তারপর মাথা অনেকটা নিচু করে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে পাথরের চত্বর পেরিয়ে চলল। ফ্রান্সিসের দেখাদেখি প্লিনিও মাথা নিচু করে চলল। দেয়ালের কাছে পৌঁছেই ফ্রান্সিস তরোয়াল খুলল। দুটো লোহার আংটায় মশাল দুটো রাখা। ফ্রান্সিস মাথা নিচু অবস্থাতেই তরোয়ালের ডগার এক খোঁচায় একটা জ্বলন্ত মশাল পাথরের চত্বরে ফেলে দিল। চত্বরে জমা বরফ জলে পড়ে জ্বলন্ত মশালটা নিভে গেল। ফ্রান্সিস এবার সতর্ক দৃষ্টিতে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে চারিদিকে তাকাল। না। রক্ষীদলের মশালের আলো কোনদিকে দেখা যাচ্ছে না। এবার তরোয়ালের খোঁচায় আর একটা জ্বলন্ত মশাল ফেলে দিল। ওটাও নিভে গেল। জায়গাটা অন্ধকার হয়ে গেল। ওদিকে মশাল নিভতেই বিস্কো শাঙ্কো ওরা দল বেঁধে দ্রুতগতিতে পাথুরে চত্বর পেরিয়ে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। প্লিনি গোপন দরজা খোলবার জন্য পাথরের ছোট চাইটা সরাচ্ছে তখনই দূরে কুয়াশা ঢাকা কয়েকটা মশালের আবছা আলো দেখা গেল। ফ্রান্সিস চাপা গলায় বলল–প্লিনি–জলদি। প্লিনি ততক্ষণে পাথরটা খুলে ফেলেছে। কাঠের চাকতিটা ঘঘারাতে শুরু করেছে। একটা মৃদু গোঁ গোঁ শব্দ তুলে লোহার দরজাটা খুলে যেতে লাগল। মশাল হাতে প্রাসাদরক্ষীরা তখন অনেকটা কাছে চলে এসেছে। একজনের বেরোবার মত ফাঁক হতেই ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল–এক এক করে বেরিয়ে যাও। প্রথমে সদ্যমুক্ত গুমণ্ডের সৈন্যরা বেরোতে লাগল। তারপর বিস্কো, শাঙ্কো, তারপর প্লিনি আর ফ্রান্সিস। রক্ষী-সৈন্যরা ততক্ষণে বুঝে ফেলেছে। গোপন দরজা খোলা হয়েছে। বন্দীরা পালাচ্ছে। ওরা জ্বলন্ত মশাল হাতে ছুটে আসতে লাগল। এবার প্লিনি দেয়ালের ওপাশের চৌকোণণা ফোকরের পাথরটা খুলল। কাঠের যন্ত্রটা ভেঙে দিল। পাথরের কয়েকটা ঘা মেরে কাঠের যন্ত্রটা ভেঙে দিল। দরজা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। তখন দেয়ালের ওপাশে প্রাসাদ রক্ষীদের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা গেল। কিন্তু ওরা বন্ধ দরজা খুলতে পারল না। ফ্রান্সিসরা তখন কিছুটা এগিয়ে গেছে। প্লিনি ছুটে এসে ওদের সঙ্গে যোগ দিল। ফ্রান্সিস তখন কিছুটা এগিয়ে গেছে। প্লিনি ছুটে এসে ওদের সঙ্গে যোগ দিল। ফ্রান্সিস একটা উষ্ণ প্রস্রবণের পাশ দিয়ে ছুটতে ছুটতে বলল–প্লিনি, যেখানে ঘোড়া রেখে এসেছি সেখানে নিয়ে চলো। প্লিনি উত্তর মুখে ঘুরল। তখনই রাজা গুমণ্ডের সদ্যমুক্ত সৈন্যদের একজন বলল–আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ রইলাম। এবার আমরা যাই। ওরা পর পর ফ্রান্সিসের ডানহাত ধরে ঝাঁকুনি দিল। তারপর কুয়াশা আর অল্প অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সিস বিস্কো আর শাঙ্কো প্লিনির পেছনে পেছনে ছুটল অল্প অন্ধকার কুয়াশার মধ্যে দিয়ে একদিকে