এদিকে ফ্রান্সিস বলল–খোলা দরজা দিয়ে আমরা ভেতরে ঢুকবো। ঘোট সবাই, জলদি। চারজনে দ্রুত ছুটে অন্ধকার রাস্তাটা পেরিয়ে রাজবাড়িতে ঢুকে পড়ল। ফ্রান্সিস ছুটতে ছুটতে বলল–প্লিনি, অন্দরমহলে নিয়ে চলো। রাজার শয়নকক্ষে। জলদি। ছুটল চারজন।
ওদিকে সৈন্যদের ছাউনিতে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। সৈন্যরা সব বেরিয়ে এসেছে ছাউনি ছেড়ে। কাঠের বড় বড় বালতি নিয়ে অনেকেই ছুটে যাচ্ছে কাছের উষ্ণ প্রস্রবণের দিকে। ওখান থেকে জল এনে জল ছিটিয়ে আগুন নেভাবার চেষ্টা চলেছে। কুয়াশাভরা আকাশে আগুনের আভা ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে কালো ধোঁয়া।
রাজবাড়ির অন্দরমহলের রক্ষীরা ছুটে জানালার কাছে চলে এসেছে। সবাই আগুন দেখছে। অন্দরমহলের কাছে কোনো রক্ষী নেই।
ফ্রান্সিসরা রক্ষীদের দুটো ঘর পেরিয়ে অন্দরমহলে ঢুকল। সঙ্গে সঙ্গে ওরা। চারজন রক্ষীর একেবারে সামনে পড়ে গেল। রক্ষীরা অবাক। এরা কোত্থেকে এল? ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল-শাঙ্কো-বিস্কো–ওদের প্রাণে মেরো না। আহত করো। বিস্কো আর শাঙ্কো তরোয়াল খুলে রক্ষীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো তরোয়ালের লড়াই। শাকো আর বিস্কো নিপুণ হাতে তরোয়াল চালাতে লাগল। একটুক্ষণের মধ্যেই দুজন রক্ষী হাতে কাঁধে তরোয়ালের ঘা খেয়ে মেঝেয় পড়ে গেল। বাকি দুজনের সঙ্গে লড়াই চলল। ফ্রান্সিস প্লিনির হাত ধরে টানল–চলো।
দুজন ঘরের পর ঘর পেরিয়ে চলল। একটা ঘরে দরজার সামনে দেখল দুজন রক্ষী। একজন ভোলা তরোয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অন্যটি দরজায় হেলান দিয়ে চোখ বুজে ঘুমোচ্ছ। হাতে ঠিক তরোয়াল ধরে আছে। ফ্রান্সিসদের দেখে জাগ্রত রক্ষীটি হকচকিয়ে গেল। পরক্ষণেই তরোয়াল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্লিনিও তরোয়াল হাতে এগিয়ে গেল। শুরু হলো দুজনের তরোয়ালের লড়াই। ফ্রান্সিস দ্রুত হাতে ঘুমন্ত রক্ষীটির হাত থেকে তরোয়ালটা ফেলে দিল। পাথরের মেঝেতে ঝনাৎ করে তরোয়ালটা পড়ে যাওয়ার শব্দে রক্ষীটি ঘুম ভেঙে চমকে চোখ চাইল। ফ্রান্সিস ততক্ষণে ওর গলায় নিজের তরোয়ালের ফলাটা ঠেকিয়ে বলল–রাজকন্যা মারিয়াকে কোন ঘরে বন্দী করে রাখা হয়েছে? রক্ষীটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। ফ্রান্সিস তরোয়ালে আরো একটু চাপ দিল। বলল–বল–রাজকন্যা মারিয়া–কোথায়? রক্ষীটি এবার তাড়াতাড়ি দরজাটা দেখিয়ে বলল–এই ঘরে, ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে রক্ষীটির ঘাড়ের কাছে তরোয়ালের বাঁটটা দিয়ে একটা ঘা মারল। রক্ষীটি উঃ শব্দ করে মেঝেয় পড়ে গেল। ওদিকে প্লিনি তখনও অন্য রক্ষীটির সঙ্গে লড়াই করে চলেছে।
ফ্রান্সিস ঘরটার মধ্যে ঢুকল। বাইরের আগুন-আগুন চিৎকার আর লোকজনের হৈ-হল্লায় মারিয়ার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ও শুয়ে শুয়েই ভাবছিল কোথায় আগুন লেগেছে? এমন সময় ফ্রান্সিসের চাপা স্বরের ডাক শুনল–মারিয়া–মারিয়া।
