চার জন রক্ষী এগিয়ে এল ফ্রান্সিসদের দিকে। অন্য বন্দীদের বাঁধা হাতের মধ্যে দিয়ে একটা লম্বা মোটা দড়ি টানা দেওয়া। সেই দড়ির একটা মুখ বাঁদিকের পাথুরে দেয়ালে গাঁথা একটা লোহার আংটার সঙ্গে বাঁধা। অন্য দিকটা ডানদিকের দেয়ালে গাঁথা আর একটা লোহার আংটার সঙ্গে বাঁধা। একজন রক্ষী সেইদিকের আংটা থেকে দড়ির মুখটা খুলে হাতে নিল। অন্য রক্ষীরা ফ্রান্সিসদের জোর করে এক একেকটা খুঁটির সামনে বসিয়ে দিল। ওদের হাত দুটো ছোট দড়ি নিয়ে বেঁধে দিল। এবার লম্বা দড়ি হাতে রক্ষীটি এসে ফ্রান্সিসদের বাঁধা হাতের মধ্যে দিয়ে দড়িটা টেনে নিল। তারপর ডানদিকের দেয়ালের লোহার আংটার সঙ্গে বেঁধে দিল। লম্বা দড়িটার মধ্যে সব বন্দীদের বাঁধা হাতও বাঁধা পড়ল। অন্য বন্দীদের মত ফ্রান্সিসদেরও হাত কাঠের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হলো। সব দেখে ফ্রান্সিসের মুখ গম্ভীর হলো। ওর মনে তখন একটাই প্রশ্ন–এই কয়েদঘর থেকে কি পালানো যাবে না? ফ্রান্সিসদের এভাবে বেঁধে রেখে রক্ষীরা চলে গেল। ওরা লোহার দরজা বন্ধ করে দিল। শব্দ হলো–চটাং-ঢং। তালা লাগিয়ে দিল। একটু পরে বিস্কো ডাকল–ফ্রান্সিস?
–উঁ? ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল?
–এখান থেকে পালানো অসম্ভব। বিস্কো বলল?
–হুঁ। দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল?
–এবার বন্ধুদের খবর পাঠাতে হয়। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস হাসল। বলল–খবর পাঠাবে কী করে? খবর পাঠাতে হলেও তো আমাদের মুক্তি পেতে হবে।
–তাহলে উপায়? বিস্কো বেশ ভীতস্বরে বলল।
–দাঁড়াও-সব দেখিটেখি। তারপর পালানোর উপায় বার করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। খুব ক্লান্তি বোধ করল ফ্রান্সিস। খুঁটিতে হাতবাঁধা অবস্থায় ও মেঝেয় শুয়ে পড়ল। খুব পুরু করে না হলেও মেঝেয় খড়বিছানো ছিল। ফ্রান্সিস খড়ের ওপর শুয়ে মাথার ওপর মোটা ঘাসে তৈরী চালার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চোখ বুজল। ভাবতে লাগল–এভাবে মাত্র চারজনের আসা উচিত হয়নি। সব বন্ধুদের নিয়ে আসা উচিত ছিল। তার মানেই লড়াই। রক্তপাত। মৃত্যু। কিন্তু রাজা ইনগলফ রক্তপাত চান না। মৃত্যু চান না। লড়াই রক্তপাত না চাইলে বুদ্ধির লড়াই চালাতে হয়। সেজন্যেই ওদের একটু সাবধান হয়ে সজাগ থাকা উচিত ছিল। প্লিনির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতে গিয়ে এই বিপদ হলো। ফ্রান্সিস চোখ বন্ধ অবস্থাতেই ডাকল–প্লিনি।
–বলুন। প্লিনি বলল।
–তুমি কি জানতে না ঐ গোপন দরজার কাছেও প্রাসাদরক্ষীরা থাকতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
