ঘণ্টা কয়েক পরে লোহার দরজায় ঢং-ঢং শব্দ উঠল। রক্ষীরা খাবার নিয়ে ঢুকল। ফ্রান্সিসদের খাওয়াদাওয়া শেষ হতে রক্ষীরা ওদের হাত বেঁধে দিয়ে চলে গেল। ঢঢং-ঢং শব্দ তুলে দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
প্রায় ঘণ্টাখানেক কেটে গেল। বাইরে পাহারাদারদের বিশেষ সাড়া শব্দ নেই। ফ্রান্সিস বসা অবস্থাতেই বিস্কোর যতটা কাছে আসা সম্ভব এল। তারপর বাঁধা হাত দুটো বিস্কোর জামার তলায় ঢুকিয়ে দিল। আস্তে আস্তে বিস্কোর বড় ছোরাটা বের করে নিয়ে এল। ছোরাটা বিস্কোর হাতে দিল। বিস্কো বাঁধা হাত দুটো দিয়ে ছোরাটার বাঁট ধরল। তারপর ফ্রান্সিসের হাতবাঁধা দড়িটা কাটতে লাগল। উত্তেজনায় বিস্কোর হাত কাঁপছে। ও ঠিকমত ছোরাটা ঘষতে পারছিল না। ছোরার ফলাটা এদিক ওদিক ঘুরে ফিরে ফ্রান্সিসের হাতে কব্জিতে বসে যাচ্ছিল। বেশ কয়েকটা জায়গা কেটে গেল। রক্ত পড়তে লাগল। ফ্রান্সিস ওসব গায়ে মাখল না। শুধু দাঁতচাপা স্বরে বলল–জলদি। একটুক্ষণের মধ্যেই দড়ি কেটে গেল। ফ্রান্সিস খোলা হাত নিয়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। ছোরাটা নিয়ে বিস্কোর হাতের বাঁধার দড়িটা কেটে ফেলল। বিস্কোকে ছোরাটা দিল। বলল–সবাইর দড়ি কাটো। কিন্তু লম্বা দড়িটা কেটো না। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল দরজার দিকে। লোহার দরজায় কান পাতল। বাইরেরটা নিঝুম। শুধু দুজন পাহারাদারের জুতোর মৃদু খট খট শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস দরজা থেকে সরে এসে ঘরটার মাঝামাঝি দাঁড়াল। বিস্কো ততক্ষণে প্রায় সব বন্দীর হাতের দড়ি কেটে দিয়েছে। অন্য বন্দীরা অবাকচোখে ফ্রান্সিসের কাণ্ড দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস এবার লম্বা দড়িটা যে লোহার কড়ার সঙ্গে বাঁধা সেখানে গেল। কড়া থেকে দড়ির বাঁধনটা খুলতে লাগল। ফ্রান্সিসরা জাতিতে ভাইকিং। জাহাজের ব্যাপারে ওরা সুদক্ষ। জাহাজে পাল খাটানো থেকে শুরু করে নানা কাজে দড়ি দড়া বাঁধতে হয় খুলতে হয়। ওরা এসব ব্যাপারে নিপুণ। খুব সহজেই ফ্রান্সিস দুটো লোহার আংটা বাঁধা দড়ি খুলে ফেলল। এবার লম্বা দড়ির একটা মাথা নিয়ে বিস্কোর কাছে এল। বিস্কোর দড়ি কাটার কাজ শেষ। সব বন্দীরা হাত খোলা। ফ্রান্সিসরা ছাড়া অন্য বন্দীরা তখনও অবাক। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে আছে। এখনও সম্পূর্ণ মুক্তি পায়নি। তবু হাত দুটো তো খোলা। এটাই বা কম কি। বিস্কোর হাত থেকে ফ্রান্সিস ছোরাটা নিল। লম্বা দড়ির এক কোণায় ছোরাটা বাঁধল। তারপর ওপরে কড়িকাঠের দিকে তাকাল। ছোরাটা দড়ির সঙ্গে দোলাতে দোলাতে কড়িকাঠের দিকে ছুঁড়ে দিল। বার তিনেক ফসকে গেল। তারপর দড়ি বাঁধা ছোরা কড়িকাঠের ওপাশ দিয়ে বেরিয়ে নিচে ঝুলে পড়ল। ফ্রান্সিস একপাশের দড়ি ছাড়তে লাগল। আস্তে আস্তে ছোরা বাঁধা দড়ির মুখটা নিচে নেমে আসতেই ফ্রান্সিস ধরল। ছোরাটা খুলে কোমরে গুজল। বিস্কোদের দিকে তাকিয়ে বলল–দড়ির একটা দিক তোমরা টেনে ধর। অন্য দিকটা ধরে আমি উঠবো। বিস্কো ইঙ্গিতের সব বন্দীকে ডাকল। সব বন্দীরা এগিয়ে এল। ওরা সবাই দড়ির একটা দিক টেনে ধরল। দড়ির অন্য দিকটা ধরে ফ্রান্সিস কড়িকাঠের দিকে লক্ষ্য করে দড়ি বেয়ে বেয়ে উঠতে লাগল। জাহাজে