–আমাকে মারবেন না–আমাকে মারবেন না!
–না–তোমাকে মারবো না–ফ্রান্সিস বলল–আমার কর আমি যা বলবো তুমি তাই করবে।
–হ্যাঁ করবো–নিশ্চয়ই করবো। দলনেতা কাঁদতে লাগল।
–এই পাদ্রীমশাই এখানে যেভাবে জীবন কাটিয়েছেন সেইভাবে তোমাকে বাকী জীবন কাটাতে হবে। উনি যা যা কাজ করতেন সেই সব কাজ তোমাকে করতে হবে। এখানকার সবাইকে ভালোবাসতে হবে। তাদের মঙ্গল ছাড়া তুমি আর কিছু ভাববে না। কী? রাজী? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ–আপনি যা বলবেন আমি সে সব করবো। দলপতি বলল। ফ্রান্সিস তরোয়াল নামাল। বলল–অবশ্য তোমার মত নরপশুর প্রতিশ্রুতিকে আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করিনা। তবু তোমাকে বেঁচে থাকার একটা সুযোগ দিলাম।
তখনই দরজা দিয়ে বাকি দুজন সৈন্য ঢুকল। পেছনে বিস্কো ওরা। সবাই হাঁপাচ্ছে। সৈন্য দুটির সারা গায়ে রক্তের দাগ। ফ্রান্সিস ওদের দিকে তাকিয়ে বলল–এই দুজন কি কাউকে হত্যা করেছে?
–না–তার আগেই আমরা পৌঁছে গেছিলাম। তবে দুএকটা বাড়িঘর লুঠ করেছে। বিস্কো বলল।
–তবে ওদের বন্দী করে রাখো। ফ্রান্সিস বলল। বিস্কো সৈন্য দুজনকে টেনে নিয়ে ভাড়ার ঘরে ঢোকাল। তারপর ভঁড়ার ঘরের কাঠের হুড়কোটা টেনে বন্ধ করে দিল।
এবার ফ্রান্সিস সৈন্যদের দলপতির দিকে তাকাল। বলল-এই আহত যুবকটির চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। তোমাদের দুজন সৈন্য যদি মরে গিয়ে না থাকে তাদেরও চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। পাদ্রীমশাইকে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে গীর্জার পাশের বাগানে কবর দেবে। পাদ্রীমশাইর পোশাকের পকেটে চারটে স্বর্ণমুদ্রা পাবে তাই দিয়ে এইসব ব্যবস্থা করবে। তারপর যে পরিমাণ অর্থ থাকবে তা আশ্রমের কাজে ব্যয় করবে। ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলল–আমরা এখন রেভকজাভিক ফিরে যাচ্ছি। কিন্তু আমি আবার এখানে আসবো। দেখবো তুমি যে প্রতিজ্ঞা করলে তা পালন করেছো কিনা। যদি দেখি তুমি এখান থেকে পালিয়ে গেছে। দলপতি দুহাত নেড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল–না-না আমি প্রতিজ্ঞা করছি পালাবো না।
–দেখা যাক। তবে যদি পালাও তাহলে আমি তোমাকে একদিন খুঁজে বার করবোই। তখন তোমাকে যে অবস্থায় পাবো যেখানে পাবো তোমাকে হত্যা করবো। মনে রেখো আমার নাম ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে পাদ্রীমশাইর মৃতদেহের কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। দুহাতে মৃতদেহের ডানহাতটা তুলে নিল। শ্রদ্ধার সঙ্গে চুম্বন করল। আস্তে আস্তে হাতটা নামিয়ে রাখল। তারপর উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসের চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। জামার হাতায় চোখ মুছে বিস্কোদের দিকে তাকাল। কান্নাভেজা গলায় বললো–চলো। সবার আগে ফ্রান্সিস পেছনে বিক্ষো, শাঙ্কো ও প্লিনি ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। ঘরের গরম থেকে বাইরে বেরোতেই শীতার্ত হাওয়া ছুটে এল। ফ্রান্সিসের শরীরটা কেঁপে উঠল। গাছে বাঁধা ঘোড়াগুলোর কাছে ওরা এল। ঘোড়ায় চড়ল সবাই। ঘোড়া ছোটাল রেভকজাভিকের দিকে। সবার আগে প্লিনি পথ দেখিয়ে ঘোড়ায় চড়ে চলল।
