এক ছুটে পিছিয়ে এল। টেবিলে রয়েছে ওদের আধখাওয়া খাবারের কাঠের পাত্রগুলো। ফ্রান্সিস দুহাতে ওদের পাত্রগুলো টেবিল থেকে মেঝেয় ফেলে দিল। ঘরটার আর একপাশে তাকাল। দেখল পেছনে একটা কাঠের আগল দেওয়া কাঠের ছোট দরজা। ফ্রান্সিস ওদিকে কয়েকপা ছুটে বলল এদিকে। আগল খুলে দরজাটা খুলল। ঢুকে পড়ল অন্ধকার ঘোট ঘরটায়। পেছনে পেছনে বিস্কোরাও। ওদিকে পাদ্রীমশাই আর যুবকটি প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না ফ্রান্সিসরা পেছনের ঘরে আত্মগোপন করল কেন। একটু পরেই দরজায় ধাক্কার শব্দ শোনা গেল সেই সঙ্গে উঁচুগলায় চীৎকার, দরজা খোল। খোল দরজা। গুমণ্ডের সৈন্যরা এসেছে। পাদ্রীমশাই আর যুবকটির মুখভয়ে সাদা হয়ে গেল। ওরা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। আবার দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা আর চীৎকার–খোল দরজা!
ফ্রান্সিস অন্ধকারে ঘরটার চারিদিকে তাকাল যদি বাইরে বেরোবার কোন দরজা পাওয়া যায়। না-নেই। ঘরটায় গম আটার বস্তা। বড় বড় কাঠের থালা। আরো অন্য বস্তা সাজানো। বোঝা গেল ভাড়ার ঘর এটা। ফ্রান্সিস এবার ছোট কাঠের দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে দেখতে লাগল গুমণ্ডের সৈন্যরা কী করছে। ধাক্কার চোটে দরজা প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থা। এসব দাড়িগোঁফঅলা যুবকটি ভয়ে ভয়ে দরজার কাছে গেল। তারপর দরজার আগলটা খুলে দিল। গুমণ্ডের সৈন্যরা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল। সবার হাতে খোলা তরোয়াল। সংখ্যায় ওরা পাঁচজন। প্রথমেই রয়েছে সেই ছুঁচোলো দাড়িগোঁফঅলা দলনেতাটি। সে ঢুকেই এক ধাক্কায় যুবকটিকে মেঝেয় ফেলে দিল। দুচোলো দাড়িগোঁফঅলা দলনেতা তরোয়ালের ডগাটা যুবকটির বুকের ওপর ঠেকাল। বলল–এখানে পলাতক কয়েদীরা এসেছিল? যুবকটি মেঝেয় শোওয়া অবস্থাতেই মাথা নাড়ল। ফ্রান্সিসরা যে পলাতক কয়েদী একথা তো সত্যিই যুবকটি জানতো না। ও সত্যি কথাটাই মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে জানাল। দলনেতা তরোয়াল সরাল। যুবকটি আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। দলনেতা একবার পাদ্রীমশাইর দিকে তাকিয়ে দেখল। তারপর ঘরের চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল–দুজন চলে যা। অন্য বাড়িগুলো দ্যাখ। দুজন সৈন্য তরোয়াল হাতে বাইরে বেরিয়ে গেল। দলনেতা এবার টেবিলের ধারে কাঠের থালা ছিটোনো খাবার দেখতে পেল। তারপর সন্দেহ দৃঢ় হল। ও সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে যুবকটিকে বলল–তুই মিথ্যে কথা বলছিস। ওরা এখানে এসেছিল। তোরা ওদের ছেড়ে দিয়েছিস। মর তবে। দলনেতা যুবকটির বাঁ কাঁধে তরোয়ালের কোপ বসাল। রক্ত বেরিয়ে এল। যুবকটি কাঁধে হাত চেপে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেয় বসে পড়ল। গোঙাতে লাগল।
