ওদিকে রেভঞ্জাভিকে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা ভীষণ চিন্তায় পড়ল। দুদিন কেটে গেল অথচ ফ্রান্সিসরা কেউ ফিরল না। নিশ্চয়ই কোন বিপদে পড়েছে ওরা। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা ভেবে পাচ্ছে না কী করবে এখন। ওরা দল বেঁধে হ্যারির কাছে এল। হ্যারির মনও দুশ্চিন্তায় ভারাক্রান্ত। ওরা হারিকে প্রশ্ন করল এখন কী করবে?
হরি বলল–দেখ–আমার মনে হয় ফ্রান্সিসরা ফিরে আসবে। যদি ওরা ধরা পড়েও ফ্রান্সিস ঠিক পালাতে পারবে। কিন্তু আমি ভাবছি-ধরা পড়লেই ফ্রান্সিসের জীবন বিপন্ন হবে। হয়তো ও পালাবার সময়টুকুও পাবে না।
–কেন? ও কথা বলছো কেন? বন্ধুরা বলে উঠল।
–তোমরা জানো না থিংভেলির রাজার পরিচয়। ওখানকার রাজা গুমণ্ড আমাদের রাজার সেনাপতি ছিল। তোমাদের অনেকেরই মনে আছে সোনার ঘন্টা আনার সময় এই সেনাপতি গুমণ্ড আমাদের কী বিপদের মুখে ফেলেছিল? কাজেই একবার যদি গুমণ্ড ফ্রান্সিসকে চিনতে পারে তাহলে ফ্রান্সিসকে ও সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করবে। আমার ভীষণ দুশ্চিন্তার কারণ এটাই। তবে ফ্রান্সিস যথেষ্ট বুদ্ধিমান। ধরা পড়লেও ও আত্মপরিচয় দেবে না। বন্ধুদের কেউ কেউ বলে উঠল–তাহলে আমরা আজই থিংভেলির আক্রমণ করবো। ফ্রান্সিসদের আর মারিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসবো। হ্যারি হেসে বলল–ওটা করা আত্মহত্যার সামিল। আমরা সংখ্যায় পঞ্চাশজনের মত। রাজা গুমণ্ডের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে শুধু আমরা লড়াই করে পিরবো না। হেরে যাবো। আমাদের অনেককে মৃত্যুবরণ করতে হবে। তারই চেয়ে–আরো একটা দিন অপেক্ষা করি। যদি এর মধ্যে ফ্রান্সিসরা ফিরে না আসে তবে রাজা ইনগলফের কাছে আমরা যাবো। একজন বন্ধু বলল–হ্যারি আর একটা কথা ভাববার আছে। রাজা গুমণ্ড রাজা ইনগলফ ও রানীকে মুক্তি দিয়েছিল একটি শর্তে যে রাজা ইনগলফ রেভজাভিক ছেড়ে দক্ষিণ-পূর্বে স্কালহল্টে চলে যাবেন। বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে। তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে স্কালহল্টে চলে গেছেন এই সংবাদ পেলে তবেই রাজা গুমণ্ড রাজকুমারী মারিয়াকে মুক্তি দেবে। রাজা ইনগলফ এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছেন।
–হ্যাঁ–হ্যারি বলল–আমিও সংবাদ পেয়েছি। রাজ ইনগলফ রেভজাভিক ছেড়ে স্কালহল্টে চলে যাবার জন্যে সৈন্যদের প্রস্তুত হতে বলেছেন। একজন ভাইকিং-বন্ধু বলল–তাহলে তো রাজকুমারী মারিয়ার মুক্তির ব্যাপরটা সহজ হয়ে গেল। হ্যারি হাসল। বলল–ব্যাপারটা অত সহজে ভেবো না। রাজা ইনগলফ তাঁর সৈন্যবাহিনী নিয়ে স্কালহল্ট চলে গেলেই গুমণ্ড এসে এই রেভকজাভিকে রাজা হয়ে বসবে। তার রাজত্ব বাড়বে। কিন্তু রাজকুমারী মারিয়াকে কখনো মুক্তি দেবে না। গুমণ্ডকে আমি ভালভাবেই চিনি। ওর মত শয়তান ধুরন্দর এত সহজে এই সুযোগ ছেড়ে দেবে না। গুমণ্ড রাজকুমারী মারিয়ার মুক্তিপণ হিসেবে এরপর আমাদের রাজার কাছে আরো অনেক অর্থ সুবিধা এসব দাবী করে বসবে। তাই বলছিলাম আরো একটা দিন দেখি। যদি ফ্রান্সিসরা না ফেরে আর মারিয়াকেও রাজা গুমণ্ড মুক্তি না দেয় তবে রাজা ইনগলফের কাছে যাবো। বলবো–আপনার স্কালহল্টে যাওয়া চলবে না। আপনাকে রাজা গুমণ্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হবে। আপনার সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে থেকে আমরাও যুদ্ধ করবো।
