ফ্রান্সিস আলোর কাছে এগিয়ে এল।
এখন যদি নিরস্ত্র আপনাকে হত্যা করি? হেসে বলল–এবার চিনতে পারছেন?
–ও–ফ্রান্সিস। রাজা গুমণ্ড মৃদুস্বরে বলল।
–হ্যাঁ। সোনার ঘন্টা আনতে যাবার সময় আমাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে ছিলেন। এখন যদি নিরস্ত্র আপনাকে হত্যা করি? রাজা গুমণ্ড কোনো কথা না বলে মাথা নিচু করল। যাকগে–ফ্রান্সিস বলল–আক্রান্ত না হলে আমি আক্রমণ করি না। নিজের জীবন বিপন্ন না হলে আমি নরহত্যা করি না। সামনে এগিয়ে আসুন।
রাজা গুমণ্ড এগিয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস দেখল অতীতের সেনাপতির মুখে চোখে বয়েসের ছাপ পড়েছে। কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এখনও ধূর্তামি। ফ্রান্সিস বলল–আপনি আমার সামনে থাকবেন। আপনার পিঠে তরোয়ালের ফলা ঠেকিয়ে রাখবো আমি। এইভাবে আমরা নিরাপদে রাজবাড়ি থেকে বেরুবো। তারপর একইভাবে আপনাকে গাড়িতে চড়িয়ে রেভজাভিকে নিয়ে যাবো। কোনোরকম চালাকি করতে গেলে আপনাকে আমি তৎক্ষণাৎ হত্যা করবো। মনে থাকে যেন। কথাটা শেষ করেই ফ্রান্সিস এক লাফে রাজা গুমণ্ডের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। রাজার পিঠে তরোয়ালের ফলা চেপে বলল–চলুন। কিন্তু ধোঁকা দেবার চেষ্টা করবেন না।
রাজা মণ্ড বুঝল ফ্রান্সিসের কথামতোই তাকে এখন চলতে হবে। ওর কথার অবাধ্য হলে মৃত্যু সুনিশ্চিত। কাজেই রাজা ধীরপায়ে শয়নকক্ষের দরজার দিকে চলল। ঠিক পেছনেই তরোয়াল ধরে ফ্রান্সিস। তারপর মারিয়া ও প্লিনি।
দরজার বাইরে আসতেই ফ্রান্সিস দেখল বিস্কো আর শাঙ্কোকে চার-পাঁচজন সৈন্য ঘিরে ধরেছে। তরোয়ালের প্রচণ্ড লড়াই চলছে। দুই বন্ধুরই গায়ের পোশাক তরোয়ালের ঘায়ে ছিন্নভিন্ন। কাঁধে, হাতে, বুকে রক্তের ছোপ।
রাজা গুমণ্ড ও ফ্রান্সিসকে দেখে সৈন্যরা লড়াই থামাল। মাথা নিচু করে রাজাকে সম্মান জানাল। ফ্রান্সিস বলল–ওদের অস্ত্রত্যাগ করতে বলুন। রাজা গুমণ্ড ডান হাত তুলে অস্ত্রত্যাগের ইঙ্গিত করল। সৈন্যরা তরোয়াল ফেলে দিল। পাথরের মেঝেয় শব্দ উঠল–ঝনাৎ-ঝনাৎ। হাঁপাতে হাঁপাতে বিস্কো আর শাঙ্কো ফ্রান্সিসদের কাছে এল। ফ্রান্সিস বলল–পেছনে পেছনে এসো। তারপর রাজাকে বলল–সৈন্যদের বলুন–গাড়ি তৈরি করে সিঁড়ির সামনে রাখতে। সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে সেই কথা বলল। ফ্রান্সিস বলল, জলদি। তিনজন সৈন্য ছুটে চলে গেল। দ্বাররক্ষী আর সৈন্যরা বুঝল-রাজার জীবন বিপন্ন। এখন ফ্রান্সিসদের আক্রমণ করলে রাজার প্রাণ যাবে। কাজেই ওরা সামনে থেকে সরে দাঁড়াল। রাজাকে সামনে রেখে ফ্রান্সিসরা চলল বাইরের সিঁড়ির দিকে।
বাইরে রাজবাড়ির সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ফ্রান্সিস দেখল রাজার ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। কালো কাঠে সোনালি লতাপাতার কাজকরা গাড়ি। গাড়ির দুদিকে বসার আসন। চার ঘোড়ার খোলা গাড়ি।
.
