ওদিকে শাঙ্কো বরফ ঢাকা পাথরের আড়ালে বসে তীর পরিয়ে ধনুক বাগিয়ে ধরল। গাড়িটা হাত কুড়ি এগিয়েছে তখন। শাঙ্কোর নাক মুখ দিয়ে জোরে জোরে শাস পড়ছে তখন। মাত্রা একটা তীরে রাজা গুমণ্ডকে ঘায়েল করতে হবে। নিশানা নিখুঁত হওয়া চাই। ছিলা টেনে গভীর মনোযোগের সঙ্গে রাজা গুমণ্ডের তরোয়াল ধরা ডান বাহু লক্ষ্য করে শাঙ্কো তীর ছুঁড়ল। পাকা হাত শাঙ্কোর। সাদা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে তীরটা ছুটে এলো। লাগল ঠিক রাজা গুমণ্ডের ডান বাহুর ওপরের দিকে। রাজা গুমণ্ড আঃ শব্দ করে লাফিয়ে উঠল। হাত থেকে তোয়াল ছিটকে গাড়ির ভেতরেই পড়ল। মারিয়া নিচু হয়ে দ্রুত হাতে তরোয়ালটা তুলে নিয়ে বরফ কাদা জলে ফেলে দিল। রাজা গুমণ্ড বাঁ হাত দিয়ে টেনে তীরটা খুলে ফেলল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। ও সামনের আসনে বসে পড়ল। গোঙাতে লাগল। মারিয়া চিৎকার করে ডাকল–ফ্রান্সিস–বিস্কো-শিগগির এসো। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসরা কিছু দেখতে পারছিল না। কিন্তু মারিয়ার চিৎকার ওদের কানে পৌঁছাল। মারিয়া চিৎকার করে কোচোয়ানকে বলল–গাড়ি থামাও। কোচোয়ান গাড়ি থামাল। ফ্রান্সিসরা ছুটে এল। খোলা তরোয়াল হাতে গাড়ি ঘিরে দাঁড়াল। রাজা গুমণ্ড তখনও ডান বাহু বাঁ হাতে চেপে গোঙাচ্ছে। ফ্রান্সিস বুঝল শাঙ্কো তীর ছুঁড়ে গুমণ্ডকে ঘায়েল করেছে। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকিয়ে শাঙ্কোকে খুঁজতে লাগল। একটু পরেই দেখল জলেভেজা পোশাক নিয়ে শাঙ্কো ক্লান্ত পায়ে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে গেঁটে ওর দিকে আসছে। ফ্রান্সিস ছুটে গিয়ে শাঙ্কোকে জড়িয়ে ধরল। বিস্কোও গিয়ে জড়িয়ে ধরল।
আবার সবাই গাড়িতে উঠল। ক্লান্ত শাঙ্কো মারিয়ার পাশে বসল। রাজা গুমণ্ডের পাশে বসল বিস্কো। ফ্রান্সিস আর প্লিনি খোলা তরোয়াল হাতে গুমণ্ডের সামনে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে কোচোয়ানকে বলল–গাড়ি ছাড়ো–যত জোরে পারো চালাও। গাড়ি দ্রুত ছুটল। ফ্রান্সিস দেখল রাজা গুমণ্ডের পোশাকের ডান হাতের কাঁধের কাছে রক্তে ভিজে উঠেছে। গুমণ্ড অল্প অল্প গোঙাচ্ছে।
কুয়াশাও বরফ কাদা জলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি জোরে ছুটল। শপাং–শপং–চাবুকের শব্দ শোনা গেল। বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে গাড়ি চলল।
বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে গাড়ি চলল। একসময় ম্লান আলোয় দূর থেকে দেখা গেল জ্বলন্ত মশালের আলোর বিন্দু। স্কালহল্ট আর দূরে নয়। গাড়ি চলল। ফ্রান্সিস এতক্ষণ এক মুহূর্তের জন্যে তরোয়াল নামায়নি। শাঙ্কোও তীর-ধনুক একভাবে ধরে আছে। বলা যায় না পথের ধারে তুষার ঢাকা পাথরের আড়ালে রাজা গুমণ্ডের সৈন্যরা ওৎ পেতে আছে কিনা।
কিছুক্ষণ পরে স্কালহল্ট নগরে গাড়ি প্রবেশ করল। এইবার ফ্রান্সিস তরোয়াল নামিয়ে কোমরের কোষে রাখল। শাঙ্কোও কাঁধে ধনুক ঝোলাল তীর রাখল কাঁধের তূনীরে।
