–কিছু হদিস পেলে?
–ঠিক বলতে পারছি না, তবে ভূমধ্যসাগরের একটা জায়গায় নাবিকটা ওকে ইঙ্গিতে থামিয়ে দিয়ে ম্লান হাসল কুয়াশা, ঝড় আর ডুবো পাহাড়–তাই কি না?
ফ্রান্সিস আশ্চর্য হয়ে গেল। বলল–তাহলে আপনি, —
–হ্যাঁ, ভাই–আমাদের জাহাজ প্রায় ডুবে যাচ্ছিল। তবে আমরা বহু কষ্টে পেছনে। হটে আসতে পেরেছিলাম। তাই জাহাজ ডুবির হাত থেকে বেঁচেছিলাম।
নাবিকটা একটু চুপ করে থেকে বলল–একটা কথা বলি শোন–চারদিকে দেখে নিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল–তুমি বোধহয় গল্পের শেষটুক জান না।
–জানি বৈকি, ডাকাত পাদরিরা সবাই জাহাজডুবি হয়ে মরে গেল।
–না। নাবিকটি মাথা নাড়ল–একজন বেঁচেছিল। সে পরে নিজের জীবন বিপন্ন করে সোনার ঘন্টার দ্বীপে যাওয়ার একটা পথ আবিষ্কার করেছিল। আসার অন্য একটা পথও আবিষ্কার করেছিল।
–কেন, যাওয়া-আসার একটা পথ হতে বাধা কি?
–নিশ্চয়ই কোন বাধা ছিল। যাকগে যাওয়া আসার দুটো সমুদ্র পথের নকশা সে দুটো মোহরে খুঁদে রেখেছিল। সব সময় নাকি গলায় ঝুলিয়ে রাখত সেই মোহর দুটো, পাছে চুরি হয়ে যায়। হয়তো ডাকাত পাদরিটার ইচ্ছে ছিল দেশে ফিরে জাহাজ, লোকলস্কর নিয়ে যাবে। সোনার ঘন্টা থেকে সোনা কেটে-কেটে আনবে, কিন্তু–ডাকাত পাদরিটা মারা গেল।
তাই নাকি?
–হ্যাঁ, মরু-দস্যুদের হাতে সে প্রাণ হারাল।
ফ্রান্সিস চমকে উঠল। ফজল তো ঠিক এমনি একটা ঘটনাই ওকে বলেছিল। ফ্রান্সিস আগ্রহের সঙ্গে প্রশ্ন করল–আর সেই মোহর দুটো?
–মরু-দস্যুরা লুঠ করে নিয়েছিল। তারপর সেই মোহর দুটোর হদিস কেউ জানে না।
–আচ্ছা, মরু-দস্যুরা কি জানত, মোহর দুটোয় নকশা আঁকা আছে?
–ওরা তো অশিক্ষিত বর্বর, নকশা বোঝার ক্ষমতা ওদের কোথায়।
এমন সময় কয়েকজন নাবিক কথা বলতে বলতে ওদের দিকে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস আর কোন প্রশ্ন করল না। তার কেবল মনে পড়তে লাগল সেই মোহর দুটোর কথা। আবছা একটা মাথায় ছাপ ছিল, আর কয়েকটা রেখার আঁকিবুকি।
ঘুম আসতে চায় না ফ্রান্সিসের। নিজের কপাল চাপড়াতে ইচ্ছে করছে!ইস-মোহর দুটো একবার ভালো করে দেখেও নি সে। এইবার মকবুলের মোহর চুরির রহস্য ফ্রান্সিসের কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। মকবুল নিশ্চয়ই জানত মোহর দুটোর কথা। তাই ও সাঙ্গ গায়ে পড়ে আলাপ জমিয়ে ওকে এতিমখানায় নিয়ে গিয়েছিল। ফ্রান্সিসের মোহরটা চুরি করেছিল। কিন্তু আর একটা মোহর? সেটা হাতে না পেলে তো মকবুল পুরো পথের নকশা পাবে না। হঠাৎ ফ্রান্সিসের মনে পড়ল একটা ঘটনা। আশ্চর্য! সেদিন ঐ ঘটনার গুরুত্ব সে বুঝতে পারেনি। একদিন সকালে বাজারে যাওয়ার পথে দেখেছিল সেই জহুরির দোকানটার কাছে বহুলোকের ভিড়। দোকানটা কারা যেন ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আশেপাশের দোকানগুলোর কোন ক্ষতি হয়নি, অথচ ঐ দোকানটা ভেঙেচুরে একশেষ। ফ্রান্সিস শুনল–গত রাত্রে দোকানটায় ডাকাত পড়েছিল। আজকে ঐ ডাকাতির অর্থ পরিষ্কার হল। আসলে মকবুল তার সঙ্গীদের নিয়ে সেই দোকানটায় হানা দিয়েছিল। লক্ষ্য সেই মোহরটা চুরি করা। তাহলে মকবুলও সোনার ঘন্টার ধান্ধায় ঘুরছে। আশ্চর্য!