মারিয়া দ্রুত বিছানায় উঠে বসল। দেখল সামনেই ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে। মারিয়া বিছানা থেকে নেমে এল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–এক মুহূর্ত দেরী নয়। শিগগির চলো। বলেই ও দরজার দিকে ছুটল। মারিয়াও পেছনে পেছনে ছুটল। ঘরের বাইরে এসে দেখল যে প্লিনি তখনও রক্ষীটির সঙ্গে লড়াই করে চলেছে। প্লিনির পোশাক এখানে ওখানে তরোয়ালের ঘায়ে ছিঁড়ে গেছে। সারা দেহ রক্তাক্ত। ফ্রান্সিস বুঝলপ্লিনি আর আত্মরক্ষা করতে পারবে না। ফ্রান্সিস বুঝল রক্ষীটি তরোয়াল চালনায় নিপুণ। ফ্রান্সিস মনে মনে ওর প্রশংসা করল। কিন্তু হাতে সময় কম। ওকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঘায়েল করতে হবে। ফ্রান্সিস দুএকবার আত্মরক্ষার ভান করেই দ্রুত লাফিয়ে উঠে নোকটার ডান কাঁধের কাছে তরোয়ালের কোপ বসিয়ে দিল। রক্ত বেরিয়ে এল। লোকটা তরোয়াল ফেলে কঁধ বাঁ হাতে চেপে ধরল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে রক্ষীটিকে বলল–আমাদের রাজার শয়নকক্ষে নিয়ে চলো। জলদি। বলেই হাতের তরোয়ালটা রক্ষীটির পিঠে চেপে ধরল। রক্ষীটি একটা কাতর শব্দ করে এগিয়ে চলল। ফ্রান্সিসরা ওর পেছনে পেছনে চলল। আহত প্লিনিও চলল।
রাজার শয়নকক্ষের দরজায় দুজন রক্ষী খোলা তরোয়াল হাতে পাহারা দিচ্ছিল। ঝোলানো মোমবাতির আলোয় ফ্রান্সিসদের আসতে দেখে তরোয়াল উঁচিয়ে ছুটে এল। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল–তোমরা যদি আমাদের আক্রমণ করো তাহলে তোমাদের এই বন্ধুটিকে আমি নিকেশ করে দেবো। রক্ষী দুজন থমকে দাঁড়াল। এবার ভালভাবে দেখল যে ফ্রান্সিস ওর তরোয়ালের ফলা রক্ষীটির পিঠে চেপে ধরেছে। রক্ষীটির কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে। ওরা তরোয়াল নামিয়ে একপাশে সরে দাঁড়াল।
সবাইকে নিয়ে ফ্রান্সিস রাজা গুমণ্ডের শয়নকক্ষে ঢুকল। দুতিনটে কাঁচ ঢাকা মোমবাতি জ্বলছে শয়নকক্ষে। দামী কাঠের সুদৃশ্য কারুকাজ-করা পালঙ্ক। পাখির পালকের নরম বিছানা। কিন্তু ফ্রান্সিসের তখন এসব দেখার সময় নেই। ও বিছানার দিকে তাকাল। রাজা গুমণ্ড বিছানায় নেই। রাজা গুমণ্ড কাঁচের কারুকার্য করা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। বাইরে তাকিয়ে আগুন দেখছিল। সৈন্য ও লোকজনের আগুন-আগুন চিৎকার হৈ-হল্লায় রাজার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঐ জানালার কাছটা একটু অন্ধকারমতো। ফ্রান্সিস ঘরের চারদিকে তাকিয়েও বুঝতে পারল না রাজা কোথায় আছে। তখনই জানালার অন্ধকার জায়গাটি থেকে রাজা গুমণ্ড গলা চড়িয়ে বলল–তোমরা কে? কী চাও তোমরা? ফ্রান্সিস এবার রাজা গুমণ্ডকে দেখতে পেল। বলল–সেনাপতিমশাই–আপনার এখানে নির্বাসন হয়েছিল। এখন থিংভেলির রাজা হয়েছেন। রাজা তখনও ফ্রান্সিসকে চিনতে পারেননি। বলল–তুমি কে?