ফ্রান্সিসরা ঘোড়া ছুটিয়ে চলল রেভকজাভিকের উদ্দেশ্যে। চারদিকের সাদাটে কুয়াশা ঘন হতে শুরু করল। ঘণ্টাকয়েক পরেই শুরু হল তুষার ঝড়। সেই সঙ্গে তুষারবৃষ্টি। তুষারের ঝড় বৃষ্টিতে ফ্রান্সিসরা কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছল না। তুষারঝড়ের সাঁই সাঁই শব্দের মধ্যে ফ্রান্সিস চীৎকার করে ডাকল–প্লিনি? একটু দূর থেকে প্লিনি উত্তর দিল-বলুন।
–আর কতদূর? ফ্রান্সিস চীৎকার করে বলল।
–ঠিক বুঝতে পারছি না। প্লিনিও চীৎকার করে বলল। এবার বিস্কোর উচ্চ কণ্ঠস্বর শোনা গেল–ফ্রান্সিস থামো নইলে আমরা দলছুট হয়ে যাবো। কিছু দেখতে পাচ্ছি না। ফ্রান্সিস বলল–চলবে না। শুধু ঘোড়ার গতি কমিয়ে দাও। তারপর ফ্রান্সিস গলা জড়িয়ে বলল–প্লিনি–তুমি সবার সামনে থাকো। মুখে শব্দ করতে থাকো। সেই শব্দ লক্ষ্য করে আমরা ঘোড়া ছোটাব। তখন প্লিনি চীৎকার করে একটা গান গাইতে লাগল। সেই গানের শব্দ লক্ষ্য করে ফ্রান্সিস বিস্কো আর শাঙ্কো ঘোড়া ছোটাতে লাগল। প্লিনি ঘুরে ফিরে সেই গানটাই গাইতে লাগল। এখানকার ঘাসের উপত্যকায় ভেড়া চরাবার সময় ভেড়া চালকরা যে গান গায় সেই গান।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তুষার ঝড় থেমে গেল। বৃষ্টির জোর কমল। তারপর বৃষ্টি একেবারে থেমে গেল। তখনই পাতলা কুয়াশার আস্তরণের মধ্যে দিয়ে দেখা গেল টানা পাহাড়ের চড়াই। রেভকজাভিকের সীমান্ত। ফ্রান্সিস টানা পাহাড় দেখেই বুঝল সেটা। ও চীৎকার করে উঠল–ও হো-হো। বিস্কো আর শাঙ্কোও চীৎকার করে উঠল–ও হা-হো। তুষারের ঝড়বৃষ্টিতে ফ্রান্সিসদের সর্বাঙ্গ ভিজে গেছে। হাওয়ার তেজ কমলেও ফ্রান্সিসরা ঠান্ডায় কাঁপতে লাগল।
টানা পাহাড়ের চড়াই পেরিয়ে ঘোড়া ছোটাল ফ্রান্সিসরা। এখন চারদিক পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে। কুয়াশার আস্তরণও পাতলা। দূর থেকে আলোর বিন্দু দেখা গেল। রেভকজাভিক নগরের আলো।
ওরা যখন নগরে ঢুকল তখন পথঘাট প্রায় জনশূণ্য। ঘরে ঘরে আলো নেভাননা। পথে দুএকজন পথচারী। ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে রাজবাড়ির সামনে এল। ঘোড়া থামাল। সবাই হাঁপাচ্ছে তখন। ফ্রান্সিস বলল–বিস্কো শাঙ্কো তোমরা জাহাজে চলে যাও। প্লিনি তুমিও বাড়ি যাও আমি রাজা ইনগলফের সঙ্গে কথা বলে জাহাজে ফিরবো। বিস্কো শাঙ্কো আর প্লিনি চলে গেল! দ্বাররক্ষী একজন ফ্রান্সিসের কাছে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–রাজা ইনগলফকে খবর দাও।
