রেভক্জাভিকের মানুষেরা এসে জড়ো হলো এই যুদ্ধযাত্রা দেখতে। রাজা-রানী ও মারিয়া রাজা গুমণ্ডের হাতে বন্দী হয়েছে এ সংবাদ ততক্ষণে ছড়িয়ে পড়েছে।
সেনাপতি থিংভেলির দিকে তরোয়াল তুলে ইঙ্গিত করলেন। সব সৈন্য চিৎকার করে উঠল। ভাইকিংরাও ধ্বনি তুলল-ও-হো-হো-যুদ্ধযাত্রা শুরু হলো।
মাথার ওপরে স্বল্পালোকিত আকাশ, মাটিতেও কুয়াশা আর অন্ধকার আর এখানে ওখানে জমা তুষার। তার মধ্যে দিয়ে সৈন্যরাহিনী থিংভেলির দিকে এগিয়ে চলল। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে জোর ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে তখন।
সবার আগে চলেছে দশ-বারোজন মশালধারী। মশালের আলোয় ওরা পথ দেখিয়ে দিয়ে চলল।
বেশ কয়েক ঘন্টা পর দূরে অস্পষ্ট দেখা গেল টানা পাহাড়। পাহাড়ের মাথায় বরফ। ওটাই সীমান্ত। নিচু টানা পাহাড়ের চড়াই পেরোলেই থিংভেলির রাজ্যের শুরু।
হঠাৎ দেখা গেল সীমান্ত পাহাড় থেকে নেমে আসছে দুটো আলোর বিন্দু। একটু এগিয়ে আসতেই বোঝা গেল দুটো চলন্ত মশাল। আর একটু পরে আলোছায়ায় দেখা গেল একটা ঘোড়ার গাড়ি আসছে। গাড়িটায় মশালের আলো পড়েছে। দেখা গেল রাজা ইনগলফের গাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে সেনাপতি তরোয়াল আকাশের দিকে তুলে থামবার ইঙ্গিত করলেন। সৈন্যবাহিনী আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে পড়ল।
গাড়িটা কাছে এল। থামলে দেখা গেল গাড়িতে রাজা ও রানী। মারিয়া নেই। ছাতখোলা গাড়িটায় উঠে দাঁড়ালেন রাজা ইনগলফ। গাড়ির দুপাশের মশালের আলো পড়েছে তার মুখে। দুহাত ওপরে তুলে রাজা ইনগফ বলতে লাগলেন–আমার বীর যোদ্ধারা–আমাকে আর রানীকে রাজা গুমণ্ড মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু বন্দী করে রেখেছে রাজকন্যা মারিয়াকে। রাজা গুমণ্ড এক শর্তে আমাদের মুক্তি দিয়েছে। শর্তটা হচ্ছে আমাকে আর রানীকে রেভজাভিক ছেড়ে দক্ষিণ পূর্বে স্কালহন্টে চলে যেতে হবে। মাত্র বাহাত্তর ঘণ্টা সময় দিয়েছে রাজা গুমণ্ড। আমি ও রানী স্কালহন্টে পৌঁছে রাজা গুমণ্ডকে সংবাদ পাঠালে সে রাজকন্যা মারিয়াকে মুক্তি দেবে। রাজা থামলেন।
সমস্ত সৈন্যরা নীরব। শুধু শিরশিরে ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে। দুএকটা ঘোড়ার ডাক শোনা যাচ্ছে। রাজা ইনগলফ আবার বলতে লাগলেন–আমি এই শর্তে সম্মত হয়েছি। রাজকন্যা মারিয়ার জীবন রক্ষা করা আমার কর্তব্য। তাই আমি আর রানী রাজবাড়িতে যাবো এখন। সব ব্যবস্থা করে স্কালহল্টেচলে যাবো। তোমরাও আমার সঙ্গে চলল। আমি রক্তপাত চাই না। বিনা রক্তপাতে রাজকন্যা মারিয়াকে মুক্ত করার জন্য অন্য কোনো পথ নেই। আমাকে এই নির্বাসন মেনে নিতেই হবে।
