রাজা ঘুমিয়ে আছেন। দ্বাররক্ষী বলল।
ঘুম ভাঙাও। খবর দাও যে ফ্রান্সিস থিংভেলির থেকে ফিরে এসেছে। দ্বাররক্ষী আর কোন কথা বলল না। দ্রতপায়ে রাজবাড়িতে ঢুকে পড়ল।
ফ্রান্সিস রাজবাড়ির চত্বর আস্তে আস্তে হেঁটে পেরিয়ে এল। রাজবাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াল। ভীষণ ক্লান্ত লাগছে নিজেকে। এতদূর ঘোড়া ছুটিয়ে এসেছে। পেটপুরে খেতেও পারেনি। একটু পরেই সেই দ্বাররক্ষী ছুটে এল। বলল–রাজা আপনাকে ডাকছেন। ফ্রান্সিস দ্বাররক্ষীর পেছনে পেছনে রাজবাড়ির অভ্যন্তরে ঢুকল। কয়েকটা ঘর পার হয়ে রাজার শয়নকক্ষে ঢুকল। দ্বাররক্ষী শয়নকক্ষে ঢুকল না। ফ্রান্সিস কঁচকা আলোতে দেখল রাজা ইনগলফ পাখির পালকের বিছানায় বসে আছেন। রাজা ইনগলফ ফ্রান্সিসের পেছন দিকে তাকালেন। মারিয়াকে না দেখে তিনি হতাশার ভঙ্গী করলেন।
বললেন–ফ্রান্সিস বলেছিলে রাজকুমারী মারিয়াকে মুক্ত করে আনবে। ফ্রান্সিস একটু মাথা নত করে বলল–না-পারলাম না। রাজার মুখ চিন্তাকুল হল। একটু মাথা নেড়ে বললেন–তাহলে তো আমাদের সৈন্যদের নিয়ে স্কালহল্টে চলে যেতেই হবে। ফ্রান্সিস একটু চুপ করে রইল। তারপর বলল–আপনি কি মনে করেন সৈন্যবাহিনী নিয়ে আপনি স্কালহল্টে চলে গেলে গুমন্ড তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে?
–জানি না। কিন্তু এছাড়া আমার আর কিছু করার নেই। রাজা হতাশস্বরে বললেন। ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। আসলে ও এত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল যে ভালো করে গুছিয়ে কিছু ভাবতে পারছিল না। ও একটু মাথা নুইয়ে রাজাকে সম্মান জানিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
ফ্রান্সিস বন্দরে এল ঘোড়ায় চড়ে। অনেক চিন্তা ওর মাথায়। জাহাজে উঠতেই বন্ধুরা ওকে ঘিরে ধরল। বিস্কো শাঙ্কোর কাছে সবই শুনেছে ওরা। ফ্রান্সিসের অভিযান ব্যর্থ। মারিয়াকে ওরা মুক্ত করে আনতে পারে নি। ফ্রান্সিস বন্ধুদের মুখের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল–সবই শুনেছো তোমরা। আমি খুবই পরিশ্রান্ত। খেয়ে দেয়ে একটু বিশ্রাম করবো। তবে একটা কথা জেনে রেখো–মারিয়াকে আমি মুক্ত করে আনবই। আজ অথবা কাল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ওর কেবিনঘরে চলে গেল।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে ফ্রান্সিস প্রায় ঘণ্টা চারেক ঘুমোল। এর মধ্যে হ্যারি বার দুয়েক ফ্রান্সিসকে দেখে গেছে। ও ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙায় নি।
ফ্রান্সিসের ঘুম ভাঙল। কিন্তু ও শুয়েই রইল। ভাবতে লাগল এরপরে কী করবে। হ্যারি কেবিনঘরে ঢুকল। কোন কথা না বলে ফ্রান্সিসের পাশে বিছানায় বসল। ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি–এখন আমরা কী করবো বলোতো?
–রাজা ইনগলফ কী বললেন? হ্যারি বলল?
–উনি স্কালহল্টে যাবার জন্যে মনস্থির করে ফেলেছেন?
