ঠিক মোড়টায় হঠাৎ ঘন কুয়াশা গাড়িটাকে ঘিরে ধরল। একে আলো কম, তার ওপর কুয়াশা। গাড়ির চালক গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। গাড়িটা শহর ও রাজবাড়ি যাওয়ার পথটা ধরবে, ঠিক তখনই কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে এল একদল অশ্বারোহী সৈন্য। গাড়িটাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলল। গাড়ির চালক ঘোড়ার রাশ টেনে গাড়ি থামিয়ে ফেলল। রাজা ইনগলফ সেই সৈন্যদের পোশাক দেখেই চিনলেন-এরা রাজা গুমণ্ডের সৈন্য। রাজার দেহরক্ষী চার অশ্বারোহী সৈন্য প্রথমে কুয়াশার মধ্যে ঠিক বুঝল না গাড়ি থামল কেন। এবার দেখল রাজা গুমণ্ডের সৈন্যদের। কিন্তু ততক্ষণে রাজা গুমণ্ডের সৈন্যরা ওদের ঘিরে ফেলেছে। দেহরক্ষী চারজন সঙ্গে সঙ্গে কোমরের খাপ থেকে তরোয়াল উঁচিয়ে লড়াইয়ের জন্যে তৈরি হলো। শত্রুসৈন্য সংখ্যায় কুড়ি-পঁচিশজন। দেহরক্ষীরা মাত্র চারজন। রাজা ইনগলফ ওপরখোলা গাড়ি থেকে সবই দেখলেন। উনি সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে উঠে দাঁড়ালেন। চিৎকার করে দেহরক্ষীদের শান্ত হতে বললেন। দেহরক্ষী সৈন্যরা তরোয়াল নামাল। রানীর ভয়ে মুখ সাদা হয়ে গেল। উনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। মারিয়াও ভীত হলো। তবে একেবারে ভেঙে পড়ল না। মনে সাহস সঞ্চয় করল। ভাবল–দেখা যাক না কী হয়। মারিয়া রানীকে জড়িয়ে ধরল। .স্পষ্ট বুঝল রানীর সারা শরীর কাঁপছে। মারিয়া মৃদুস্বরে বলল–কাঁদবেন না। ভয়ের কিছু নেই। রাজা এবার শত্রুসৈন্যদের দিকে তাকালেন। বেশ দৃঢ়স্বরে বললেন–তোমরা কী চাও?
শত্রুসৈন্যের দলপতি এগিয়ে এল। বলল–আমাদের রাজা গুমণ্ডের হুকুম-রাজকন্যা মারিয়াকে বন্দী করে নিয়ে যেতে হবে।
–অসম্ভব। রাজা চিৎকার করে বললেন–মারিয়াকে বন্দী করে নিয়ে যেতে হলে আমাদেরও তার সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।
দলপতি বেশ চিন্তায় পড়ল। একটু ভেবে বলল–বেশ। আপনাদেরও সঙ্গে যেতে হবে।
–আমরা প্রস্তুত। রাজা বললেন।
দলপতি বলল–তার আগে আপনার দেহরক্ষীদের অস্ত্রত্যাগ করতে হবে।
–বেশ। রাজা দেহরক্ষীদের দিকে তাকিয়ে অস্ত্রত্যাগের ইঙ্গিত করলেন। দেহরক্ষীরা অস্ত্রত্যাগ করল। পাথুরে রাস্তায় তরোয়াল ফেলে দিল ওরা। একজন সৈন্য তরোয়াল কুড়িয়ে নিল। ঝনঝনাৎ শব্দ উঠল। এবার শত্রুসৈন্যের দলপতির নির্দেশে দেহরক্ষী সৈন্যদের ঘিরে ফেলা হলো। গাড়িও ঘিরে ফেলা হলো। তারপর শত্রু-দলপতি গাড়ির চালককে হুকুম নিল–এই রাস্তা ধরে গাড়ি চালাও। যত তাড়াতাড়ি পারো। সীমান্ত পেরিয়ে থিংভেলির দিকে। জলদি। গাড়ি চলল। গাড়ি আর দেহরক্ষীদের ঘিরে শত্রুসৈন্যেরাও চলল। এবড়োখেবড়ো তুষার-জমা পাহাড়ি রাস্তা। চালক গাড়ি খুব জোরে চালাতে পারছিল না।