এবার ফ্রান্সিস ঘোড়া নিয়ে রাজার সামনে এসে দাঁড়াল। মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল–রাজা ইনগলফ–আমাদের একবার সুযোগ দিন। চেষ্টা করে দেখি রাজকন্যা মারিয়াকে মুক্ত করতে পারি কিনা।
–বেশ। দেখো চেষ্টা করে। কিন্তু কোনোরম রক্তক্ষয় নয়। রাজা বললেন। ফ্রান্সিস এবার সেনাপতির কাছে এল। বলল-থিংভেলির রাজবাড়ির পথঘাট সম্পর্কে খুব ওয়াকিবহাল একজন কাউকে আমাদের দিন।
সেনাপতি চারদিকে তাকিয়ে একজন অশ্বারোহী সৈন্যকে ইঙ্গিতে ডাকল। লোকটি এগিয়ে এল। লোকটার মুখে দাড়ি-গোঁফ, একটু রোগামতো, লম্বা। সেনাপতি লোকটাকে দেখিয়ে বললেন–এর নাম প্লিনি। থিংভেলির সব জায়গা ওর নখদর্পণে। ও আপনাদের সাহায্য করতে পারেবে।
বেশ। এসো প্লিনি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর হ্যারিকে বলল–বিস্কো আর শাঙ্কোকে নিয়ে আমি থিংভেলির যাচ্ছি। যদি পঞ্চাশ ঘণ্টার মধ্যে না ফিরি তবে তোমরা থিংভেলিরে আমাদের উদ্ধারে যেও।
বিস্কো আর শাঙ্কো এগিয়ে এল। প্লিনিও এল। তখনই ফ্রান্সিস রাজার গাড়িতে রানীকে দেখল। মশালের আলোয় দেখল রানীর মুখ ভয়ার্ত, ফ্যাকাশে। গাড়িতে নিথর বসে আছেন।
সেনাপতির ইঙ্গিতে সৈন্যদল ফিরে চলল। ভাইকিংদের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। একটা যুদ্ধ হতে হতে হলো না। আর কী করা যাবে। ওরাও ফিরে চলল।
মাথার ওপর টিমটিমে তারার আলোর আকাশ। সামনে কুয়াশা আর তুষারে ঢাকা অন্ধকার পথ। চলল ফ্রান্সিসরা ঘোড়া ছুটিয়ে।
বেশ কয়েক ঘণ্টা পর থিংভেলির নগরের কাছে ওরা পৌঁছল। একটা ছোট পাথুরে টিলার পেছনে ফ্রান্সিস ঘোড় থামাল। বিস্কোরাও থামল। ফ্রান্সিস বলল–ঘোড়া ছুটিয়ে নগরে ঢোকা যাবে না। সহজেই লোকের নজরে পড়ে যাবো। ঘোড়া এখানে রেখে নগরে ঢুকতে হবে।
টিলার এপাশেই একটা ছোট ওক গাছ। সেই গাছের সঙ্গে দড়ি দিয়ে ঘোড়াগুলো বাঁধা হলো।
ফ্রান্সিস বলল–প্লিনি–ঘরবাড়ি পাথরের আড়ালে আড়ালে আমাদের রাজবাড়ি নিয়ে চলো।
-ঠিক আছে। আমার পেছনে পেছনে আসুন। প্লিনি বলল। ফ্রান্সিসরা প্লিনির পেছনে পেছনে নগরে ঢুকল।
থিংভেলির খুব বড় নগর নয়। তবে খুব ছোটও নয়। সারা নগরের বাড়িঘর অন্ধকার। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। পথের এখানে ওখানে পাথরের খাঁজে জ্বলন্ত মশাল। সেই মশালের আলোতেই পথ দেখে ওরা চলল। পাথরের বাড়িঘরের আড়ালে আড়ালে, কখনও ফাঁকা রাস্তা দৌড়ে পেরিয়ে ওরা রাজবাড়ির সামনে এল। পাথরের বাড়ির আড়াল থেকে দেখল রাজবাড়ির সদর দেউড়িতে অনেক মশাল জ্বলছে। দ্বাররক্ষীরা সংখ্যায় আট দশজন। খোলা তরোয়াল হাতে প্রধান প্রবেশ পথ পাহারা দিচ্ছে। প্লিনি একটু চিন্তিত স্বরে বলল–কী ব্যাপার বুঝতে পারছি না।
