-ওটা আমরা অস্ত্রঘরে রেখেছি। দুজন করে ভাইকিং সারাক্ষণ ঐ ঘর পাহারা দেয়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ফ্রান্সিস বলল-দরজায় দুজন পাহারাদার রয়েছে। আপনাদের যখন যা প্রয়োজন চাইবেন। তখনই রানী মৃদুস্বরে বললেন–মারিয়া থাকলে কত খুশী হত। কথাটা শুনেও ফ্রান্সিসও দুঃখ পেল। বন্দিনী মারিয়ার কথা তখনই মনে পড়ল। ও বলল–মহা মাননীয়া আপনি যে মারিয়াকে সত্যি ভালোবাসেন এটা আপনার কথা থেকেই প্রমাণিত হল। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। কথাটা বলে ফ্রান্সিস মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে চলে এল।
জাহাজ চলেছে। রাজা ও রানী নিজেদের কেবিন ঘর থেকে বড় একটা বেরোন না। সারাক্ষণ কেবিন ঘরেই থাকেন। দুজনেরই মন খারাপ! মারিয়া এখনও মুক্তি পেল না। রাজা ইনগলফ ভাবেন মারিয়ার যদি কোন বিপদ হয় তাহলে ভাইকিংদের রাজার কাছে কী জবাবদিহি করবেন? রাজা গুমন্ডের সঙ্গে লড়াইয়ে নামবো? এই চিন্তাটাও রাজা ইনগলফের মাথায় মাঝে মাঝে আসে। কিন্তু তিনি রক্তক্ষয় চান না। এর আগে রাজা গুমন্ড দুদুবার তাঁর রাজ্য আক্রমণ করেছিল বলেই তিনিই যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। দুবারই রাজা গুমন্ড হেরে গেছে। এবার তাই তাকে বিপদে ফেলতে মারিয়াকে অপহরণ করেছে। রাজা গুমণ্ড ভালো করেই জানে এবার রাজা ইনগলফকে চাপ দিয়ে সে শুধু তার রাজত্বই পাবে না আরো কিছু সুবিধেও আদায় করে নেবে। কিন্তু রাজা ইনগলফ এ অবস্থায় একেবারে অসহায়। কিছুই করার নেই তাঁর। তাই রাজা রানী দুজনেই চিন্তিত। তাদের মনে আনন্দ নেই।
এদিকে রাজপুত্র খুব খুশী। সারাক্ষণ জাহাজের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়ায়। ছটোছুটি করে আর মাঝে মাঝেই ফ্রান্সিসের কেবিন ঘরে-ঢুকে গল্প শোনবার বায়না ধরে। ফ্রান্সিসের মন চিন্তাকুল। তবু রাজপুত্র এলেও খুশীই হয়। ওকে সোনার ঘণ্টা, হীরের পাহাড়ের গল্প বলে। রাজপুত্র গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে সেসব গল্প শোনে। গল্প বলতে বলতে ফ্রান্সিসের মনে পড়ে যায় মার কথা, মারিয়ার কথা। মাও অবাক চোখে শুনতেন এইসব গল্প।–বলতেন–হ্যারে তুই এতসব কান্ড করেছিস-এ্যাঁ! ফ্রান্সিস হাসতো। বলতো–তোমার ছেলে কি ঘরে বসে দুধ পনীর খাওয়ার ছেলে? মা বলতেন–আমার দরকার নেই অত দুঃসাহসী ছেলে। বাড়িতে আমার চোখের সামনে থাক তুই আমার, তাতেই সুখ, তাতেই আনন্দ। মারিয়াও কী গভীর মনোযোগর সঙ্গে ওর মুখে গল্প শুনতো! তাই গল্প বলতে বলতে ওর মনটা উদাস হয়ে যায়। গল্প বলা থামিয়ে ও মার কথা মারিয়ার কথা ভাবে। রাজকুমার তাগাদা দেয়–তারপর কী হল বলল না। ফ্রান্সিস আবার গল্প বলতে শুরু করে।