রাজাকে সামনে রেখে ফ্রান্সিসরা গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বলল–একটা আসনে মারিয়া বসবে। অন্যটায় আহত প্লিনিকে শুইয়ে ওর মাথা কোলে নিয়ে বিস্কো বসবে। রাজা গাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকবে। তার পেছনে পিঠে তরোয়াল ঠেকিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকবো। শাকো তীর-ধনুক বাগিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে। এবার ওঠো সবাই।
সবাই গাড়িতে উঠল। ফ্রান্সিসের নির্দেশমতো সবাই যে যার জায়গা করে নিল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে কোচওয়ানকে বলল–স্কালহল্ট চলল। বেচাল করেছে কি তোমাকে শেষ করে দেবো।
গাড়ি চলল। রাজবাড়ির প্রধান দরজার সামনে তখন বেশ কিছু সৈন্য নগরবাসী ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস রাজা গুমণ্ডের পিঠে তলোয়ারের চাপ দিয়ে। বলল–সৈন্যদের বলুন–কেউ যেন আমাদের বাধা দেবার চেষ্টা না করে। রাজা গুমণ্ড ডান হাত ওপরে তুলে সৈন্যদের লক্ষ্য করে সেকথা বলল। গাড়ি রাজবাড়ির থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পড়ল। তারপর চলল স্কালহল্টের দিকে। পথের লোকজন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে এই ঘটনা দেখল। একসময় নগর শেষ হলো। উন্মুক্ত প্রান্তর পড়ল। সেই প্রান্তরের টুকরো পাথর ছড়ানো রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটল রেভঞ্জাভিকের দিকে।
আকাশ-দিগন্তে অল্প আলো। সেই আলোও প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে নীলচে কুয়াশায়। রাস্তার এখানে ওখানে তুষার জমেছে। তার মধ্যে দিয়েই অল্প আঁকুনি খেতে খেতে গাড়ি ছুটল।
ঘণ্টা কয়েক কেটে গেল। গাড়ি থামানো, বিশ্রাম, খাওয়া এসব কথা কারো মনেই পড়ল না। ফ্রান্সিস বার বার কোচোয়ানকে দ্রুত গাড়ি চালাতে বলছিল। চাইছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব স্কালহল্টে পৌঁছুতে। বলা যায় না রাজা গুমণ্ডের সৈন্যরা যদি একসঙ্গে ছুটে এসে ওদের ঘিরে ধরে তাহলে বিপদে পড়তে হবে। কাজেই গাড়ি ছোটাও যত জোরে পারো।
একসময় দূর থেকে কুয়াশার আস্তরণের মধ্যে দিয়ে ওফাস নদী দেখা গেল। নদীর এই পারে এসে গাড়ি থামল। কাঠের ভেলাটা এপারেই ছিল। প্রথমে কোচোয়ান আর শাঙ্কো, প্লিনি, বিস্কো গাড়িটা তুলে ভেলায় ওঠাল। বিস্কো লগি ঠেলে নৌকোটা পার করল। দড়ি ধরে টেনে, কাঠের ভেলাটা আবার এপারে আনা হল। ঘোড়া চারটে পার করা হল। সঙ্গে প্লিনি আর কোচোয়ান। ঘোড়াগুলো ওপারে পৌঁছলো। ঘোড়াগুলো নামিয়ে আনল বিস্কো। কোচোয়ান ঘোড়াগুলো গাড়ির সঙ্গে জুড়তে লাগল। ততক্ষণে রাজা গুমণ্ড আর মারিয়া ভেলায় চড়ে এপারে এসে পৌঁছল গুমণ্ডের সামনে খোলা তরোয়াল হাতে প্লিনি দাঁড়িয়ে রইল। মারিয়া গিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। এবার ফ্রান্সিস ও শাঙ্কো ভেলায় চড়ে পার হতে লাগল। ভেলাটা নদীর মাঝামাঝি এসেছে এমনই সময় একটা ছোট বরফের চাঁই ভেসে এসে ভেলাটায় জোর ধাক্কা মারল, ভেলাটা লাফিয়ে উঠল। ফ্রান্সিস টাল সামলাল কিন্তু শাঙ্কো পারল না। ছিটকে নদীর জলে পড়ে গেল। ওদিকে এই ঘটনা দেখে প্লিনি দুহাত তুলে লাফিয়ে উঠল। রাজা গুমণ্ডও এই সুযোগের প্রতীক্ষা করছিল। সে পেছন থেকে সেই হাত তোলা অবস্থায় প্লিনিকে এক ধাক্কা দিল। ও মুখ থুবড়ে কাদা বরফের মধ্যে পড়ে গেল। রাজা গুমণ্ড বিস্কো ছুটে আসার আগেই এক লাফে ছুটে গিয়ে তরোয়ালটা তুলে নিল। তারপর বিদ্যুৎবেগে গাড়িটায় লাফিয়ে উঠল। তরোয়লের ধারালো জায়গাটা মারিয়ার গলার কাছে ঠেকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল–তোমরা কেউ এক পা এগিয়ে এলে আমি মারিয়াকে হত্যা করবো। এরকম একটা ঘটনা ঘটে যাবে ফ্রান্সিসরা কেউ কল্পনাও করেনি। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি লগি ঠেলে নদীর এপারে এসে পড়ল। কিন্তু আর এগোেল না। দাঁড়িয়ে পড়ল। ও ধরেই নিয়েছিল শাকো নদীর জল থেকে ভেলায় উঠে পড়েছে। কিন্তু শাঙ্কো জলে থেকেই সব ঘটনাটা দেখল। তারপর কাঁধের তৃনীরটা এক হাতে ধরে রেখে ডুব সাঁতার দিয়ে এপারে চলে এসেছে ততক্ষণে। মাথা না তুলে বরফ কাদা জলের মধ্যে দিয়ে সাদা কুয়াশার আস্তরণের মধ্যে দিয়ে বুক হিঁচড়ে আস্তে আস্তে একটা বড় বরফ ঢাকা পাথরের চাইয়ের পেছনে গিয়ে আড়াল নিল। উত্তেজনার মাথায় রাজা গুমণ্ড শাঙ্কোকে লক্ষ্যই করতে পারল না। গুমণ্ড চেঁচিয়ে কোচোয়ানকে ডাকল। কোচোয়ান গাড়িতে উঠে নিজের আসনে বসল। গাড়ি জোতা হয়ে গেছে তখন। গুমণ্ড গলা চড়িয়ে হাঁকল–গাড়ি চালাও-জোরে। কোচোয়ান ঘোড়াগুলোর গায়ে চাবুক হাঁকাল। গাড়ি চলতে শুরু করল। ওদিকে ফ্রান্সিস, প্লিনি, বিস্কো সব পুতুলের মত দাঁড়িয়ে রইল। নড়ল না ওরা। যদি ওদের এগিয়ে যেতে দেখে রাজা গুমণ্ড মারিয়ার গলায় তরোয়াল বসিয়ে দেয়।
