এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে দড়ি ধরে নেমে এল। নেমেই দ্রুতহাতে কোমর থেকে ছোরাটা বের করল। তারপর হাত পাঁচেক দড়ি কেটে নিল। দড়িটা কোমরে জড়িয়ে রাখল। , যদি পরে কোন কাজে লাগে। ফ্রান্সিসরা ছাড়া অন্য বন্দীরা যারা ছিল তারা এবার ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফিস ফিস করে একজন বলল–আপনি আমাদের বাঁচালেন। রাজা গুমণ্ডর কয়েদঘরে যে একবার কয়েদ হয় সে আর কোনদিন জীবন্ত বেরিয়ে আসতে পারে না। কত নিরীহ প্রজাদের যে গুমণ্ড হত্যা করেছে তার ইয়ত্তা নেই। আমরা রাজা গুমণ্ডের সৈন্যবাহিনীতে ছিলাম। রাজার আদেশে একদল নিরীহ নারী-শিশুকে হত্যা করার আদেশের বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাদের কয়েদঘরে বন্দী করা হয়েছিল। আপনার জন্যে মুক্তি পেলাম। এবার আমরা পালাই। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। বলল–না ভাই-তোমাদের আমাদের সঙ্গেই পালাতে হবে। তোমরা নিরস্ত্র। যদি ধরা পড় তোমরা লড়াইও করতে পারবে না। তোমরা গুমরে সৈন্যদের হাতে বিনাযুদ্ধে মারা যাবে। ততক্ষণে রাজা গুমণ্ডের পাহারাদার সৈন্যরাও জেনে যাবে যে আমরা পালিয়েছি। নিরস্ত্র আমরাও ধরা পড়বো। আমরাও বাঁচবো না।
-তাহলে এখন কী করবেন? বন্দী সৈন্যদের মধ্যে থেকে একজন বলল। ফ্রান্সিস সবাইকে কাছে আসতে ইঙ্গিত করল। সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস নিচুস্বরে বলল–আর এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করা চলবে না, আমরা এখন অস্তঘরে যাবো। অস্ত্রঘর থেকে আমাদের অস্ত্রগুলো উদ্ধার করবো। তারপর প্লিনি যে গোপন দরজা দিয়ে ঢোকার ব্যবস্থা করেছিল সেই গোপন দরজা খুলে পালাবো। এবার চলো অস্ত্রাগারে। সবাই পাথরের বাড়ির দেয়ালের আড়ালে আড়ালে চলল। সৈন্যরা যখন ফ্রান্সিসদের ধরে নিয়ে আসছিল তখন ফ্রান্সিস অস্ত্রাগারটি ভালো করে দেখে রেখেছিল। অস্ত্রাগারের মাথায় শীলমাছ আঁকা পতাকাটা উড়ছিল। ফ্রান্সিস দেখেই চিনল। ফ্রান্সিস ইঙ্গিতে সবাইকে দাঁড়াতে বলল। তারপর অস্ত্রাগারের পাথরের দেয়াল ঘেঁষে এগিয়ে দেখল–অস্ত্রাগারের দরজায় দুজন সৈন্য পাহারা দিচ্ছে। হাতে খোলা তরোয়াল নিয়ে দুজন দরজার সামনে ঘুরছে, দরজার দুপাশে দুটো মশাল জ্বলছে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–বিস্কো–আমি বাঁদিকেরটা। তুমি ডানদিকেরটা। গলা চেপে ধরেই চোখ-মুখ ঢেকে বেঁধে ফেলবে। অন্যদের দেয়ালের গা ঘেঁষে দাঁড়াতে বলে ফ্রান্সিস আর বিস্কো কুয়াশা ঢাকা চত্বর মাথা নিচু করে পেরিয়ে পাহারাদার দুজনের কাছাকাছি পৌঁছে অস্ত্রাগারের দেয়ালের আড়ালে দাঁড়াল। একুট দম নিল। তারপর কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ছুটে গিয়ে দুজন পাহারাদারের ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। পাহারাদার দুজনের হাতের তরোয়াল ছিটকে গেল। কুয়াশায় আস্তরণের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিস আর বিস্কো এত দ্রুত বেরিয়ে এল যে পাহারাদার দুজন হকচকিয়ে গেল। ততক্ষণে ফ্রান্সিস একটা পাহারাদারের গলা হাত দিয়ে চেপে ধরল। পাহারাদারটি টু শব্দ করতে পারছে না। পাহারাদারদের কোমরের ফেট্টিটা ফ্রান্সিস অন্য হাতে খুলে ফেলল। তারপর ফেট্টিটায় পাহারাদারের চোখ-মুখ ঢেকে মুখ বেঁধে দিলে। নিজের কোমর থেকে দড়িটা বের করে পাহারাদারটির হাত পা বেঁধে ফেলে রাখল। কোমর থেকে ছুরি বের করে বাকি দড়িটা কেটে বিস্কোর দিকে এগিয়ে ধরল। বিস্কোও একই কায়দায় অন্য পাহারাদারটির মুখ হাত পা বেঁধে ফেলে রাখল। ফ্রান্সিস আগেই দেখেছিল মোটা পাহারাদারটির কোমরে চাবির গোছা ঝুলছে। ও চাবির গোছাটা নিল। চাবিটাও আগে দেখেছিল। সেই লম্বা চাবিটা খুলে দরজার বড় তালাটায় লাগাল। এক মোচড়েই তালাটা খুলে গেল। ওদিকে শাঙ্কো, প্লিনি আর অন্য সদ্য মুক্ত সৈন্যরাও ছুটে এল। সবাই অস্ত্রাগারে ঢুকল। দেখল দেয়ালে জ্বলন্ত মশাল আটকানো। সেই আলোয় দেখা গেল সারি সারি তরোয়াল বর্শা ঢাল এসব সাজানো। ফ্রান্সিস নিজেদের তরোয়ালগুলোর খোঁজে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। দেখল ঘরের ডানকোণায় ওদের তরোয়াল রাখা হয়েছে। সঙ্গে শাঙ্কোর তীর ধনুক। শাঙ্কো ছুটে গিয়ে তীরের খাপ ধনুক তুলে নিল। ফ্রান্সিস, বিস্কো, প্লিনি নিজের নিজের তরোয়াল তুলে নিল। সদ্যমুক্ত সৈন্যরাও তরোয়াল ঢাল হাতের কাছে যেমন পেল নিয়ে নিল। ফ্রান্সিসের কানে এল বন্দী পাহারাদার দুজনের গোঙানি। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল–জলদি–বাইরে চলো। সবাই দ্রুত ছুটে অস্ত্রাগারের বাইরে এল। ফ্রান্সিস দরজায় তালা লাগাল। তারপর চাবির তোেড়াটা অন্ধকারে ছুঁড়ে ফেলে দিল। চাপাস্বরে ডাকল–প্লিনি। প্লিনি এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল–সেই গোপন দরজার কাছে নিয়ে চলো। ঐ দরজা দিয়েই আমরা পালাবো। প্লিনি মাথা ঝাঁকিয়ে আগে আগে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ছুটল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। একটা লম্বাটে পাথরের বাড়ির পেছনে এসে প্লিনি দাঁড়াল। সবাই একটু হাঁপাচ্ছে। তখন। প্লিনি সামনের পাথুরে চত্বরের পরে পাথরের দেয়ালে যেখানে দুটো মশাল জ্বলছে সেইদিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল–ঐ দুটো মশালের মাঝখানে সেই গোপন। দরজাটা। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিস সেই মশাল দুটোর দিকে তাকিয়ে রইল। রক্ষী সৈন্যরা যে কোন মুহূর্তে এসে পড়তে পারে। এক মুহূর্তও দেরী করা চলবে না। ফ্রান্সিস দ্রুত চিন্তা করে নিল। ঐ মশাল দুটো আগে নেভাতে হবে। জায়গাটা অন্ধকার করে ফেলতে হবে। তারপর দরজা খুলে পালাতে হবে। ফ্রান্সিস সকলের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বলল–আমি আর প্লিনি আগে যাচ্ছি। মশাল দুটো নিভিয়ে দেব। মশাল নিভলেই তোমরা কোন শব্দ না করে দেয়ালটার কাছে চলে যাবে। ফ্রান্সিস প্লিনিকে ইঙ্গিত করল।
