–হুঁ। হ্যারি নক্সাটা ভালো করে দেখল। হঠাৎ বলে উঠল–আচ্ছা ত্রিভুজের ওপরে দেখো তিনটি চিহ্ন রয়েছে। প্রত্যেকটি রেখার শেষে। কীসের চিহ্ন এগুলো?
–দেখেছি। আমার মনে হয় ওগুলো সূর্য। ফ্রান্সিস বলল।
–ফ্রান্সিস-এটা আইসল্যান্ড। ছমাস সূর্যের দেখাই পাওয়া যায় না। তাও আবার একটা নয় তিনটে সুর্য। হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস একটু মাথা ঝাঁকিয়ে বলল–না, কিছুতেই বুঝতে পারছি না। তারপর বলল–লক্ষ্য করে দেখো নিচের একটা বিন্দু থেকে তিনটে সরলরেখা উঠে গেছে। এভাবেই একটা ত্রিভুজ তৈরি হয়েছে।
–আর একটা জিনিস লক্ষ্য করো–নিচের বিন্দুর কাছে কিন্তু সূর্যের মতো ঐ চিহ্নটা নেই। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ, সেটাও লক্ষ্য করেছি। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
হ্যারি উঠে দাঁড়াল। বলল-নাও এবার ঘুমোও। পরে ভাবা যাবে। হ্যারি চলে গেল। ফ্রান্সিস ছবির কাগজটা বিছানার নিচে রাখল। তারপর আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ল। ঐ নক্সা ছবির কথা ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না। হঠাৎ হ্যারির ডাকাডাকিতে ওর ঘুম ভেঙে গেল। ও হ্যারির মুখের দিকে তাকাল। হ্যারি বলল–শীগগির ওঠো। রাজার প্রাসাদের দুজন পাহারাদার এসেছে। তারা তোমাকে কী বলতে চায়।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল। রাজবাড়ির পাহারাদার সৈন্য দুজন এগিয়ে এল। একজন বলল–আপনিই ফ্রান্সিস।
হ্যাঁ,–ফ্রান্সিস বলল।
পাহারাদার সৈন্যটি বলল–সেনাপতি একটা সংবাদ আপনাকে জানাতে বলেছেন।
–বলো।
–রাজা-রানী ও রাজকন্যা মারিয়া লোগবার্গের উৎসব থেকে ফিরছিলেন। পথে রাজা গুমণ্ডের সৈন্যরা তাদের বন্দী করেছে। তারপর থিংভেলিরে নিয়ে গেছে। সৈন্যটি বলল।
ফ্রান্সিস বিছানা ছেড়ে একলাফে উঠে দাঁড়াল। বলল–সব খুলে বলল।
সৈন্যটি বলতে লাগল–আমরা দুজন রাজবাড়ির সদর দেউড়ি পাহারা দিচ্ছিলাম। লোগবার্গে উৎসব শেষ হয়ে গেল। লোকজন সব ফিরে এল। ঘরে ঘরে আলো নিভিয়ে সবাই শুয়ে পড়ল। রাস্তাঘাট নির্জন হয়ে গেল। অথচ রাজা রানী আর রাজকন্যা মারিয়াকে নিয়ে তখনও গাড়ি রাজবাড়ি ফিরল না। আমরা ভাবলাম হয়তো রাজা-রানী, রাজকন্যা মারিয়াকে উষ্ণ প্রস্রবণ, আগ্নেয়গিরি এসব দেখাতে নিয়ে গেছেন। আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম। কিন্তু গাড়ি ফিরল না। আমাদের কেমন সন্দেহ হলো। আমরা দুজন ঘোড়ায় চেপে লোগবার্গে গেলাম। উৎসব অনেকক্ষণ আগেই শেষ হয়ে গেছে। যে দুচারজন লোক পাহাড়ের খাঁজে শুয়ে বসে ছিল তাদের কাছে জানলাম রাজা-রানী রাজকন্যা মারিয়াকে নিয়ে অনেকক্ষণ আগেই গাড়িতে চলে এসেছেন। আমরা অন্য যে পাথুরে পথটা থিংভেলির দিকে গেছে সে পথ দিয়ে ঘোড়া ছোটালাম। এই পথের ধারেই দুটো উষ্ণ প্রস্রবণ আর হেকলা আগ্নেয়গিরি আছে। কিছুদূর আসতেই দেখলাম রাজার এক দেহরক্ষী ভীষণ আহত অবস্থায় রাস্তায় পড়ে আছে। মুমুর্ষ রক্ষীটি কোনোরকমে বলতে পেরেছিল–বন্দী-রাজা গুমণ্ড–থিংভেলির। তারপরই রক্ষীটি মারা গেল। আমরা ফিরে এসে সেনাপতিকে খবর দিলাম। তিনি আপনাকে খবর দেবার জন্যে আমাদের পাঠিয়েছেন।
ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ঘরের কাঠের মেঝেয় কয়েকবার পায়চারি করল। পায়চারি থামিয়ে বলল–হ্যারি–বোঝাই যাচ্ছে তিনজনেই রাজা গুমণ্ডের হাতে বন্দী হয়েছে। একটু থেমে বলল–আমরা রাজা গুমণ্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াতে চাইনি। কিন্তু এখন তো রাজা-রানী আর মারিয়াকে মুক্ত করতেই হবে। কাজেই প্রয়োজনে যুদ্ধে নামতেই হবে। এদিকে খবরটা জাহাজে ছড়িয়ে পড়ল। সব ভাইকিংরা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল–যাও–সবাইকে ডেক-এ আসতে বলো।
সব ভাইকিং ছুটে এল। জাহাজের ডেক-এ জড়ো হলো। ফ্রান্সিস হারিকে সঙ্গে নিয়ে ডেক-এ উঠে এল। সকলের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব–তোমরা নিশ্চয়ই জেনেছে যে থিংভেলির রাজা গুমণ্ড রাজা ইনগলফ, রানী ও মারিয়াকে বন্দী করেছে। আমরা চাইনি যুদ্ধে জড়াতে। কিন্তু এখন প্রয়োজনে লড়াইতে নামতেই হবে। রাজা-রানী ও মারিয়াকে মুক্ত করতে হবে। ফ্রান্সিস থামল। তারপর বলল–আমি আর হ্যারি সেনাপতির সঙ্গে দেখা করতে রাজবাড়ি যাচ্ছি। তোমরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তৈরি হয়ে রাজবাড়িতে এসো। সেনাপতির সঙ্গে কথা বলে আমরা ইতিকর্তব্য স্থির করবো।
সব ভাইকিং চিৎকার করে উঠল—ও-হো-হো। তারপর অস্ত্রঘরের দিকে ছুটল। যুদ্ধের উন্মাদনা জাগল ওদের মধ্যে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি গাড়ি চড়ে রাজবাড়িতে এল। সেনাপতি দরবার কক্ষে ফ্রান্সিসের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন। ফ্রান্সিস ও হ্যারি ঘরে ঢুকল। সেনাপতি ওদের ভেলভেটে মোড়া কাঠের আসনে বসতে ইঙ্গিত করলেন। ওরা বসল। সেনাপতি বললেন–সবাই তো শুনেছেন। এখন রাজা-রানী ও রাজকন্য মারিয়াকে মুক্ত করতে গেলে যুদ্ধ করতেই হবে।
-ঠিক আছে। আমাদের কিছু ঘোড়া দিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-তার সব ব্যবস্থা হবে। প্রথমে অশ্বারোহী বাহিনী যাবে। পেছনে যাবে পদাতিক বাহিনী। সীমান্ত পেরিয়ে প্রথমে অশ্বারোহী বাহিনী থিংভেলির আক্রমণ করবে। তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে যাবে পদাতিক বাহিনী। সেনাপতি বললেন।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–আমার বন্ধুরা এখুনি এসে পড়বে। আপনি আপনার সৈন্যদের একত্র করুন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত্রসজ্জিত হয়ে ভাইকিংরা রাজবাড়ির সামনের বিস্তৃত প্রান্তরে এসে উপস্থিত হলো। রাজা ইনগলফের সৈন্যরাও অস্ত্র নিয়ে প্রান্তরে এসে মিলিত হলো। অশ্বারোহী ও পদাতিক দুভাগে সৈন্যদের ভাগ করা হলো। সমস্ত বাহিনীর সামনে রইল সেনাপতি, ফ্রান্সিস আর তীরধনুক হাতে শাঙ্কো।
