–কেন? কী হলো? বিস্কো বলল?
–এত পাহারাদার তো দেউড়িতে থাকে না। প্লিনি বলল?
–তার মানে তুমি বলতে চাইছো এত পাহারাদার এখানে সাধারণত থাকে–এই তো? ফ্রান্সিস বলল?
–হ্যাঁ। প্লিনি মাথা, ঝাঁকাল।
–যাক এতে একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। ফ্রান্সিস মৃদু হেসে বলল?
–কী ব্যাপারে? শাঙ্কো বলল।
–অর্থাৎ মারিয়াকে এই রাজবাড়িতেই বন্দী করে রাখা হয়েছে। তাই এত জোরদার পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর প্লিনির দিকে তাকিয়ে বলল–সদর দেউড়ি ছাড়া অন্য কোন পথে ভেতরে ঢোকা যাবে? প্লিনি একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল–রাজবাড়ির পেছনে একটা গোপন পথ আছে। চলুন সেটা দেখা যাক। আবার পাথরের বাড়ির আড়ালে আড়ালে ওরা চলল। রাজবাড়ি ঘুরে প্লিনি ওদের রাজবাড়ির পেছনে নিয়ে এল। পাথুরে দেয়ালের একটা জায়গায় এসে দাঁড়াল প্লিনি। ওরাও দাঁড়িয়ে পড়ল। প্লিনি চৌকো পাথর দিয়ে গাঁথা দেয়াল হাত দিয়ে দেখাতে লাগল। একটা জায়গায় চৌকো পাথর ধরল একটা। দুহাতে পাথরটা আস্তে আস্তে টানতে লাগল। পাথরটা নড়ল। এবার প্লিনি পাথরটার দুদিকে অল্প নাড়া দিয়ে দিয়ে খুলে আনতে লাগল। কয়েকবার এপাশ ওপাশ নেড়ে টানতেই পাথরটা খুলে এল। প্লিনি পাথরটা মাটিতে রাখল। পাথুরে দেয়ালে একটা খোঁদল মত হলো। প্লিনি খোঁদলটায় হাত ঢোকাল। ওপাশের দেয়ালে দুটো মশাল আটকানা ছিল। তার আলোয় দেখা গেল খোঁদলটায় একটা গোল কাঠের চাকতি। প্লিনি চাকতিটা আস্তে আস্তে ঘোরাতে লাগল। একটু মৃদু গোঁ গোঁ শব্দ উঠল। দেয়ালে একটা কাঠের দরজা লম্বালম্বি ফাঁক হলো। প্লিনি চাকা ঘোরাতে লাগল। ফাঁকটা বড় হতে লাগল। একসময় একজন মানুষ ঢোকার মত ফাঁক হলো। এখানেই প্লিনি একটা সাংঘাতিক ভূল করল। দরজার ফাঁকটা আরো বড় করল না। তাতে মাত্র একজন মানুষ ঢুকতে বা বেরোতে পারে এরকম বড় রইল। প্রথমে প্লিনি ঢুকল। ফ্রান্সিসরা এখানেও ভুল করল। ভেতরের অবস্থা কেমন অর্থাৎ নিরাপদ কিনা এটা প্লিনির কাছ থেকে না জেনেই ওরা তিনজন ঢুকে পড়ল। ঠিক তখনই প্লিনি চাপাস্বরে বলে উঠল–পালাও। ফ্রান্সিস দেখল গুমণ্ডের প্রায় দশ বারোজন প্রাসাদরক্ষীর দল মশাল হাতে দেয়ালের ধার ঘেঁষে পাহারা দিচ্ছে। ফ্রান্সিসরা ওদের প্রায় মুখোমুখি পড়ে গেল। ফ্রান্সিসরা ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু প্রাসাদরক্ষীরা ততক্ষণে ওদের দেখে ফেলেছে। ওরা খোলা তরোয়াল হাতে চিৎকার করতে ছুটে এল। ফ্রান্সিসরা ঐ ছোট দরজা দিয়ে একসঙ্গে বেরোতে পারল না। ফ্রান্সিস দেখল প্রাসাদরক্ষীদের চিৎকার শুনে আরো অনেক রক্ষী খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে আসছে। বিস্কো কোমর থেকে তরোয়াল খুলল। শাঙ্কো তীরধনুক বাগিয়ে ধরল। প্লিনির মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেল। ফ্রান্সিস দুহাত তুলে চিৎকার করে উঠল–বিস্কো শাঙ্কো-লড়াই নয়। বিস্কো তরোয়াল নামাল। শাঙ্কো ধনুক নামাল। প্রাসাদরক্ষীরা চারপাশ থেকে ওদের ঘিরে ধরল। ফ্রান্সিস কোমর থেকে তরোয়াল খুলে পায়ের কাছে পাথরের চত্বরে তরোয়াল ফেলে দিল। ঝনাৎ করে শব্দ হলো। দেখাদেখি বিস্কো আর প্লিনিও তরোয়াল ফেলে দিল। শব্দ হলো ঝনাৎ-ঝনাৎ। এবার চিবুকে ছুঁচোলো গোঁফ-ওলা একজন রক্ষী এগিয়ে এল। বোধহয় প্রাসাদরক্ষীদের দলনেতা। ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল–তোমরা কে?
