প্লিনি জাহাজে উঠে ফ্রান্সিসের সঙ্গে দেখা করল। সব কথা বলল। পাশে হ্যারিও ছিল। সব শুনে ফ্রান্সিস বলল বুঝলে হ্যারি আমি এই আশঙ্কাই করছিলাম। রাজা গুমন্ড দাঁও মারার এই সুযোগ সহজে ছেড়ে দেবে না। মারিয়ার মুক্তির বিনিময় ও অনেক কিছু চাইবে।
–তাহলে এখন কী করবে? হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস শ্বাস ছেড়ে হতাশার ভঙ্গীতে দুহাত ছড়িয়ে বলল–কিচ্ছু করার নেই। এখন শুধু অপেক্ষা করে থাকা।
প্লিনি বলল–রাজা গুমন্ডের কাছে আমাদের রাজার দূত হয়ে এর আগেও আমি গেছি। কথা বলে দেখেছি–অত্যন্ত ধুরন্ধর লোক। সব সময় প্যাঁচ কষছে কী করে আমাদের রাজাকে বিপদে ফেলা যায়।
–প্লিনি–ফ্রান্সিস বলল–যা বুঝতে পারছি গুমন্ডের বিরুদ্ধে রাজা ইনগলফকে কিছুতেই যুদ্ধে নামাতে পারবো না। কাজেই শেষ পর্যন্ত আবার আমাদের অভিযানে বেরোতে হবে। মারিয়াকে মুক্ত করতে হবে। তুমি তৈরী থেকো।
–নিশ্চয়ই। প্লিনি বলল। তারপর প্লিনি চলে গেল। দিনের হিসেবে কয়েকদিন পরেই প্লিনি সংবাদ নিয়ে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। রাজা গুমন্ড তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে রেভকজাভিকের দখল নিয়েছে। তারপর সমস্ত ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি হানা দিতে সৈন্যদের ঢালাও হুকুম দিয়েছে। সৈন্যরা অবাধে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাড়ি হানা দিয়ে স্বর্ণমুদ্রা, দামী পাথর, গয়নাগাঁটি লুঠ করছে। কেউ বাধা দিতে এলে বা প্রতিবাদ করলে নির্দ্বিধায় হত্যা করছে। সাধারণ মানুষদের ওপরও সৈন্যরা নির্বিবাদে অত্যাচার উৎপীড়ন চালাচ্ছে। ফ্রান্সিস একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল–আমি জানতাম এটাই হবে। এখানেই শেষ নয়। গুমন্ড আরো স্বর্ণমুদ্রা দাবী করবে। কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই।
সত্যিই তাই ঘটল। রাজা গুমন্ডের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে দুজন দ্রুত এল রাজা ইনগলফের কাছে। রাজা গুমন্ড লিখেছে–আপনি রাজকোষ স্কালহল্টে নিয়ে গেছেন। ঐ রাজকোষ প্রেরিত দূতদের দিয়ে এখানে পাঠিয়ে দেবেন। রাজকোষ পেলেই রাজকুমারী মারিয়ার মুক্তি কথা বিবেচনা করা হবে।
রাজা ইনগলফ দূত দুজনকে বসিয়ে রেখে ছোটভাই রাজা হজরলিফ এর সঙ্গে কথা বলতে অন্দরমহল এলেন। সব শুনে রাজা হজরলিফ বললেন–রাজকুমারী মারিয়ার মুক্তির জন্য রাজকোষ এখন দিয়ে দাও।
রাজকুমারী মক্তি পাক তারপর দুজন মিলে সমস্ত সৈন্যবাহিনী নিয়ে সিংভেলির আক্রমণ করবো।
–না-না-রক্তক্ষয় আমি চাই না। রাজা ইনগলফ বললেন?