দড়ি ধরে ওঠা নামায় ফ্রান্সিসরা সুদক্ষ। একটুক্ষণের মধ্যেই ফ্রান্সিস কড়িকাঠটা ধরে ফেলল। শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে কড়িকাঠের ওপর বসল। মাথা নিচু করে বসতে হলো। কারণ কড়িকাঠ আর ঘাসের চালের ফাঁক তিন ফুট মত। এবার ফ্রান্সিস কোমর থেকে ছোরাটা বের করল। মাথার ওপর মোটা ঘাসের ছাউনি। ছাউনির আঁটি বাঁধা ঘাসের আস্তরণ শক্ত করে একটা কাঠের খাঁচার সঙ্গে বাঁধা। ফ্রান্সিস প্রথমে খাঁচাটার বাঁধা দড়িগুলো কাটতে লাগল। বেশ কয়েকটা খাঁচার দড়ি কাটতেই ঘাসের আঁটিগুলো আলগা হয়ে গেল। খাঁচার কাঠগুলোও তখন আঙ্গগা হয়ে গেছে। কাঠগুলো ফ্রান্সিস দুহাতে সরাতে লাগল। একটুক্ষণের মধ্যে খাঁচার কাঠের টুকরোগুলো একেবারে আলগা হয়ে গেল, ফ্রান্সিস এবার ওপরের ঘাসের ছাউনি দুহাত দিয়ে টেনে টেনে সরাতে লাগল। একটুক্ষণের মধ্যে খাঁচার কাঠের টুকরোগুলো একেবারে আলগা হয়ে গেল, ফ্রান্সিস এবার ওপরের ঘাসের ছাউনি দুহাত দিয়ে টেনে টেনে সরাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘাসের আঁটি সরে গিয়ে মাথার ওপরে কুয়াশা ঢাকা আকাশ দেখা গেল। একজন মানুষ বেরুতে পারে এরকম ফাঁক হয়ে গেল। নিচে দাঁড়ানো বিস্কো শাঙ্কো আর অন্যান্য বন্দীরা অবাক চোখে ফ্রান্সিসের কাণ্ড দেখতে লাগল। ছাউনি ফাঁক হতে, আকাশ দেখা যেতে বন্দীরা পালাবার জন্যে চঞ্চল হয়ে উঠল। ফ্রান্সিস ছোরা কোমরে গুঁজে তাড়াতাড়ি দড়ি ধরে নেমে এল। ঠোঁটের ওপর আঙ্গুল চেপে চাপাস্বরে বলল–চুপ। তারপর ইশারায় সবাইকে কাছে ডাকল। ফিস্ ফিস্ করে বলল–ওপরে ঘাসের ছাউনিতে ফোকর করেছি। কিন্তু ছাউনি হাল্কা। সবাই একসঙ্গে দাঁড়াতে পারবো না। কাজেই একজন একজন করে দড়ি বেয়ে উঠে ছাউনি যে পাথরের দেয়ালের ওপর গাঁথা সেই দেয়ালের সঙ্কীর্ণ মাথায় দাঁড়াতে হবে। সবশেষে আমি উঠবো। তারপর কড়িকাঠে বাঁধা মোটা-দড়িটা নিয়ে ছাউনির দেয়াল থেকে পেছনে, নিচে মাটিতে নামিয়ে দেব। আর দড়ি ধরে ধরে একজন করে মাটিতে নেমে যাবে। এতে সময় বেশি লাগবে। কিন্তু উপায় নেই। দুতিনজন একসঙ্গে নামতে গেলে দড়ির টানে কড়িকাঠ ভেঙে যাবে। এবার কাজে নামো, যা বললাম মনে রেখো। ফ্রান্সিসের নির্দেশমত সবাই একজন একজন করে দড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। ছাউনির ফোকর দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে দেয়ালের অল্প জায়গায় দাঁড়াতে লাগল। সবশেষে ফ্রান্সিস উঠল। ও দড়িটা তুলে নিয়ে পেছনের দেয়ালের গা লাগিয়ে দড়িটা মাটিতে নামিয়ে দিল। এবার একজন একজন করে পাথর বাঁধানো চত্বরে নামতে লাগল। ফ্রান্সিস ফিস ফিস করে ওদের কানে কানে বলে দিল–দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াবে। সবাই নেমে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়াল। সবশেষে ফ্রান্সিস নামতে যাবে–দেখল পূবদিকের একটা পাথরের বাড়ি পাশ ছাড়িয়ে ছয় সাতজন প্রাসাদরক্ষী পাথরের চত্বর দিয়ে আসছে। দুজনের হাতে মশাল। ফ্রান্সিস নামল না। চুপ করে দড়ি ধরে বসে রইল। রক্ষীদের মশালের আলো এতদূর এলো না। বিস্কোরা অন্ধকারে দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে রইল। রক্ষীরা পাথরের চত্বরে থপ থপ শব্দ তুলে চলে গেল। চলে গেল রাজবাড়ির দিকে।