লোকবসতি কম। কয়েকটা বাড়ি পড়ল। দরজা জানলা বন্ধ! অন্ধকার। প্লিনি ওদের পথ দেখিয়ে সেই ঝরাপাতার বনে নিয়ে এল। বনের ধারের ওক গাছের সঙ্গে ঘোড়াগুলো বাঁধা আছে দেখা গেল। যাক্ ঘোড়াগুলো চুরি হয়নি। এখন এই ঘোড়াই ভরসা। তিনজনে গাছে বাঁধা দড়ি খুলে লাফিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠে বসল। প্লিনি ঘোড়া ছোটাল। ফ্রান্সিসরা প্লিনির পেছনে পেছনে ঘোড়া ছোটাল।
শীতার্ত হাওয়া এলোমেলো বইছে। চোখের সামনে কুয়াশা সেই হাওয়ায় কখনো সরে যাচ্ছে কখনো জট পাকাচ্ছে। চোখেমুখে ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাঁপটা লাগছে। ওরা ঘোড়া ছুটিয়ে চলল। মাথার ওপরে আকাশও সাদাটে কুয়াশায় ঢাকা। গুঁড়ি গুঁড়ি তুষার পড়ছে। বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘোড়া ছোটাল ফ্রান্সিসরা। ঘোড়াগুলোর মুখে ফেনা জমেছে। ঘোড়াগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিসরাও ক্লান্ত। কয়েদঘরে খাওয়া ঘুম কোনটাই যথেষ্ট হয়নি। ফ্রান্সিস ভাবল–কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন। নিজেদের ঘোড়াগুলোরও। ফ্রান্সিস ডাকল-প্লিনি।
–বলুন। প্লিনি ওর দিকে তাকাল।
–আমাদের কিছুক্ষণ বিশ্রামের প্রয়োজন। এখানে কোথাও লোকবসতি আছে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–আর আধঘণ্টা ঘোড়া ছোটালে একটা ছোট্ট গ্রাম পাওয়া যাবে। ছোট্ট গীর্জা আছে। সেখানে একজন পাদ্রী আছেন। বেশ কয়েকঘর বসতিও আছে। প্লিনি বলল।
–তাহলে ওখানেই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেব। ফ্রান্সিস বলল।
কিছুক্ষণ পরেই দূর থেকে একটা ছোট্ট গীর্জার তিনকোণা মাথা দেখা গেল। কাছে গীর্জার কাছাকাছি আসতেই দেখা গেল গীর্জার পাশে বেশ কয়েকটা বাড়ি। ওরা গীর্জাটার সামনে এসে ঘোড়া থামাল। দেখল ঘরে ঘরে আলো জ্বলছে। তাহলে এই ছোট্ট গাঁয়ের লোকেরা জেগে আছে।
ঘোড়া থেকে ওরা নামল। গীর্জার পাশেই একটা ন্যাড়া গাছ। গাছটায় ঘোড়ার দড়ি বাঁধল। গীর্জার পাশেই যে পাথর আর কাঠের ঘরটা আছে তার পাথুরে বারান্দায় ফ্রান্সিস উঠে এল। কাঠের দরজায় ধাক্কা দিল। ঘরের ভেতর থেকে এক বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর শোনা গেল–আসছি। দরজা খুলে গেল। পাদ্রীর পোশাক পরা এক বৃদ্ধ মোটা জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে এগিয়ে এলেন। ফ্রান্সিসরা মাথা নীচু করে শ্রদ্ধা জানাল। বৃদ্ধ ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন
–তোমরা কোত্থেকে আসছে ভাই?
–আমরা থিংভেলির থেকে আসছি। রেভকজাভিক যাবো। ঘোড়াগুলোর জন্যে দানাপানি আর আমাদের জন্য সামান্য কিছু খাবার। পাদ্রী হাসলেন। বললেন–তোমরা আমাদের অতিথি। তোমাদের খাদ্য দেওয়া ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করা আমার কর্তব্য। ভেতরে এসো।
