে ফ্রান্সিসের কাছে পাঠাল। প্লিনি বলল–মহামান্য রাজা ইনগল আপনাকে দেখা করতে বলেছেন।
ফ্রান্সিস হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়িতে এল। মনাকক্ষে রাজা এসে বসলেন। সঙ্গে সেনাপতি। রাজা ইনগলফ বললেন–ফ্রান্সিস-এখন তো আর এখানে থাকার মানে হয় না। ভাবছি–ঘণ্টা কয়েক পরে সৈন্যদের নিয়ে আমি, রানী ও রাজপুত্র রেভজাভিক ফিরে যাবো।
–না মাননীয় রাজা–এখনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে রেভজাভিক যাবেন না। বরং আপনি, মহামান্যা রানী ও রাজপুত্র আমাদের জাহাজে ফিরে চলুন। বন্দী রাজা গুমণ্ডকেও আমরা পাহারা দিয়ে নিয়ে যাবো। রেভকজাভিক পৌঁছে রাজা গুমণ্ডের সেনাপতি ও সৈন্যদের অস্ত্রত্যাগে বাধ্য করাবো। যদি তার আগেই আপনার সৈন্যবাহিনী রেভঞ্জাভিক পৌঁছে যায় তাহলে সাংঘাতিক যুদ্ধ লেগে যাবে। কারণ রেভঞ্জাভিকে রাজা গুমণ্ডের সেনাপতি ও সৈন্যরা এখনও জানে না যে রাজা গুমণ্ড আমাদের হাতে বন্দী, কাজেই আপনার সেনাপতিকে আদেশ দিন তিনি যেন দিনের হিসেবে চারদিন পর তার অধীনস্থ সৈন্যদের নিয়ে রেকজাভিক যাত্রা করেন। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস ঠিকই বলেছে মাননীয় রাজা। হ্যারি বলল।
রাজা ইনগলফ কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর বললেন–সেনাপতি আপনি কী বলেন?
–হ্যাঁ মহামান্য রাজা–ফ্রান্সিস সঠিক পরামর্শই দিয়েছেন। সেনাপতি বলল।
–বেশ তাই হবে। রাজা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। ফ্রান্সিসরাও উঠে দাঁড়াল। রাজাকে সম্মান জানিয়ে ওরা জাহাজে ফিরে এল। ফ্রান্সিস সব ভাইকিং বন্ধুদের ডেকে বলল–রাজপরিবার আমাদের জাহাজে চড়ে রেভঞ্জাভিক দিয়ে যাবেন। বন্দী রাজা গুমণ্ডকেও আমরা এই জাহাজেই নিয়ে যাবো। একটা নির্দিষ্ট কেবিন ঘরে তাকে বন্দী করে রাখা হবে। হুঁশিয়ার গুমণ্ড যেন আমাদের চোখে ধুলো দিয়ে পালাতে না পারে।
জাহাজে সাজো সাজো রব পড়ে গেল। আগেই সেই বড় কেবিন ঘরটাই ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হল। বন্দী রাজা গুমণ্ডের ঘরটাও তৈরি রাখা হল। এবার প্রতীক্ষা–রাজপরিবার কখন আসে। গুমণ্ডকে কখন নিয়ে আসা হবে।
দিনের হিসেবে পরদিন রাজা হজরলিফের রাজকীয় গাড়ি চড়ে রাজা ইনগলফ রানী ও রাজপুত্র এল। নির্দিষ্ট ঘরে তাদের আপ্যায়ণ করে নিয়ে আসা হল। রাজকীয় গাড়ির পেছনে এল একটা সাধারণ গাড়ি। তাতে হাত বাঁধা অবস্থায় রাজা গুমণ্ড। গুমণ্ডর ডানবাহুতে কাঁধে কম্বলের ফেট্টি জড়ানো। রাজার চারজন সৈন্য খোলা তরোয়াল হাতে সেই গাড়িটা পাহারা দিতে দিতে নিয়ে এল। রাজা গুমণ্ডকে তার নির্দিষ্ট কেবিনঘরে রাখা হল। পাহারাদার সেই চারজন সৈন্য তো রইলই ভাইকিংরাও সব সময়ের জন্য দুজন রইল।
