ফ্রান্সিসরা ঘরের মধ্যে ঢুকল। দেখল–ঘরটা লম্বাটে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একপাশে একটা বিছানা। ওদিকের দেয়ালের কাছে একটা চৌকোনো গর্তে আগুন জ্বলছে। তাতেই ঘরটা বেশ গরম হয়ে আছে। বাইরের ঠাণ্ডা থেকে ঘরের গরমে ঢুকে সকলেরই ভালো লাগল। একটা কাঠের টেবিল আর টানা বেঞ্চমত দেখিয়ে পাদ্রী বলল–তোমরা বসো। আমি লোকজনকে খবর দিতে যাচ্ছি। তোমাদের খেতে দেবার মত যথেষ্ট খাদ্য পানীয় তত আমার ঘরে নেই।
ফ্রান্সিসরা বেঞ্চমত জায়গাটায় বসল। পাত্রী টেবিলে জ্বলন্ত মোমবাতিটা রেখে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।
একটু পরেই পাদ্রী ফিরে এলেন। ঘরে ঢুকলে। তার পেছনে দাড়িগোঁফঅলা একটি স্বাস্থ্যবান যুবকও ঢুকল। যুবকটি হেসে বলল–আপনারা আমাদের অতিথি। একটু অপেক্ষা করুন। আপনাদের খাবার আসছে।
আমাদের ঘোড়াগুলো খুব পরিশ্রান্ত। বিস্কো বলল। যুবকটি হেসে বলল-ঘোড়াগুলোর দানাপানির ব্যবস্থা করেছি। আপনারা নিশ্চিন্ত হোন।
ফ্রান্সিসরা সকলেই খুব ক্লান্ত। এতক্ষণে হাত পা ছড়িয়ে বসতে পেরে একটু আরাম পেল। পাদ্রী আপনমনেই বলতে লাগলেন–এখানে পাঁচ সাত ঘরের বাস। আমরা সবাই বড় ভয়ে ভয়ে আছি।
-কেন বলুন তো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–রাজা গুমণ্ড অত্যন্ত অত্যাচারী রাজা। তার রাজত্বে আমরা কেউ সুখে নেই সারাক্ষণ ভয় কখন রাজা গুমণ্ডের সৈন্যরা এসে হাজির হয়। খুন জখম লুঠপাট ওদের কাছে খুবই সাধারণ ব্যাপার। রাজার কাছে নালিশ করতে গেলে কারো রেহাই নেই, রাজা গুমণ্ড তাকে ফাঁসিয়ে দেয়। সে কোন অভিযোগ অনুযোগ কানেই তোলে না। সৈন্যরা যা খুশী করে বেড়ায়। পাদ্রী আস্তে আস্তে বললেন।
–তাহলে তো এখানে এক অরাজক অবস্থা চলছে। বিস্কো বলল। পাদ্রী কোন কথা না বলে আস্তে আস্তে মাথা ঝাঁকালেন। ফ্রান্সিস বলল–আপনাদের উচিত সব প্রজাদের নিয়ে রাজা গুমণ্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।
অসম্ভব পাদ্রীমশাই হেসে মাথা নাড়লেন। ফ্রান্সিস বলল–আপনি এখানে কতদিন আছেন?
–অনেকদিন। সাদা ভুরু কুঁচকে পাদ্রী বললেন। দেখছেনই তো ছোট্ট গ্রাম এটা। এক তুষার ঝড়ে পথ হারিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছিলাম। কতদিন আগের কথা। এই ছোট্ট গ্রামের মানুষেরা সেবাযত্ন করে আমাকে বাঁচিয়েছিল। নইলে আমার বাঁচার কোন আশাই ছিল না। তারপর কী করে এখানকার মানুষদের সঙ্গে জড়িয়ে গেলাম কী এক বন্ধনে। প্রথমে এদের ছেলেমেয়েদের জন্য পাঠশালা খুললাম। তারপর আস্তে আস্তে অনেক অনাথ ছেলেমেয়েকে আশ্রয় দিলাম। একটা আশ্ৰমমত গড়ে তুললাম।
–আশ্রমের খরচ চালান কী করে? বিস্কো জিজ্ঞেস করল।
–ভিক্ষে করে। মাঝে মাঝে থিংভেলির নগরে চলে যাই। রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষে করি। অবশ্য কিছু ধনাঢ্য ব্যক্তি আছেন তারা বরাবর আমাকে অর্থ সাহায্য করেন।
–রাজা গুমণ্ড সাহায্য করেন না? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস কর : পাদ্রীমশাই হাসলেন। মাথা নেড়ে বললেন–কিছু না। কয়েকবার গেছি সাহ-, চাইতে। উনি একটা কথাই বলেছেন–এসব অনাথ বাচ্চাকাচ্চার বেঁচে থাকার কোন মানে হয় না। মরুক সব। কথাটা শুনে ফ্রান্সিসরা অবাক হয়ে গেল। একজন দেশের রাজা এ ধরনের কথা বলতে পারে?
