-এবার তোমরা বলো এখন কী করবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল একজন ভাইকিং বন্ধু বলে উঠল–তুমি যা বলবে আমরা তাই করবো। সবাই প্রায় একসঙ্গে কথাটা সমর্থন করল।
–তাহলে বলছি–আমরা জাহাজ নিয়ে স্কালহন্টে গিয়ে থাকবো। রাজাকেও আমাদের জাহাজে আসতে অনুরোধ জানাবো। তিনি আমাদের সঙ্গী হলে ভালোই। তারপর রাজা গুমন্ড কী করে সেটা দেখবো। তারপর প্রয়োজনে লড়াইয়ে নামবো। ফ্রান্সিস বলল। সভা ভেঙে গেল। ভাইকিংরা কথা বলতে বলতে নিজেদের কেবিনে চলে গেল। ফ্রান্সিস আর হ্যারিও নিজেদের কেবিনে চলে এল। ফ্রান্সিস বিছানায় আধশোয়া হয়ে ভাবতে লাগল–এবার কী করবে? বন্ধুদের মতামত জানা গেল। এবার রাজা ইনগলফের সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে।
দিনের হিসেবে পরদিন ফ্রান্সিস রাজা ইনগলফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেল। সঙ্গে হ্যারিকে নিয়ে গেল। ওরা যখন রাজবাড়ি কাছে গেল দেখল দক্ষিণে সৈন্যদের ছাউনি থেকে সৈন্যরা বেরিয়ে আসছে। রাজবাড়ির ওপাশের প্রান্তরে সৈন্যরা জড়ো হচ্ছে। এরা পদাতিক সৈন্য। রাজবাড়ির সামনের বিরাট চত্বরে জড়ো হচ্ছে অশ্বারোহী সৈন্যরা। চারিদিকে সাজ সাজ রব। সবাই ব্যস্ত। বোঝাই যাচ্ছে রাজার আদেশে সৈন্যরা স্কালহল্টে যাবার জন্যে তৈরী হচ্ছে।
দ্বাররক্ষীকে দিয়ে রাজাকে সংবাদ পাঠিয়ে ওরা দুজনে মন্ত্রণাকক্ষে ঢুকল। পাথরের টেবিলের চারপাশে রাখা বাঁকানো পায়াঅলা ওককাঠের চেয়ারে বসল। তখনই সেনাপতি কক্ষে ঢুকল। সেনাপতিও বসল। একটু পরে রাজা ইনগলফ কক্ষে প্রবেশ করলেন। সকলে উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল।
রাজা তার নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলেন। রাজার মুখ দেখেই ফ্রান্সিস বুঝল রাজা খুবই চিন্তান্বিত। নিজের রাজত্ব ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। চিরশত্রু গুমন্ড তার প্রতিশ্রুতি রাখবে কিনা, মারিয়াকে মুক্তি দেবে কি না, এসব চিন্তা তো রাজার হবেই।
প্রথমে রাজা সেনাপতিকে জিজ্ঞেস করলেন–
–আপনার সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে?
–সৈন্যদলের জমায়েত এতক্ষণে হয়ে গেছে। এবার আপনার অনুমতি। সেনাপতি বলল।
–আপনি সৈন্যবাহিনী নিয়ে স্কালহন্টের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করুন। পথে কোথাও যদি রাজা গুমন্ডের সৈন্যদের মুখোমুখি পড়ে যান–সংযত থাকবেন। অযথা সংঘর্ষ ও রক্তপাত আমি পছন্দ করি না এটা আপনি জানেন। সেনাপতি উঠে দাঁড়াল। মাথা নীচু করে সম্মান জানিয়ে বলল–জানি মহামান্য রাজা। সেনাপতি চলে গেল।
এবার ফ্রান্সিস বলল-মহামান্য রাজা–আপনি কখন যাবেন?
–ঘণ্টা কয়েক পরেই। রাজা বললেন?
–যদি কিছু না মনে করেন তাহলে একটা অনুরোধ জানাই?
