ফ্রান্সিস আর ভাবতে পারল না। সাঁতারের গতি আরো বাড়িয়ে দিল।
কতক্ষণ এভাবে সাঁতার কেটেছে তা সে নিজেই জানে না, কিন্তু শরীর আর চলছে না চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসতে চাইছে। ঠিক তখনই ফ্রান্সিস অস্পষ্ট দেখতে পেল বাতাসে ফুলে ওঠা পাল। জাহাজ! ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি জল থেকে মুখ তুলে দু’চোখ কচলে তাকাল। হ্যাঁ–জাহাজই। খুব বেশি দূরে নয়। আনন্দে ফ্রান্সিস চিৎকার করে উঠতে গেল। কিন্তু গলা দিয়ে স্বর বেরুচ্ছে না। সে তাড়াতাড়ি গায়ের ঢোলাহাতা জামাটা তরোয়ালের ডগায় আটকে জলের ওপর নাড়তে লাগল। একটুক্ষণ নাড়ে। তারপর তরোয়ালটা নামিয়ে দম নেয়। আবার নাড়ে। জাহাজের লোকগুলো বোধহয় ওকে দেখতে পেয়েছে। জাহাজটা ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
ঝপাং–জাহাজ থেকে দড়ি ফেলার শব্দ হল। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি দড়ির ফাঁসটা কোমরে বেঁধে নিল। তারপর দু’হাত দিয়ে ঝোলান দড়িটা ধরল। কপিকলে কাঁচকাঁচ শব্দ উঠল। নাবিকেরা ওকে টেনে তুলতে লাগল। ফ্রান্সিস দেখল–জাহাজের রেলিঙে অনেক মানুষের উৎসুক মুখ। নিচে জলের মধ্যে ল্যাজ ঝাঁপটানোর শব্দে ফ্রান্সিস নিচের দিকে তাকাল। মাত্র হাত সাতেক নিচে জলের মধ্যে হাঙরের পাল অস্থিরভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফ্রান্সিস শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করল।
জাহাজটা ছিল মালবাহী জাহাজ। নাবিকেরা বেশিরভাগই আফ্রিকার অধিবাসী। কালো-, কালো পাথরের কুঁদে তোলা শরীর যেন। ইউরোপীয় সাদা চামড়ার মানুষ যে ক’জন ছিল, ফ্রান্সিস তাদের মধ্যে নিজের দেশের লোক কাউকে দেখতে পেল না।
ফ্রান্সিসের বিছানার চারপাশে নাবিকদের ভিড় জমে গেল। সবাই জানতে চায় ওর কি হয়েছিল, কোথা থেকে আসছিল, যাবেই বা কোথায়? কিন্তু ফ্রান্সিস তাকিয়ে-তাকিয়ে ওদের দেখছিল শুধু। কথা বলার শক্তি ওর অবশিষ্ট নেই। শুধু ইশারায় জানাল–ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছে। কয়েকজন নাবিক ছুটল খাবার আনতে।
রুটি আর মুরগীর মাংস পেট পুরে খেল ফ্রান্সিস। ওর যখন খাওয়া শেষ হয়েছে তখনই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল জাহাজের ক্যাপটেন। গোলগাল মুখ, পাকানো গোঁফ, ছুঁচালো দাড়ি। ক্যাটেনকে দেখে ভিড় অনেক পাতলা হয়ে গেল। যে যার কাজে চলে গেল। ক্যাপটেন ফ্রান্সিসের বিছানার পাশে বসল। জিজ্ঞেস করল–আপনার কি জাহাজডুবি হয়েছিল?
ফ্রান্সিস ঘাড় কাত করল। ক্যাপটেন বলল–কোথায় যাচ্ছিলেন?–যাবার কথা ছিল মিশরের দিকে। কিন্তু–ফ্রান্সিস দুর্বল কণ্ঠে বলল।
–ও, তা আর কেউ বেঁচে আছে?
–জানি না।
ক্যাপটেন উঠে দাঁড়াল–আপনাকে আর বিরক্ত করব না। আপনি বিশ্রাম করুন, দু’চার দিনের মধ্যেই সেরে উঠবেন।
–এই জাহাজ কোথায় যাচ্ছে?