ফ্রান্সিস দরজার ফোকর দিয়ে সব দেখছিল। ও এবার একটানে কোমর থেকে তরোয়াল খুলে ফেলল। চাপা স্বরে বলল–বিস্কো শাঙ্কো তৈরী হও। বিস্কো আর প্লিনি সঙ্গে সঙ্গে কোমর থেকে তরোয়াল খুলল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে কাঁধ থেকে ধনুক নামিয়ে ধনুকে তীর চড়াল। দলনেতার এবার নজরে পড়ল আঁড়ার ঘরের কাঠের ঘোট দরজাটার দিকে। ও এক পা এক পা করে তরোয়াল উঁচিয়ে দরজাটার দিকে আসতে লাগল। পাদ্রীমশাই হঠাৎ দুহাত তুলে ছুটে এসে দলনেতার সামনে। দাঁড়ালেন। কান্নাভেজা গলায় বলে উঠলেন–না–না। দলনেতা এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। তারপর বিদ্যুৎবেগে তরোয়াল বসিয়ে দিল পাদ্রীমশাইর বুকে। বৃদ্ধ দুহাত তোলা অবস্থায় টেবিলের ওপর মুখ থুবড়ে পড়লেন। তারপর গড়িয়ে মেঝেয় পড়ে গেলেন।
ফ্রান্সিস চীৎকার করে উঠল–লড়াই। তারপর পায়ের এক লাথিতে দরজা খুলে ছুটে গিয়ে দলনেতার ওপর আঁপিয়ে পড়ল। দলনেতা এত হঠাৎ আক্রান্ত হবে স্বপ্নেও ভাবে নি। ও কোনরকমে ফ্রান্সিসের তরোয়ালের মার ঠেকাল। তারপরেই শুরু হল দুজনের তরোয়ালের লড়াই। ততক্ষণে শাঙ্কোর ছোঁড়া তীর একজন সৈন্যের বুকে বিধে গেছে। সেও মারা পড়ে গেছে। অন্য সৈন্যটির ওপর তরোয়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিস্কো আর প্লিনি। দুজনের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা সৈন্যটার ছিল না। অল্পক্ষণের মধ্যেই কপালে তরোয়ালের ঘা খেয়ে টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তখনই পাশের বাড়িগুলো থেকে নারী ও শিশু কণ্ঠের চীৎকার ও কান্নার রোল উঠল। ফ্রান্সিস তরোয়াল চালাতে চালাতে বলল–বিস্কো–ওদের বাঁচাও। বিস্কো প্লিনি আর শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে ছুটে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল।
তখনও ফ্রান্সিস আর দলনেতার তরোয়ালের লড়াই চলছে। ফ্রান্সিস তরোয়াল চালাতে চালাতে বুঝল ও যে কোন মুহূর্তে দলনেতাকে হত্যা বা আহত করতে পারে। কিন্তু ও তা করলনা। একবার হঠাৎ আক্রমণের চাপ বাড়িয়ে দিল। পরক্ষণেই এত জোরে তরোয়াল চালাল যে দলপতির হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে মেঝেয় ঝন্ ঝন্ শব্দে পড়ে গেল। নিরস্ত্র দলনেতা তখন হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ওর মুখে মৃত্যুভয় ফুটে উঠল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে তরোয়ালের ডগাটা বুকে চেপে ধরল। বলল–তোমাকে আমি হত্যা করবো না। শুধু কয়েকটা কথা বলি শোন। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল–কী জীবন তুমি কাটিয়েছ? রাজা গুমণ্ডের আদেশ পালন করেছে। ভালো খেয়ে পরে আনন্দ করেছে। আর নির্বিচারে নারী শিশুদের নিরীহ মানুষদের হত্যা করেছে। এই পৃথিবীতে তোমার মত নরপিশাচের বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই। অথচ দেখ–যে বৃদ্ধ পাদ্রীমশাইকে তুমি হত্যা করলে তিনি সারাটা জীবন এই বসতির মানুষদের প্রাণ দিয়ে ভালো বেসেছেন। তাদের মঙ্গলের জন্যে নিজের সব আনন্দবিলাস সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়েছেন। এমন একজন দেবতুল্য মানুষ মরে যাবেন আর তোমার মত নরপশু বেঁচে থাকবে এ তো হয় না। দলনেতা হাউ-মাউ করে কেঁদে উঠে ফ্রান্সিসের পায়ে পড়ল। দুহাতে ফ্রান্সিসের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল–