–বলো।
–আমরা তো আমাদের জাহাজ চালিয়ে স্কালহল্টে যাচ্ছিই। যদি আপনারা আমাদের জাহাজে চড়ে যান তাহলে আমরা নিজেদের ভাগ্যমান মনে করবো। রাজা ইনগল কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে ভাবলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন–হ্যাঁ তা যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তোমাদের কোন অসুবিধা হবে নাতো।
তাহলে শোন–আমি ঘণ্টা পাঁচেকের মধ্যে তোমাদের জাহাজে যাবো।
ফ্রান্সিস ও হ্যারি উঠে দাঁড়াল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে ফ্রান্সিস বলল–আমরা এক্ষুনি সব ব্যবস্থা করছি।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি জাহাজে ফিরে এল। সবাইকে ফ্রান্সিস বলল–ভাইসব–রাজা ইনগলফ আমাদের জাহাজে চড়ে স্কালহল্টে যেতে সম্মত হয়েছেন। সকলেই খুব খুশী হল। এবার হ্যারি বলল–রাজপরিবারের বসবাসের উপযোগী কর। সব ভাইকিং হৈ হৈ করে কাজে লেগে পড়ল।
ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে জাহাজের চেহারা ফিরে গেল। জাহাজের ডেক, সিঁড়ি, মাস্তুল কেবিনঘর সব ঝকঝক করতে লাগল। এমনিতেই জাহাজটা ছিল নতুন আর খুব ভালো। কাজেই ভাইকিংদের খুব খাটতে হল না।
রাজপরিবারে থাকার জন্যে কেবিন ঘরটাও খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হল। মোটা মোটা কম্বলের বিছানা, পরিষ্কার বিছানার ঢাকনা, পরিচ্ছন্ন বালিশ সব ব্যবস্থা করা হল। এবার রাজপরিবারের আসার জন্যে প্রতীক্ষা।
ঠিক সময়মতই রাজার মাথা খোলা গাড়ি এল। সেই কালো রঙের গাড়ির গা চকচক করছে। তাতে সোনালি ফুল লতাপাতার কাজ। রাজা রানী ও সাত আট বছর বয়েসের রাজকুমার। রাজারানী ও রাজকুমারের পরনে খুব একটা জমকালো পোশাক নয়। রাজার গাড়ির পেছনে আর একটা সাধারণ গাড়িও এল। দেখা গেল সেটাতে একটা কাঠের লম্বামত শক্ত সিন্দুক। বোঝা গেল–ওটা রাজকোষ। স্বর্ণমুদ্রা হীরে মণিমাণিক্য আছে ওটাতে। আরো দুটো বাক্স। জামাকাপড় আর প্রয়োজনীয় জিনিস ওদুটোতে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি বেশ ভালো পোশাক পরে জাহাজঘাটে দাঁড়িয়েছিল। রাজার গাড়ি এসে থামতেই ফ্রান্সিস আর হ্যারি এগিয়ে গেল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। রাজা, রানী রাজপুত্র গাড়ি থেকে নেমে এলেন। তারপর পাতা কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে জাহাজে উঠলেন। বিস্কো তাদের পথ দেখিয়ে নির্দিষ্ট কেবিন ঘরে পৌঁছে দিল। জাহাজ দেখে কেবিন ঘর দেখে রাজপুত্র খুব খুশী। সে সারা জাহাজে ছুটোছুটি করতে লাগল। রাজা ও রানী কেবিনঘরে ঢুকে চুপ করে বসে রইলেন। দুজনের কারোর মন ভালো নেই।
ফ্রান্সিস সেই কেবিন ঘরে ঢুকল। বলল–মহামান্য রাজা–আপনাদের কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো? রাজা মৃদু হেসে বললেন না। তারপর বললেন–ফ্রান্সিস আমার রাজকোষ একটা সিন্দুকে রাখা আছে। ঐ সিন্দুকটা একটা নিরাপদ জায়গায় রেখো।