পাঁচদিন পরে জাহাজটা ভাইকিংদের দেশের রাজধানীতে এসে পৌঁছাল। ফ্রান্সিসের যেন তর সয় না। কতক্ষণে শহর-বন্দরে ভিড়বে। জাহাজটা ধীরে ধীরে এসে জেটিতে লাগল। জেটির গেট খুলে দিতেই ফ্রান্সিস এক ছুটে রাস্তায় এসে দাঁড়াল।
তখন সকাল হয়েছে। কুয়াশায় ঢেকে আছে শহরের বাড়িঘর, রাস্তাঘাট।
একটা ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করল ফ্রান্সিস। টস্টন্টস্ট’ ঘোড়ার গাড়ি চলল পাথর বাঁধানো পথে শব্দ তুলে। ফ্রান্সিসের আবাল্য পরিচিত শহর। খুশিতে ফ্রান্সিস কি করবে বুঝে উঠতে পারল না। একবার এই জানালা দিয়ে তাকায়, আর একবার ঐ জানালা দিয়ে। কতদিন পরে দেশের লোকজন, পথঘাট দেখতে পেল! এক সময় বাড়ির সামনে এসে পড়ল।
বাড়ির গেট-এর লতাগাছটা দুদিকের দেয়ালে বেয়ে অনেকক্টা ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস ওটাকে চারাগাছ দেখে গিয়েছিল। কত অজস্র ফুল ফুটেছে গাছটায়। গেট ঠেলে ঢুকল ফ্রান্সিস। প্রথমেই দেখল মা’কে। বাগানে ফুলগাছের তদারকি করছে। ফ্রান্সিস শব্দ না করে আস্তে আস্তে মা’র পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। সেই ছোটবেলা সে মাকে এমনি করেই চমকে দিত। ওদের বুড়ো মালিটা হঠাৎ মুখ তুলে ফ্রান্সিসকে দেখেই প্রথমে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তারপর ফোকলামুখে একগাল হাসল। মা ওকে হাসতে দেখে ধমক লাগাল। তবু হাসছে দেখে মা পেছন ফিরে তাকাল। বয়সের রেখা পড়েছে মার মুখে। বড়শীর্ণ আর ক্লান্ত দেখাচ্ছে মাকে। ফ্রান্সিস আর চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। মার কান্না আর থামে না। ফ্রান্সিসের মাথায় হাত বুলোয় আর বিড়বিড় করে বলে পাগল, বদ্ধ পাগল ই-আমার কথা একবারও মনে হয় না তোর? হ্যাঁ পাগল কোথাকার—
ফ্রান্সিসের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সে বহুকষ্টে নিজেকে সংযত করল। ওর চোখে জল দেখলে মাও অস্থির হয়ে পড়বে।
বাবা বাড়ি নেই। রাজপ্রাসাদে গেছেন সেই ভোরবেলা। কি সব জরুরী পরামর্শ আছে রাজার সঙ্গে। যাক–বাঁচা গেল। এখন খেয়ে-দেয়ে নিশ্চিন্তে একটা ঘুম দেবে।
কিন্তু ফ্রান্সিসের কপালে নিশ্চিন্ত ঘুম নেই। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মা’র কণ্ঠস্বর শুনল–বেচারা ঘুমুচ্ছে–এখন আর তুলে–