–ঠিক আছে–সে সব পরে ভাবা যাবে। তুমি এখন রাজকোষ দিয়ে দাও।
–বেশ। রাজা ইনগলফ তার দেহরক্ষীদের আদেশ দিলেন। দেহরক্ষীরা ধরাধরি করে সেই লম্বাটে কালো ফুল লতাপাতার কাজ করা সিন্দুকটা অন্দরমহল থেকে নিয়ে এল। রাজা হজরলিফের একটা মাথাখোলা গাড়িতে তুলে দিল। রাজা গুমন্ডর দূত দুজনের একজন গাড়িতে বসে রইল। অন্যজন গাড়ি চালাল রেভকজাভিকের উদ্দেশ্যে।
ফ্রান্সিসরা প্লিনির কাছ থেকে এই সংবাদ পেল। ফ্রান্সিস পাশে বসা হ্যারির মুখের দিকে একবার তাকাল। কিন্তু কোন কথা বলল না। ভাইকিং বন্ধুরাও শুনল এই সংবাদ। তারা এসে ফ্রান্সিসকে বারবার বলতে লাগল–ফ্রান্সিস যুদ্ধ ছাড়া রাজকুমারী মারিয়াকে মুক্ত করা যাবে না। তুমি রাজা ইনগলফকে বল–আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। বলল উপায় নেই। আমাদের হাত পা বাঁধা। মারিয়ার বাঁচামরা এখন রাজা গুমন্ডের হাতের মুঠোয়। আমরা নিরুপায়। হ্যারিও ভাইকিং বন্ধুদের একই কথা বুঝিয়ে বলল। বন্ধুরা রাগে ফুঁসে উঠল। কিন্তু নিজেদের অসহায়তার কথা ভেবে চুপ করে রইল।
আইসল্যান্ডে তো এখন শুধুই রাত। দিন বলে কিছু নেই। কাজেই দিন রাতের মোট হিসেবে কয়েকদিন পরেই প্লিনি এসে খবর দিল–রাজা গুমন্ড রেভজাভিক লুঠকরা ধনসম্পদ আর রাজকোষ নিয়ে থিংভেলিরে ফিরে গেছে। রেভকজাভিক রাজ এখন তার সেনাপতির অধীনে। তার হুকুমে রেভকজাভিকে অত্যাচার নিপীড়ন চলছে।
দিনকয়েক পরে থিংভেলির থেকে রাজা গুমন্ডের একজন দূত এল। সঙ্গে রাজা ইনগলফকে লেখা গুমন্ডের চিঠি। চিঠিতে গুমন্ড লিখেছে–আপনার রাজকোষ পেয়েছি। এবার আপনার বন্ধু ভাইকিংদের রাজাকে বলুন যেন উনি সোনার ঘণ্টা তার যাদুঘর থেকে বের করে আমাকে দিয়ে দেন। কারণ সোনার ঘণ্টা আমারই প্রাপ্য। তাহলেই তার মেয়ে মুক্তি পাবে। নইলে মুক্তির কোন আশা নেই।
রাজা ইনগলফ সমস্যায় পড়লেন। ব্যাপারটা এতদূর গড়াবে তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। অন্দরমহলে এলেন। ছোটভাই রাজ হজরলিফকে সব জানিয়ে বললেন এখন কী করবেন তিনি। দুজনেই সমস্যাটা নিয়ে ভাবলেন। কথা বললেন। তারপর রাজা হজরলিফ বললেন–দাদা তুমি চিঠি দাও। লেখ যে ভাইকিংদের রাজাকে সব জানিয়ে চিঠি দিচ্ছি। রাজা ইনগলফ দূতের হাত দিয়ে একটা চিঠি পাঠালেন। লিখলেন–আপনার দাবী জানলাম। আমি সবকিছু জানিয়ে একটা চিঠি দূত মারফৎ ভাইকিংদের রাজাকে জানাচ্ছি। মনে হয় মেয়ের মুক্তিপণের এই দাবী তিনি মেনে নেবেন। এজন্যে কিছু সময় যাবে। এরমধ্যে রাজকুমারীর যেন কোন ক্ষতি না হয়। দূত চিঠি নিয়ে চলে গেল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজে এসে প্লিনি সব সংবাদ ফ্রান্সিসকে জানাল। ফ্রান্সিস বিছানায় বসে ছিল। সব শুনে হ্যারিকে ডেকে বলল–চলো রাজা ইনগলফের সাক্ষাৎ প্রার্থনা করব। একটু পরেই রক্ষী ওদের মন্ত্রণাকক্ষে নিয়ে এল। গদীআঁটা চেয়ারে ওরা বসল। একটু পরেই রাজা ইনগলফ কক্ষে ঢুকলেন। তিনজনেই উঠে দাঁড়িয়ে রাজাকে সম্মান জানাল। রাজা ইনগলফ হাতের ইংগিতে ওদের বসতে বললেন। বসল ওরা। রাজা চেয়ারে বসলে ফ্রান্সিস বলল–প্লিনির মুখে আমরা সব শুনলাম।