দাঁড়ি গোঁফঅলা যুবকটি বলল–এই পাদ্রীমশাই আমাদের কাছে দেবতার মত। গীর্জার কাজ চালান আবার পাঠশালা, হাতের কাজের শিক্ষাকেন্দ্রও চালান। কত অনাথ ছেলে মেয়ে কী সুন্দর কম্বল, গরম পোশাক বোনে। ফ্রান্সিস এসব শুনে খুব খুশী হল। পাদ্রীমশাইকে বলল–আপনার মত মানুষেরা যত বেশী থাকবেন আমাদের ততই মঙ্গল। কথাটা বলে বিস্কোকে বলল–বিস্কো দেখতো তোমার থলিতে কটা স্বর্ণমুদ্রা আছে। বিস্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা রেশমী থলি বের করল। থলি খুলে দেখল চারটে স্বর্ণমুদ্রা রয়েছে। ফ্রান্সিস স্বর্ণমুদ্রাগুলো নিয়ে পাদ্রীমশাইর হাতে দিল। বলল–এর বেশী তো নেই। যা আছে দিলাম।
পাদ্রীমশাই হেসে বললেন–আপনাদের এই দানই আমার কাছে অনেক। ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন। বলে পকেটে স্বর্ণমুদ্রা রাখলেন। তখনই কাঠের দরজা ঠেলে দুজন স্ত্রীলোক ঘরে ঢুকল। তাদের হাতে বড় বড় কাঠের পাত্র। তারা সেসব টেবিলে রাখল। তারপর ছোট ছোট কাঠের থালা ফ্রান্সিসদের সামনে পেতে দিল। থালায় পরিবেশন করল গরম গরম গোল রুটি আর ভেড়ার মাংস। খাবার দেখে এতক্ষণে ফ্রান্সিস বুঝল যে ওর ভীষণ খিদে পেয়েছে। বিস্কোদের অবস্থাও তাই। সবাই খেতে লাগল। পাত্রীও খেতে লাগলেন। যুবকটিও খেতে বসল।
সবাই খাচ্ছে। স্ত্রীলোক দুজন চলে গেল। তখনও সবার খাওয়া শেষ হয় নি। হঠাৎ ফ্রান্সিসের কানে ঘোড়ার ডাকের শব্দ এল। ওদের ঘোড়া বাঁধা বারান্দার পরেই। ওদের ঘোড়ার ডাক নয়। খুব মৃদু শব্দ। দূর থেকেই এল শব্দটা। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। খাওয়া ফেলে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। বিস্কো শাঙ্কো ওর দিকে অবাক চোখে তাকাল। বিস্কো বলে উঠল-কী ব্যাপার ফ্রান্সিস? ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল–রাজা গুমণ্ডের সৈন্যরা আমাদের পিছু ছাড়েনি। শিগগির পালাও। জলদি। কথাটা বলেই ফ্রান্সিস দরজার দিকে ছুটল। বিস্কো শাঙ্কোও খাওয়া ছেড়ে লাফিয়ে উঠল। ছুটল ফ্রান্সিসের পেছনে। কিন্তু দরজা খুলতে গিয়েই ফ্রান্সিস থমকে গেল। বাইরের তুষারগলা জলে কাদায় ঘোড়ার থপ থপ শব্দ উঠল। ফ্রান্সিস দ্রুত ফিরে দাঁড়াল।
