–তোমাদের রাজার মতামত জানাবার জন্যেই আমাকে সময় চাইতে হল। রাজা বললেন। বেশ চিন্তাভারাক্রান্ত দেখা দিল রাজাকে।
–আপনি সময় চেয়ে ভালোই করেছেন। এতে আমাদের কাজের সুবিধা হল। ফ্রান্সিস বলল।
–কোন কাজের কথা বলছো। রাজা জানতে চাইলেন।
–আমরা কয়েকজন মিলে আবার থিংভেলির যাবো। যে কেরই হোক মারিয়াকে মুক্ত করে আনবো। ফ্রান্সিস বলল। রাজা ইনগলফ মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। মাথা তুলে বললেন–ফ্রান্সিস তুমি যথেষ্ট সাহসী বুদ্ধিমান। তোমাকে কিছু বলার নেই। কিন্তু এভাবে বিপদের মুখে এগিয়ে যাওয়া, যদি তোমাদের কিছু হয়?
–আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন হ্যারি বলল–ফ্রান্সিসরা বিপদে পড়লে আমরা সব ভাইকিং যাবো উদ্ধার করতে।
–তবু তোমাদের রাজা কী উত্তর দেন সেটা জানবার জন্যে তোমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করা উচিত। রাজা বললেন।–না মাননীয় রাজা–ফ্রান্সিস বলল–এখনই ঠিক সময় অভিযানে বেরুবার। কারণ রাজা গুমন্ড এখন অনেক নিশ্চিন্ত। ও ভালো করেই জানে আমাদের রাজা তাঁর মারিয়াকে প্রাণের চেয়েও বেশী স্নেহ করেন ভালোবাসেন। সুতরাং আমাদের রাজা নিশ্চয়ই কন্যার জীবনের বিনিময়ে সোনার ঘণ্টা দিয়ে দিতে ইতস্তত করবেন না। কাজেই রাজা গুমন্ড এখন মারিয়াকে পাহারা দেবার ব্যাপারে একটু ঢিলে দেবেন। আমরা যে আবার হানা দিতে পারি–মারিয়াকে আবার মুক্ত করার জন্যে যেতে পারি এটা সে ভাবতেই পারবে না। তাই এই সুযোগ হাত ছাড়া করা চলবে না। রাজা ইনগলফ কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর উঠে দাঁড়ালেন। বললেন–বেশ–দেখ চেষ্টা করে। ফ্রান্সিসরাও উঠে দাঁড়াল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে ওরা চলে এল।
সেইদিন জাহাজে ফিরেই ফ্রান্সিস হ্যারি, বিস্কো শাঙ্কো আর প্লিনিকে নিয়ে আলোচনায় বসল। কীভাবে অভিযান চালানো হবে বিপদের হাত থেকে বাঁচতে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে–এই সব নিয়ে আলোচনা হল।
দিনের হিসেবে পরদিনই ফ্রান্সিস বিস্কো শাঙ্কো আর প্লিনি ঘোড়ার পিঠে চডে যাত্রা শুরু করল থিংভেলিরের উদ্দেশ্যে। পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল প্লিনি।
পথে ওফাস নদী পড়ল। নদীর পাড়ে আছে একটা কাঠ বাঁধা ভেলার মত। বেশ বড়। নদীটি খুবই শান্ত। খুব বেশী বড়ও নয়। নদীর এপারে ওপারে এখানে ওখানে বরফ জমে আছে। দুটো ঘোড়া নিয়ে ফ্রান্সিস আর বিস্কো কাঠের ভেলাটায় উঠল। লম্বা কাঠের লগি বিস্কো ঠেলতে লাগল। আস্তে আস্তে নদী পার হয়ে ঘোড়া দুটো নিয়ে ওরা ওপারে নামল। কাঠের ভেলাটার সঙ্গে একটা লম্বা দড়ি বাঁধা ছিল। দড়ির মুখটা এপারে একটা ছোট গাছের সঙ্গে বাঁধা। প্লিনি এবার সেই দড়িটা ধরে টানতে লাগল। শূন্য ভেলাটা এপারে এল। এবার শাঙ্কো আর বিস্কো একইভাবে দুটো ঘোড়া নিয়ে নদী পার হল। এবার একটা পাতাঝরা বড় গাছের নিচে বসল ওরা। সঙ্গে আনা খাবার খেল। একটুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার ঘোড়ার পিঠে চড়ে যাত্রা শুরু।