–পর্তুগাল।
খুশীতে ফ্রান্সিসের মন নেচে উঠল। যাক, দেশের কাছাকাছিই যাবে। তারপর ওখান থেকে দেশে যাওয়ার একটা জাহাজ কি আর পাওয়া যাবে না?
তিন দিন ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে উঠল না। চার দিনের দিন ডেক-এ উঠে এল। এদিক-ওদিক একটু পায়চারি করল। রেলিঙে ভর দিয়ে সীমাহীন সমুদ্রের দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। দু’একজন নাবিক এগিয়ে এসে ওর শরীর ভালো আছে কিনা জানতে চাইলো! ফ্রান্সিস সকলকেই ধন্যবাদ দিল। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ওরা তাকে বাঁচিয়েছে। নানা কথাবার্তা হল ওদের সঙ্গে। কিন্তু ফ্রান্সিস সোনার ঘন্টার কথা, মরু-দস্যুদের কথা, সুলতানের দুর্গে বন্দী হয়ে থাকার কথা–এসব কিছু বললো না। কে জানে আবার কোন বিপদে পড়তে হয়।
কয়েকদিন বিশ্রাম নেবার পর ফ্রান্সিসের শুধু শুয়ে-শুয়ে থাকতে আর ভালো লাগল না। নাবিকের কাজ করবার অভিজ্ঞতা তো ওর ছিলই। একদিন ক্যাপটেনকে বলল সেকথা! ছুঁচালো দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে ক্যাপটেন বলল এখন তোমার শরীর ভালো সারেনি।
–আমি পারবো।
–বেশ হালকা ধরনের কাজ দিচ্ছি তোমাকে।
এ বন্দরে সে বন্দরে মাল খালাস করতে করতে প্রায় দুমাস পরে জাহাজটা পর্তুগালের বন্দরে পৌঁছল।
যাত্রা শেষ। বন্দরে জাহাজ পৌঁছতেই নাবিকেরা সব শহরে বেরুল আনন্দ হই-হুঁল্লা করতে। ফ্রান্সিস গেল অন্য জাহাজের খোঁজে। ওর দেশের দিকে কোন জাহাজ যাচ্ছে কিনা। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে। পেয়েও গেল একটা জাহাজ। ওদের দেশের রাজধানীতে যাচ্ছে। পরদিন ভোর রাত্রে ছাড়বে জাহাজটা। আগের জাহাজে কাজ করে ফ্রান্সিস যা জমিয়েছিল, সবটাই দিল এই জাহাজের ক্যাপটেনকে। ক্যাপটেন ওকে নিতে রাজী হল। জাহাজটা ছোট। মালবাহী জাহাজ। নাবিকের সংখ্যাও কম। অনেকের সঙ্গে আলাপ হল ফ্রান্সিসের। শুধু একজন বৃদ্ধ নাবিকের সঙ্গে ফ্রান্সিসের খুব ভাব হল। ডেক ধোয়া-মোছার সময় ফ্রান্সিস তাকে সাহায্য করত।
একদিন সন্ধ্যেবেলা সেই বৃদ্ধনাবিকটি ডেক-এর রেলিঙে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে চুরুট খাচ্ছিল। ফ্রান্সিস তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটা একবার ফ্রান্সিসকে দেখে নিয়ে আগের মতই আপন মনে চুরুট খেতে লাগল। ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–আপনি কত জায়গায় ঘুরেছেন?
নাবিকটা শূন্যে আঙুলটা ঘুরিয়ে বলল–সমস্ত পৃথিবী।
–সোনার ঘন্টার গল্পটা জানেন?
নাবিকটি ফ্রান্সিসের দিকে ঘুরে তাকাল। এ রকম একটা প্রশ্ন সে বোধহয় আশা করেনি। মৃদুস্বরে জবাব দিল–জানি।
–আপনি বিশ্বাস করেন?
–করি।
–আমি সেই সোনার ঘন্টার খোঁজেই বেরিয়েছিলাম।