নোঙর তোলা হল। জাহাজ চলল রেভকজাভিকের উদ্দেশ্যে। রাজা ইনগলফ আর রাণীর মন এখন অনেক ভালো। তারা মাঝে মাঝে ডেকে উঠে আসেন। ফ্রান্সিস, হ্যারি এবং তাদের ভাইকিং বন্ধুদের সঙ্গে গল্প-টল্প করেন। সবচেয়ে খুশী রাজকুমার। সে সারা জাহাজ টহল দিয়ে বেড়ায়। ছুটোছুটি করে ক্লান্ত হলেই চলে আসে ফ্রান্সিসের কেবিনে। বলে গল্প বলো। ফ্রান্সিসের জীবনে তো ঘটনা কম নেই। ও সেইসব গল্প বলে। গল্প শেষ হলেই রাজকুমার ছোটে টহল দিতে।
জাহাজ রেভজাভিক বন্দরে পৌঁছল। রেভজাভিক এখন রাজা গুমণ্ডের সেনাপতি সৈন্যদের দখলে। কাজেই ফ্রান্সিসরা আগে থেকেই অস্ত্রহাতে তৈরী হল। জাহাজঘাটায় জাহাজ ভিড়ল। ভাইকিংরা পাটাতন ফেলল। বন্দরে রাজা গুমণ্ডের সৈন্যরা পাহারায় ছিল। জাহাজ দেখে এবং সশস্ত ভাইকিংদের দেখে ওদের মনে সন্দেহ হল। ওরা পরস্পরকে ডাকাডাকি করে একত্র করল। প্রায় দশ পনেরোজন সৈন্য জাহাজঘাটায় খোলা তরোয়াল হাতে সারি দিয়ে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসও এটাই চাইছিল। রাজা গুমণ্ড এখন বন্দী এবং ওদের কজায় এটা গুমণ্ডের সৈন্যরা ও সেনাপতি জানুক। ফ্রান্সিস ওর তরোয়ালটা হ্যারিকে রাখতে নিল। তারপর পাতা পাটাতন দিয়ে নেমে জাহাজঘাটে এল। গুমণ্ডের সৈন্যরা খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে এল। ফ্রান্সিস দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করে বলল–আমি নিরস্ত্র। আমি যুদ্ধ করতে আসেনি। একজন মোটামত সৈন্য এগিয়ে এল
–তোমরা কোত্থেকে এলে?
–স্কালহল্ট থেকে। ফ্রান্সিস বলল।
–কী চাও তোমরা? সৈন্যটি বলল।
–তোমরা তোমাদের সেনাপতিকে সংবাদ দাও যে রাজা গুমণ্ড তাকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। আমি সেই চিঠি দিতে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল। তখনই একটি সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে সেখানে এল। মোটা সৈন্যটি অশ্বারোহী সৈন্যকে বলল চিঠির কথা। সৈন্যটি ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বলল–চিঠিটা আমাকে দিন। আমি নিয়ে যাচ্ছি।
–না–সেনাপতিকে এখানে আসতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। অশ্বারোহী সৈন্যটি আর কোন কথা না রলে রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে ঘোড়া ছোটাল। ফ্রান্সিস জাহাজে উঠে এল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাজা ইনগলফের কালো রঙের সোনালি লতাপাতার কাজ করা গাড়িটায় চড়ে সেনাপতি এল।
এবার ফ্রান্সিস রাজা গুমণ্ডকে হাতবাঁধা অবস্থায় এনে ডেকে দাঁড় করালা। পেছন থেকে তরোয়ালের ডগাটা রাজা গুমণ্ডের পিঠে ঠেকিয়ে রাখল। সেনাপতি রাজা গুমণ্ডের এই বন্দীদশা দেখে হতবাক। ততক্ষণে জাহাজঘাটায় অনেক লোক জড় হয়েছে। তারাও কম আশ্চর্য হল না। রেভজাভিকের অধিবাসীদের মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। দলে দলে তোক জাহাজঘাটায় এসে ভীড় করতে লাগল।