দিনের হিসেবে দুদিন পর সাদাটে ধোঁয়া কুয়াশার মধ্যে স্কালহল্ট বন্দরের অস্পষ্ট আলো দেখা গেল। আস্তে আস্তে জাহাজ এসে বন্দরে ভিড়ল। জাহাজ থেকে ঘাটের গায়ে তক্তা ফেলা হল। দেখা গেল দুটো গাড়ি বন্দরে দাঁড়িয়ে আছে। রাজা ইনগলফের সেনাপতি দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। বোঝা গেল সে সৈন্যবাহিনী নিয়ে আগেই পৌঁছে গেছে। একটা মাথা ভোলা গাড়ি থেকে রাজা হজরলিফ ও রানী নেমে এলেন। ও দিকে রাজা ইনগলফ ও রানী রাজপুত্রকে সঙ্গে নিয়ে জাহাজঘাটায় নামলেন। রাজা হজরলিপ তো রাজা ইনগলফের ছোট ভাই। পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন। ভাইকিংরা ধরাধরি করে রাজা ইনগলফের রাজকোষ সেই লম্বা সিন্দুকটা অন্য গাড়িটায় তুলে দিল। রাজা রানীরা ও রাজপুত্র সামনের গাড়িটায় চড়ল। গাড়োয়ান চাবুকের শব্দ করে প্রথম গাড়িটা ছেড়ে দিল। পরের গাড়িটিও ওটার পেছনে পেছনে চলল। সেই গাড়িতে বসল রাজা ইনগলফের সেনাপতি। রাজা হজরলিফের দুই সৈন্য ঘোড়ায় চড়ে পেছনে পেছনে চলল।
রাজবাড়ির সদর দেউড়িতে পৌঁছল গাড়ি। দ্বাররক্ষীরা বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছিল। রাজাদের গাড়ি আসতেই ওরা মাথা নুইয়ে শ্রদ্ধা জানাল। গাড়ি রাজবাড়িতে ঢুকল। রাজা হজরলিফের বাড়ি তেমন বড় না। তবে মোটামুটি সাজানো গোছানো।
রাজবাড়ির অন্তঃপুরে প্রবেশ করলেন সবাই। রাজা ইনগলফ একটু বিশ্রাম নিলেন। তারপর মোমবাতির আলোর সামনে বসে মোটা পার্চমেনট কাগজে রাজা গুমন্ডকে চিঠি লিখতে বসলেন। লিখলেন–আমি প্রতিশ্রুতিমত সৈন্যবাহিনী নিয়ে স্কালহল্টে চলে এসেছি। এবার আপনার প্রতিশ্রুতিমত রাজকুমারী মারিয়াকে মুক্তি দিয়ে প্রেরিত দূরে সঙ্গে এখানে পাঠিয়ে দিন। রাজা ইনগল তার সেনাপতিকে ডেকে পাঠালেন। চিঠি থিংভেলিরে পৌঁছে দিতে বললেন। সেনাপতি চিঠি এনে প্লিনিকে খবর দিল। প্লিনি এলে তাকেই চিঠি পৌঁছে দেবার দায়িত্ব নিল। প্লিনি তখনই ঘোড়ায় চড়ে রওনা হল থিংবেলিরের উদ্দেশ্য।
দিনের হিসেবে পরদিন প্লিনি ঘোড়ায় চড়ে ফিরে এল। কিন্তু সঙ্গে মারিয়া নেই। প্লিনি রাজবাড়িতে ঢুকল। রাজা ইনগলফকে একজন রক্ষী খবর দিতে গেল। রাজা ইনগলফ বেশ ব্যস্ত হয়ে বাইরের ছোট ঘরটায় ঢুকলেন। প্লিনি মাথা একটু নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল–রাজা গুমন্ড কোন চিঠি দেন নি। আপনাকে জানাতে বলেছেন যে তিনি প্রথমে রেভকজাভিক যাবেন। নতুন রাজ্যের অধিকার বুঝে নেবেন। তারপর আপনাকে চিঠি দেবেন। ততদিন মারিয়াকে বন্দিনী থাকতে হবে। রাজা ইনগলফ মাথা নিচু করে একটুক্ষণ ভাবলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন–ঠিক আছে তুমি যাও। ফ্রান্সিসকে সংবাদটা দিয়ে যেও।