বিস্কো আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল–ফ্রান্সিস, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছ। বসো৷ ফ্রান্সিসও এতক্ষণে ভীষণ ক্লান্তিবোধ করল। ও আসনে বসে পড়ল। প্লিনি এখন অনেকটা সুস্থবোধ করছিল।
স্কালহল্ট নগরে বন্দরে তখন মানুষের কর্মচঞ্চল জীবন বয়ে চলেছে। দোকানে বাজারে নগরবাসীদের ভিড়। প্রায় সকলেই দেখল গাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা রাজা গুমণ্ডকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চলন্ত গাড়ির পেছনে মানুষের জটলা ছুটে এল। রাজবাড়ির সামনে যখন গাড়ি এল তখন চারদিকে মানুষের ভিড়ে ছয়লাপ। সবাই ফ্রান্সিসদের দেখছে–দেখছে গাড়িতে আহত রাজা গুমণ্ডকে। কিন্তু ওরা কেউই বুঝতে পারছে না ব্যাপারটা কী?
রাজবাড়ির সদর দেউড়ি খোলাই ছিল। দ্বাররক্ষীরা পথ ছেড়ে দিল। গাড়ি রাজবাড়ির চত্বরে ঢুকল। থামল এসে সিঁড়ির সামনে। এর মধ্যে রাজবাড়ির অন্দরমহলে সংবাদ পৌঁছে গেছে যে, ফ্রান্সিসরা মারিয়াকে মুক্ত করে রাজা গুমণ্ডকে বন্দী করে নিয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস একজন দ্বাররক্ষীকে ডেকে রাজামশাইকে আসার জন্য বলে পাঠাল।
একটু পরেই রাজা ইনগল হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এলেন। উনি খবরটা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। বন্দী রাজা গুমণ্ডকে দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে গেলেন। ফ্রান্সিস গাড়ি থেকে নেমে রাজা ইনগলফকে সম্মান জানিয়ে বলল–মারিয়া এখন মুক্ত। রাজা মণ্ডকেও বন্দী করে এনেছি। এবার আপনার চিরশত্রুর ব্যবস্থা কী করবেন করুন।
–তোমরা ভেতরে আসবে না? রাজা বললেন।
–না। আমরা খুব পরিশ্রান্ত। আমাদের এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। মারিয়াকে নিয়ে এই গাড়িতেই আমরা জাহাজে ফিরে যাবো। তবে প্লিনি থাকবে। ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিন।
বেশ। রাজা ইনগলফ বললেন। তারপর রাজা গুমণ্ডকে বললেন–আপনি নেমে আসুন। আপনার বিচার হবে। রাজা গুমণ্ড কোনো কথা না বলে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। প্লিনিও নামল। তারপর রাজা ইনগলফের পেছনে পেছনে রাজা গুমণ্ড ও প্লিনি রাজপুরীতে প্রবেশ করল। ফ্রান্সিস কোচওয়ানকে গাড়ি জাহাজঘাটায় নিয়ে যেতে বলল।
গাড়ি চলল জাহাজঘাটার দিকে।
জাহাজঘাটায় গাড়ি এসে থামল। ফ্রান্সিসদের দেখে ওদের বন্ধুদের আর তর সইল না। ওরা ছুটে জাহাজ থেকে পাটাতনের ওপর দিয়ে নেমে এল। গাড়ি থেকে ফ্রান্সিস নামতেই হ্যারি ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। হ্যারির চোখে জল এল। ফ্রান্সিস হ্যারির পিঠে মৃদু চাপড় দিতে দিতে বলল–এই–ছেলেমানুষি করো না। তারপর হ্যারিকে ছেড়ে দিয়ে ভাইকিং বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল–সব বলবো। তার আগে জাহাজে চলো। গরম গরম ভেড়ার মাংস আর রুটির ব্যবস্থা করো।