গাড়ি চলছে। শত্রুসৈন্যরাও ঘোড়া ছুটিয়ে চলছে হঠাৎ আবার একটা কুয়াশার আস্তরণ সবাইকে ঢেকে ফেলল। একজন দেহরক্ষী ঘোড়া থেকে লাফ দিল রাস্তার ধারে খাদের তুষারের মধ্যে। ঠিক তখনই কুয়াশার আস্তরণ সরে গেল। পেছনের একজন শত্রুসৈন্য সেই অল্প আলোয় সঙ্গে সঙ্গে পলায়নপর দেহরক্ষীকে লক্ষ্য করে বর্শা ছুঁড়ল। নির্ভুল নিশানা। বর্শা ওর পিঠে গেঁথে গেল। দেহরক্ষীটি আর পালাতে পারল না। উবু হয়ে খাদের তুষারের মধ্যে পড়ে গেল। রাজা সঙ্গে সঙ্গে গাড়িতে উঠে দাঁড়িয়ে বাকি তিনজন দেহরক্ষীকে বললেন–তোমরা পালাবার চেষ্টা করো না। রাজা বসলেন। আবার গাড়ি চলল। শত্রুসৈন্যরাও চলল ঘোড়া ছুটিয়ে। গাড়ির সামনে পেছনে।
মারিয়া রানীকে ধরে রইল। রানী আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। রাজা মৃদুস্বরে বললেন–কাদছো কেন? আমি তো এখনো বেঁচে আছি।
ঘণ্টা দুয়েক পরে দূরে আলোয় দেখা গেল কালো রঙের টানা নিচু পাহাড় একটা। এই নিচু পাহাড়টাই রেভঞ্জাভিক ও থিংভেলির রাজ্যের সীমানা। পাহাড়টার ওপরে জমা বরফ। শীতার্ত হাওয়া ছুটে আসছে ঐ সীমানা পাহাড়ের দিক থেকে।
ওদিকে খাদের মধ্যে পড়ে থাকা আহত দেহরক্ষীটি তখনও বেঁচে ছিল। পিঠে গাঁথা বর্শাটা খুলে ফেলেছিল। রক্তাক্ত দেহে সে কোনোরকমে খাদের তুষার থেকে শরীরটাকে হিচড়োতে হিচড়োতে উঠেছিল পাথুরে রাস্তাটায়। তারপর রাস্তাতেই পড়ে রইল সে।
.
উৎসবে হৈ-হল্লা আনন্দ করে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা তখন খুবই ক্লান্ত। ওরা জাহাজে উঠে যে যার কেবিনঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। একটু পরেই সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। শুধু ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল না। কেবিনঘরে ঢুকে মোটা মোমবাতিটা চমকি পাথর ঠুকে জ্বালল। তারপর বিছানার তলা থেকে কবি আরির সেই ছবি ও নক্সা আঁকা কাগজটা নিয়ে বসল। ছবি আর নক্সাটা খুব মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল। দীর্ঘ সর্প জাহাজের মুখের ছবি এটা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সাপটার মুখে সাতটা দাঁত, মাথায় সাতটা মণি কেন? ত্রিভুজের নক্সাটার অর্থ কী? ফ্রান্সিস গভীরভাবে এইসব ভাবছে তখনই হ্যারি ওর ঘরে ঢুকল। বলল–আলো জ্বলছে দেখে এলাম। কী ব্যাপার? ঘুমুবে না?
-হ্যাঁ, এইবার শোব। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি ওর পাশে এসে বসল?
–এই ছবি নক্সা তো দেখেছো? ফ্রান্সিস বলল?
–হুঁ দেখেছি। হ্যারি বলল?
–কিছু বুঝতে পারছো? ফ্রান্সিস বলল।
–নাঃ। তা তুমি তো ঐ স্তম্ভ, জায়গাটা ভালো করে দেখে এসেছো। তুমি কিছু বুঝলে? হ্যারি বলল।
–উঁহু। সাদাটে পাথরের স্তম্ভ। স্তম্ভ যেমন হয়। খুব সরুও নয়, খুব মোটাও নয়। সাধারণ স্তম্ভ। ফ্রান্সিস বলল।