–বিশ্বাস করুন–এর আগেও দুদবার যুদ্ধের সময় ঐ গোপন পথ দিয়ে ঢুকে আমাদের সৈন্যদের উদ্ধার করেছি। আজকে এত প্রাসাদরক্ষী পাহারা দিচ্ছে আমি ভাবতেও পারিনি। আমিই আপনাদের এই বন্দী দশার জন্যে দায়ী। আমাকে মাফ করুন। প্লিনি বলল। ফ্রান্সিস চোখ খুলে হাসল। বলল–তুমি এই নিয়ে দুঃখ করো না। আমাদের খুব সতর্ক থাকা উচিত ছিল। আমাদের সকলেরই, অভুল হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল। আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল।
এখানে তো দিন বলে কিছুই নেই। শুধু রাত। কাজেই দিন-রাতের কোন হিসেব নেই। সময় ধরে হিসেব। প্রায় ঘণ্টা দুতিন পরে হঠাৎ লোহার দরজায় শব্দ উঠল ঢং-ঢং। শব্দ শুনে ফ্রান্সিস উঠে বসল। পাঁচ-ছজন রক্ষী ঢুকল। ওদের হাতে একটা বড় কাঠের পাত্র। একজনের হাতে বড় কাঠের থালার মত। তাতে মোটা মোটা পোড়া রুটি। রক্ষীরা বন্দীদের হাতের বাঁধন খুলে দিল। সবার সামনে রাখল বড় বড় পাতা। কোন গাছের পাতা কে জানে। পাতায় রুটি দিল। কাঠের হাতায় করে হেরিং মাছ সেদ্ধ আর আলু সেদ্ধ ভঁটা লতাপাতার তরকারী। বন্দীরা খেতে লাগল। ফ্রান্সিস খেতে খেতে বলল–পেট পুরে খাও। খেতে ভালো না লাগলেও খাও। খাবার খুব বিস্বাদ লাগল না। বিস্কো ও প্লিনি শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কথামত চেটেপুটে খেল। ফ্রান্সিস আরো রুটি তরকারী চাইল। সব খেল। কয়েদঘরের একপাশে রাখা মাটির বড় জালা। তাতে জল রাখা আছে। সবাইকে নারকোলের মালায় জল ভরে এনে খাওয়ানো হলো। বন্দীদের খাওয়া শেষ হতে রক্ষীরা চলে গেল। ঢং-ঢং শব্দে লোহার দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। যাবার আগে ওরা অবশ্য বন্দীদের হাত বেঁধে দিতে ভুলল না।
ফ্রান্সিস খুঁটিতে হাতবাঁধা অবস্থায় আবার খড়ের গাদায় শুয়ে পড়ল। বলল–এখানে তো রাত-দিন বোঝার উপায় নেই। তবে মনে হয় আমাদের দেশে। এখন রাত।
–কী করে বুঝলে? বিস্কো বলল।
–কারণ আমার ঘুম পাচ্ছে। ফ্রান্সিস হেসে বলল–বিস্কো–তোমরাও ঘুমিয়ে নাও। যতটা পারো বিশ্রাম নাও। শরীরটা। ঠিক রাখো। বিস্কোরা জানে ফ্রান্সিস অনেক ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কথা বলে। বিস্কোও ফ্রান্সিসের মত খড়ের গাদায় শুয়ে পড়ল। দেখাদেখি শাঙ্কোও। শুধু প্লিনি বসে রইল। প্লিনি তো এই দেশের মানুষ। হয়তো ওর এখনও ঘুমের সময় হয়নি। শাঙ্কো একসময় ডাকল–ফ্রান্সিস? ফ্রান্সিস ওর দিকে তাকাল। বিস্কো ফি [ করে বলল–রক্ষীরা আমাকে ধরবার আগেই আমি আমার বড় ছোরাটা জামার নিচে লুকিয়ে ফেলেছিলাম। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল-সাবাস। ওটা অনেক কাজে লাগবে।
দিনের হিসেবে ফ্রান্সিসদের বন্দীদশার দুদিন কেটে গেল। ফ্রান্সিসরা কেউই বুঝে উঠতে পারছে না কীভাবে পালাবে। ফ্রান্সিস শুয়ে বসে সারাক্ষণ পালানোর ফন্দী ভাবে। কিন্তু কোনটাই কাজের মনে হয় না।