–কিন্তু রাজা ইনগলফ কি তাতে রাজি হবেন? একজন বন্ধু বলল।
–রাজি করাতেই হবে–হ্যারি বলল–রাজ গুমরে চালের কাছে আমরা বিনা যুদ্ধে হার স্বীকার করবো না। এখন আর কয়েকদিন আমরা অপেক্ষা করি। দেখা যাক কী হয়।
হ্যারির বুদ্ধিমত্তার ওপর ওর বন্ধুদের অগাধ বিশ্বাস। ওরা আর কোন কথা না বলে নিজেদের কেবিনে চলে গেল।
ওদিকে ফ্রান্সিসদের একঘেয়ে দিন কাটছে। থিংভেলির কয়েদঘরে। সেদিনও ফ্রান্সিস খুঁটিতে হাত বাঁধা অবস্থায় খড়পাতা মেঝেয় শুয়ে আছে। তাকিয়ে আছে ঘরটার ওপরের ঘাসের আচ্ছাদনের দিকে। এখানে এক ধরনের মোটা ঘাস প্রচুর জন্মায়। সেই ঘাস শুকিয়ে নিয়ে বাড়িঘরের মাথায় লোক আচ্ছাদন করে। ফ্রান্সিস এরকম আচ্ছাদনের বাড়ি নিজেদের দেশে দেখেনি। ওর মনে একটা চিন্তা খেলে গেল–আচ্ছা–এই ঘাসের চাল কি খুব শক্ত হয়? ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল। ডাকল–নিলনি–
-বলুন। প্লিনি ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল।
ফ্রান্সিস বলল–আচ্ছা তুমি তো এই দেশের লোক। বলো তো ঐ মোটা ঘাসের চাল কি খুব শক্ত হয়? প্লিনি চালটা একবার দেখে নিয়ে বলল–গাছের সরু ডাল কাঠ এসব দিয়ে খাঁচা মত তৈরী করা হয়। তাতে চেপে শুকনো ঘাস বসিয়ে এই চাল করা হয়। তা একটু শক্ত হয় বৈকি। তুষার বৃষ্টি জমা–বরফের চাপ তো পড়ে। কিন্তু ভেঙে পড়ে না।
–হুঁ। ফ্রান্সিস আরো মনোযোগ দিয়ে ঘাসের চালটা দেখতে লাগল। অনেক উঁচু। ঘরটার মাথার কাছে এপাশের দেয়ালে আর ওপারের দেয়ালে লোহার গারদ বসানো দুটো ছোট জানালামত আছে। কাঁচের জানলা। অসম্ভব। অত উঁচুতে তো ওঠাই যাবে না। তখনই দেখল–ঘাসঢাকা চালের নিচে টানা টানা কড়ি কাঠের মত। গাছের ডাল ফালা করে ওগুলো লম্বালম্বি বসানো। কড়িকাঠগুলো থেকে ঘাসের চালের মধ্যে হাত তিনেক ফাঁক। যদি কোনভাবে ঐ কড়ি কাঠ পর্যন্ত ওঠা যায়–ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। বিস্কো ফ্রান্সিসকে লাফিয়ে উঠতে দেখে বলে উঠল–কী হলো ফ্রান্সিস?
–মুক্তি। ফ্রান্সিস হেসে মৃদুস্বরে বলল। কথাটা সকলের কানে গেল না। কিন্তু বিস্কো, শাঙ্কো, প্লিনির কানে গেল। ওরা অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে রইল। কী বলতে চায় ফ্রান্সিস? বিস্কো শাঙ্কো, ফ্রান্সিসকে ভালো করেই চেনে। ফ্রান্সিস কখনো বাজে কথা বলে না। নিশ্চয়ই মুক্তির কোন পথ ও খুঁজে পেয়েছে। প্লিনি ভাবল–লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এই কয়েদঘর থেকে এই পাহারাদারদের হাত থেকে মুক্তি? অসম্ভব। ফ্রান্সিস ফিস ফিস করে বলল–খাওয়াদাওয়ার পর কাজে লাগবে। সব তৈরী থেকো। এবার ফ্রান্সিস বসে পড়ল। কিন্তু শুয়ে পড়ল না। চোখ খুঁজে ভাবতে লাগল।