কুয়াশা কোথাও ঘন কোথাও পাতলা। মাথার ওপর সাদা ধোঁয়াটে আকাশ। তারা ঢাকা পড়ে গেছে। স্নান আলো চারদিকে। সেই আলোয় পথ দেখে ওরা ঘোড়া ছোটাল।
পথে আর একবার বিশ্রাম নিল ওরা। খাওয়া দাওয়া করল। তারপর আবার ঘোড়া ছোটাল।
ঘণ্টা দশ-বারো কাটল। তারপর ওরা থিংভেলির নগরের দেয়ালের কাছে পৌঁছল। ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়াগুলোর লাগাম একটা গাছের গায়ে বেঁধে দিয়ে পায়ে হেঁটে নগরে প্রবেশ করল। দেখল কোন বাড়িতে আলো জ্বলছে না। তার মানে সবাই ঘুমুচ্ছে। পথে এখানে ওখানে পাথরের দেয়ালে জ্বলন্ত মশাল। এ পথ সে পথ ঘুরে দেয়ালের আড়ালে প্লিনি ওদের রাজবাড়ির পেছনে নিয়ে এল। এখানেই দেয়ালের গায়ে আছে সেই গোপন দরজাটা। চৌকোনো পাথরটা খুলল প্লিনি। খোঁদলে হাত বাড়িয়ে দেখল সেই কাঠের চাকাটা আছে। ও চাকাটা আস্তে আস্তে ঘোরাতে লাগল। অস্পষ্ট গোঁ গোঁ শব্দ তুলে কাঠের দরজাটা খুলে গেল। তার মানে ভাঙা চাকাটা মেরামৎ করা হয়েছে। ফ্রান্সিস কোমর থেকে বোয়াল খুলে খুব সন্তর্পণে পা ফেলে দরজা পেরিয়ে ঢুকল। দেখল এখানে ওখানে মশাল জ্বলছে বটে কিন্তু কোন প্রাসাদরক্ষী নেই কোথাও। ফ্রান্সিস মনে মনে হাসল। রাজা গুমন্ড এখন সোনার ঘণ্টার স্বপ্নে বিভোর এখন নিশ্চিন্তও। কাজেই আগের বারের মত প্রসাদরক্ষীর সংখ্যা বাড়ায় নি। তাছাড়া তাকে রেভকজাভিকে রাখতে হয়েছে। ফ্রান্সিস দরজা দিয়ে বাইরে এল। প্লিনি বলল।
-কী দেখলেন?
–একজন রক্ষীও চোখে পড়ল না। ফ্রান্সিস বলল?
–তাহলে চলো ঢুকে পড়ি। বিস্কো বলল।
–না এখন না। ফ্রান্সিস বলল। তারপর প্লিনির দিকে তাকিয়ে বলল–সৈন্যদের আস্তানা কোথায়।
প্লিনি আঙুল তুলে একটু দূরে উত্তর দিকে বেশ কয়েকটা টানা লম্বা পাথরের ঘর দেখাল। ঘরগুলোর ছাউনি এদেশীয় রীতি অনুযায়ী মোটা শুকনো ঘাসের।
ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে সবাইকে আসতে বলল। রাস্তা পেরিয়ে সবাই একটা দেয়ালের কাছে এল। দেয়ালের পাথরের খাঁজে দুটো মশাল আড়াআড়ি বসানো ছিল। দুটো জ্বলন্ত মশালই ফ্রান্সিস খাঁজ থেকে তুলে নিল। এবার একটা মশাল পাথরে ঘা মেরে নিভিয়ে ফেলল। অন্য জ্বলন্ত মশালটা হাতে নিয়ে উবু হয়ে বসল। মশালটা বিস্কোর হাতে দিল। তারপর নেভানো মশালটার মাথার দিক থেকে জড়ানো কাপড়ের লম্বা ফালি খুলতে লাগল। বেশ গরম। আস্তে আস্তে চারটে ফালি খুলে নিল। উঠে দাঁড়িয়ে শাঙ্কোকে বলল–শাঙ্কো, এগুলোর চারটে তীরের ফলায় জড়াও। শাঙ্কো এবার ব্যাপারটা বুঝতে পারল। ও দ্রুত হাতে চারটে তীরের ফলায় কাপরের ফালি জড়িয়ে ফেলল। ফ্রান্সিস বলল–তীরগুলোতে জ্বলন্ত মশাল থেকে আগুন ধরাও। তারপর সৈন্যদের ছাউনির ওপর ছুঁড়ে দাও। শাঙ্কো একটা তীরের ফলার কাপড়ে জ্বলন্ত মশাল থেকে আগুন ধরাল। তারপর নিশানা ঠিক করে ছুঁড়ল। কুয়াশার মধ্যে তীরটা উড়ে গিয়ে পড়ল। শুকনো মোটা ঘাসের ছাউনিতে সঙ্গে সঙ্গে আগুন লেগে গেল। তারপর শাকো পরপর তিনটে জ্বলন্ত তীর ছুঁড়ল। সৈন্যদের সব ছাউনিতেই আগুন লেগে গেল। কিছু সৈন্য বোধহয় জেগেছিল। তারা আগুন আগুন বলে চিৎকার চাঁচামেচি শুরু করল।