ফ্রান্সিস বুঝল প্রকৃত পরিচয় দিতে গেলে বিপদ বাড়বে। রাজা গুমণ্ড ওর পুরনো শত্রু। যদি রাজা গুমণ্ড শোনে যে ফ্রান্সিসকে বন্দী করা হয়েছে তাহলে শুধু ফ্রান্সিসের নয় ওদের সকলেরই জীবন বিপন্ন হবে। রাজা গুমণ্ড এই সুযোগ সহজে ছাড়বে না। মারিয়ার জীবনও বিপন্ন হবে। কোনমতেই ওদের আসল পরিচয় দেওয়া চলবে না। ফ্রান্সিস এক পা এগিয়ে গিয়ে বলল–আমরা রাজা ইনগফের সৈন। দলনেতা ছুঁচলে দাড়ি গোঁফে হাত বুলিয়ে বলল-কিন্তু তোমাদের মধ্যে মাত্র একজনের পরনে রাজা ইনগফের সৈন্যদের পোশাক।
–আমরা ছদ্মবেশে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল?
–কেন?
–রাজকুমারী মারিয়াকে উদ্ধার করতে। ফ্রান্সিস বলল।
ছুঁচলো দাড়ি গোঁফওয়ালা হো হো করে হেসে উঠল। বলল–এবার তোমাদের কে উদ্ধার করে দেখ। তারপর অন্য রক্ষীদের দিকে তাকিয়ে বলল–সব কটাকে কয়েদঘরে ভর। একজন রক্ষী ফ্রান্সিসদের তরোয়ালগুলো তুলে নিল। ফ্রান্সিসদের কোমর থেকে তোয়লের খাপগুলোও নিল। শাঙ্কোর কাঁধ থেকে ধনুক তীরভরা তৃনীর নিয়ে নিল। তারপর রাজবাড়ির পুবকোণার দিকে ধীর পায়ে চলল। অন্য রক্ষীরা ফ্রান্সিসদের ধাক্কা দিয়ে বলল–চল। ঐ রক্ষীর পেছনে পেছনে ফ্রান্সিসরা চলল। ওদের পেছনে পেছনে চলল সাত আটজন রক্ষী। সবার হাতেই খোলা তরোয়াল। বিস্কো আর শাঙ্কো রাগে ফুঁসতে লাগল। এভাবে লড়াই না করে বন্দীত্ব মেনে নিতে হলো? কিন্তু উপায় নেই। ফ্রান্সিসের আদেশ মানতেই হবে। যেতে যেতে ফ্রান্সিস চারদিকে নজর রেখে চলল। দেখল–দেয়ালের এখানে ওখানে মশাল জ্বলছে। অনেক প্রাসাদরী এখানে ওখানে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। এ অবস্থায় এখন পালাবার চেষ্টা করলে মৃত্যু সুনিশ্চিত। ফ্রান্সিস চলল। চারদিকে ঠিক নজর রাখল। রাজবাড়ির পুবকোণায় একটা পাথরের ঘরের সামনে ওরা এল। ঘরটার কাঠের দরজার দুপাশে দুটো মশাল জ্বলছে। দরজার সামনে দুজন রক্ষী খোলা তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সবার সামনে যে রক্ষীটি ফ্রান্সিসদের তরোয়াল আর শাঙ্কোর তীর ধনুক নিয়ে যাচ্ছিল সে ঐ ঘরটার দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজার ধারে দাঁড়ানো একজন রক্ষী কোমর বন্ধনী থেকে লম্বা একটা চাবি বের করে দরজার বড় তালাটা খুলে দিল। রক্ষীটি ফ্রান্সিসদের তরোয়াল আর শাঙ্কোর তীর ধনুক নিয়ে ঘরটায় ঢুকল। ফ্রান্সিস বুঝল–এই ঘরটা অস্ত্রাগার। এখানেই ওদের অস্ত্রগুলো রাখতে হবে। ঘরটার মাথায় একটা শীলমাছের ছবিওয়ালা পতাকা উড়ছে। রাজা গুমণ্ডের পতাকা। ঐ অস্ত্রাগার ছাড়িয়ে পাথুরে চত্বর। তারপরেই আর একটা পাথরের লম্বাটে ঘর। সেই ঘরের বাইরে অনেকগুলো মশাল জ্বলছে। পাঁচ ছজন রক্ষী খোলা তরোয়াল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সেই ঘরের সামনে ফ্রান্সিসদের দাঁড় করানো হলো। ফ্রান্সিস বুঝল–এটাই কয়েদঘর। ছুঁচোলো দাড়ি গোঁফওয়ালা রক্ষীদলের নেতা গলা চড়িয়ে বলল–দরজা খোল। একজন রক্ষী ছুটে বন্ধ দরজার কাছে গেল। কোমর থেকে একটা লম্বা চাবি বের করল। বেশ বড় একটা তালা ঝুলছে দরজায়। রক্ষীটি সেই তালা খুলল। দরজাটায় ধাক্কা দিল। ঘর ঘর শব্দ করে লোহার দরজাটা খুলে গেল। ফ্রান্সিসরা খোলা দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস দেখল দরজাটায় খাড়া খাড়া লোহার গারদ বসানো। দরজার চৌকোণো চারদিক মোটা লোহার। হাত খোলা থাকলেও এই লোহার দরজা ভাঙা অসম্ভব। রক্ষীরা ওদের প্রায় ঠেলে গারদঘরে ঢুকিয়ে দিল। ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস দেখল ঘরটা বেশ লম্বা। ঘরটায় চারটে মশাল জ্বলছে। মশালের আলোয় দেখা গেল ছোট ছোট কাঠের খুঁটিতে হাত বাঁধা অবস্থায় রয়েছে কয়েকজন বন্দী। দরজা খোলার শব্দে তাদের মধ্যে দুএকজন মুখ তুলে ফ্রান্সিসদের দেখল। বন্দীদের মধ্যে কয়েকজনের গায়ে রাজা গুমণ্ডের সৈন্যাবহিনীর পোশাক। হয়তো কোন অপরাধে ওদের বন্দী করা হয়েছে।