–তুমি বোধহয় জানোনা না স্কালহল্টের রাজা হজরলিফ রাজা ইনগলফের ভাই হ্যারি বলল।
–না আমি জানতাম না। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজ পরিবার ওখানে সুখেই থাকবেন। কিন্তু ভাবনার কথা হল আমরা কি করবো? এখানে রাজা ইনগলফের সৈন্যরা থাকবে না। গুমন্ড এসে এখানকার রাজা হয়ে বসবে। সে তার সৈন্যবাহিনীও নিয়ে আসবে। এখনকার চেয়েও আমাদের বিপদ হবে আরো বেশী। কাজেই আমাদেরও স্কালহল্টে চলে তারপর যেতে হবে। হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস হ্যারির কথাগুলো মন দিয়ে শুনল। বলল–হ্যারি, সবাইকে জাহাজের ডেকে জমায়েত হতে বললো। ঘন্টা খানেকের মধ্যে। আমি যাবো।
হ্যারি সবাইকে জমায়েতের খবর দিতে চলে গেল।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা জাহাজের ডেকে এসে জড়ো হল। একটু পরেই ফ্রান্সিস এল সঙ্গে হ্যারি। এতক্ষণ সবাই কথাবার্তা বলছিল। ফ্রান্সিস আসতেই সবাই চুপ করল। ফ্রান্সিস একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বলতে লাগল–ভাইসব–তোমরা জানো থিংভেলির রাজা গুমন্ড অতীতে আমাদের দেশের সেনাপতি ছিলেন। আমাদের রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে তাকে এখানে নির্বাসিত করা হয়। সে থিংভেলির রাজা হয়ে বসে। এখন সে এক চাল চেলেছে। রাজকুমারী মারিয়াকে সে কৌশলে অপহরণ করিয়াছে। মারিয়ার মুক্তিপণ হিসেবে সে দাবী করেছে রাজা ইনগলফকে রেভকজাভিকের রাজত্ব ছেড়ে স্কালহল্টে চলে যেতে হবে। সোজা কথায় বিনা যুদ্ধে বিনা রক্তপাতে গুমন্ড রেভকজাভিকের রাজা হয়ে বসবে। তার রাজত্বের সীমানা বাড়বে। ফ্রান্সিস থামল। ভাইকিংরা কেউ কোন কথা বলল না। মাথার ওপর পাতলা কুয়াশার আবরণের মধ্যে দিয়ে আকাশে কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে উত্তরে শীতার্ত হাওয়া বইছে। ফ্রান্সিস আবার বলতে লাগল–আমি রাজা ইনগলফের সঙ্গে কথা বলেছি। আমরা চারজন মারিয়াকে মুক্ত করতে পারি নি এই জেনে তিনি স্থির সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন যে তিনি পরিবারসহ এবং সৈন্যবাহিনীকে নিয়ে স্কালহল্ট চলে যাবেন। তাহলেই রাজা গুমন্ড মারিয়াকে মুক্তি দেবে। কিন্তু আমি গুমন্ডকে ভালো করেই চিনি। সে তার প্রতিশ্রুতি কক্ষণো রাখবে না। ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলতে লাগল–্যারির সঙ্গে এই নিয়ে কথা হয়েছে। আমি স্থির করেছি আমরাও জাহাজে চড়ে স্কালহল্টে গিয়ে থাকবে। এবার এ ব্যাপারে তোমাদের মতামত বলল। ফ্রান্সিস থামল। সবাই চুপ করে রইল। নীরবতা ভাঙল বিস্কো। বিস্কো বলল–ফ্রান্সিস–আমরা যদি এখানে থাকি? লড়াই করি? গুমন্ডের সৈন্যবাহিনীকে যদি এখানকার অধিকার নিতে না দি? ফ্রান্সিস বলল–সেক্ষেত্রে দুটো সমস্যা আছে। এক রাজা ইনগফের সৈন্যবাহিনী এখানে থাকবে না। লড়তে হলে আমাদের জনা পঞ্চাশেককে একটা বড় সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করতে হবে। মরণপণ লড়াই করলেও আমরা পারবো না। দ্বিতীয়ত-মারিয়া এখনও থিংভেলির বন্দী হয়ে আছে। আমরা এখানে যুদ্ধে নেমেছি এই সংবাদ–গুমন্ড পেলে মারিয়ার বিপদ বাড়বে। বলা যায় না হয়তো রাজত্বের লোভে গুমন্ড মারিয়াকে হত্যার হুমকি দিতে পারে। তখন আমাদেরই যুদ্ধ থামাতে হবে। কাজেই সবদিক বিবেচনা করে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা এখানে থাকবো না রাজা ইনগলফের সঙ্গে আমরাও স্কালহল্টে আশ্রয় নেব। ফ্রান্সিস থামল। সমবেত ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। দুএকজন বলে উঠল–তবু আমরা যুদ্ধ করবো। কিন্তু আর কাউকে সমর্থক না পেয়ে ওরা চুপ করে গেল। একজন ভাইকিং বলে উঠল–কিন্তু রাজকুমারী মারিয়ার মুক্তি কী হবে? ফ্রান্সিস বলল–আমরা স্কালহল্টে জাহাজ নিয়ে থামবো। যদি কোনভাবে রাজা গুমন্ড মারিয়াকে মুক্তি না দেয় তবে আবার চেষ্টা করবো মারিয়াকে মুক্ত করতে। যদি কোনভাবেই না পারি তবে রাজা ইনগলফকে বাধ্য করবো যুদ্ধে নামতে। রাজা ইনগলফের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে আমরাও যুদ্ধ করবো। মারিয়াকে মুক্ত না করা পর্যন্ত আমরা কেউ আইসল্যান্ড ছেড়ে যাবো না। ভাইকিংরা সবাই উল্লাস চীৎকার করে উঠল—ও-হো-হো-হো।
